কমছে নদ-নদীর পানি

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬০ লাখ মৃত্যু ৭৫ জনের

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬০ লাখ মৃত্যু ৭৫ জনের
ছবি: যুগান্তর

ভারি বৃষ্টি না থাকায় দেশের প্রায় সব নদ-নদীর পানি কমছে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। তবে এখনও বন্যা কবলিত জেলাগুলোতে চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে বানভাসিদের।

নগদ টাকার অভাবে অনেকই ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামত করতে পারছেন না। ফলে আশ্রয় কেন্দ্র, বাঁধ বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়া লোকজনের বাড়ি ফেরাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

এদিকে বন্যায় ২৮ জেলায় এ পর্যন্ত ৬০ লাখ ৭৪ হাজার ৪১৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১৪ জেলায় ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। রোববার সচিবালয়ে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান এবং মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ্ কামাল।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) তথ্য অনুযায়ী, কুশিয়ারা ছাড়া দেশের সব প্রধান নদ-নদীতে পানি কমছে। তবে এখনও ১০ নদ-নদীর পানি ১৩ স্টেশনে বিপদসীমার উপরে রয়েছে।

এগুলো হচ্ছে- সুরমা, কুশিয়ারা, তিতাস, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, গৌর, আত্রাই, ধলেশ্বরী ও পদ্মা। কুশিয়ারা নদীর অমলশীদ স্টেশনে সর্বোচ্চ পানির স্তর রয়েছে। এ পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির প্রবণতা কম থাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে। তবে উজান থেকে পানির চাপ বেশি থাকায় পানি নামার গতি কম।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, ১০ জুলাই উজান থেকে নেমে আসা পানি ও দেশের ভেতরে বৃষ্টিপাত বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ক্রমান্বয়ে ২৮ জেলার বিভিন্ন এলাকা বন্যা কবলিত হয়। বন্যা পরিস্থিতি এখন উন্নতির দিকে। তবে বন্যা দীর্ঘায়িত হবে না। পানি দু-এক দিনের মধ্যে কমে যাবে। বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হলেও ত্রাণের কোনো সমস্যা হবে না।

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, বন্যায় সুনামগঞ্জে দু’জন, গাইবান্ধায় আটজন, শেরপুরে এগারোজন, বান্দরবানে একজন, নেত্রকোনায় একজন, লালমনিরহাটে একজন, কুড়িগ্রামে চৌদ্দজন, চট্টগ্রামে পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে চারজন, জামালপুরে বাইশজন, টাঙ্গাইলে তিনজন, ফরিদপুরে একজন, মাদারীপুরে একজন ও মানিকগঞ্জে একজন মারা গেছেন। এরমধ্যে পানিতে ডুবে ৬৭ জন ও নৌকা ডুবে আটজন মারা গেছেন। এদের মধ্যে ৫৬ শিশু, পুরুষ তেরোজন ও নারী ছয়জন।

ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, ২৭ জুলাই পর্যন্ত জিআর (গ্র্যান্ট রিলিফ) চাল ২৭ হাজার ৩৫০ টন, জিআর টাকা (নগদ) বরাদ্দ ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া জামালপুরে নৌকা কেনার জন্য আরও সাড়ে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বন্যাদুর্গতদের জন্য ৩ হাজার ৯০০ বান্ডিল ঢেউটিন, ঘর নির্মাণের জন্য ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা, শুকনো খাবারের প্যাকেট ১ লাখ ১৩ হাজার কার্টন, আট হাজার ৫০০ সেট তাঁবু, শিশু খাদ্য কেনার জন্য ১৮ লাখ টাকা, গো-খাদ্য কেনার জন্য ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় সরকার সব সময় সতর্ক বলে উল্লেখ করে এনামুর রহমান বলেন, প্রতি মুহূর্তে বন্যার্তদের খোঁজখবর রাখছি।

এবার সমন্বি^ত কাজের ফলে বন্যার ক্ষতি অনেকাংশে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি এবং সফলভাবে বন্যা মোকাবেলা করতে পেরেছি। এবার মানুষ দাবি করেছেন আমরা ত্রাণ চাই না, বাঁধ চাই। আমরা বারবার বন্যা কবলিত হতে চাই না। আমরা চাই দুর্যোগ সহনীয় বাংলাদেশ।

বন্যা সহনীয় বাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, ২১ জুলাই আমরা জাইকাকে প্রস্তাব দিয়েছি আমাদের বড় বড় নদীগুলোর দু’পাড়ে বাঁধ দিয়ে বন্যা সহনীয় করার জন্য। জাপান আমাদের কথা দিয়েছে, এ সপ্তাহে তৃতীয় দফা মিটিং হবে। মিটিংয়ে আমরা সেই কাজের জন্য একটা চুক্তি করতে পারব।

এ সময় সচিব শাহ্ কামাল জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৩০ হাজার ৩৮৩ জন এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৪ লাখ ৪০ হাজার ৩২ জন। বন্যায় ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৩৭৮ ঘরবাড়ি, ১ লাখ ৫৩ হাজার ৭৩৩ একর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ বন্যায় ৪৫টি গবাদিপশু ও ২২ হাজার ৩৩৯টি হাঁস-মুরগি মারা গেছে। ৬ হাজার ৫৩টি পরিবার ও ৩৩ হাজার ৭৩৫টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চারটি বাঁধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বন্যা কবলিত হয়েছে ২৮টি জেলা, ১৬৩টি উপজেলা, ৪৯টি পৌরসভা ও ৯৬১টি ইউনিয়ন। এছাড়া ৪ হাজার ৯৩৯টি শিক্ষা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ৭ হাজার ২৭ কিলোমিটার সড়ক, ২৯৭টি ব্রিজ বা কালভার্ট, ৪৫৯ কিলোমিটার বাঁধ, ৬০ হাজার ২৮৯টি টিউবওয়েল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সরকারের ত্রাণ পর্যাপ্ত কিনা এ প্রশ্নের জবাবে সচিব শাহ কামাল বলেন, বন্যা এলে সবাই এফেক্টেড হবে। দেশের ২২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করেন। ওই ২২ শতাংশ ত্রাণ পেতে পারেন। কোথায় ত্রাণ পাচ্ছেন না- তা সুনির্দিষ্টভাবে বললে আমরা সেখানে ব্যবস্থা নেব। এ সময় উপস্থিত একজন সাংবাদিক জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ত্রাণ পর্র্যাপ্ত নয় দাবি করলে সচিব তাৎক্ষণিক সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) মোবাইল ফোনে এ বিষয়ের সত্যতা জানতে চান। ইউএনও বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করলে তাৎক্ষণিক ১০০ টন চালের বরাদ্দ দেন সচিব শাহ কামাল।

বন্যায় হতাহতের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যের মিল নেই কেন জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘সেটা হতেই পারে। কারণ আমরা ডিসিদের কাছ থেকে তথ্য নেই। আর তারা সম্ভবত হাসপাতাল থেকে তথ্য নিয়ে থাকে।’ ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

কুড়িগ্রাম ও উলিপুর : জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। শুধু ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৫ সেমি. বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বানভাসিরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। ত্রাণ সহায়তার চেয়ে এখন তাদের বেশি প্রয়োজন পুনর্বাসন সহায়তা।

এদিকে রৌমারীতে পানিতে ডুবে আমিনা (৯) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রোববার দুপুরে সে নিখোঁজ হয়। পরে বিকাল ৪টায় তার মরদেহ স্বজনরা উদ্ধার করেন। এদিকে রোববার বন্যাদুর্গত মানুষদের বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি।

ফরিদপুর : পদ্মার পানি বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমতে থাকলেও ফরিদপুর সদর, চরভদ্রাসন, সদরপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেকে। এদিকে, সরকারি পর্যায়ে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

গাইবান্ধা : সবক’টি নদ-নদীর পানি দ্রুত কমছে। তবে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি এবং সদর উপজেলার চরাঞ্চলের অধিকাংশ ঘরবাড়িতে এখনও অনেক পানি। বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র এবং বাঁধে যারা গবাদি পশু এবং হাঁস-মুরগি নিয়ে অবস্থান করছে তারা ঘরে ফিরে যেতে পারছেন না।

এদিকে সরকারি ত্রাণ তৎপরতা খুবই সীমিত হওয়ায় এসব বানভাসি মানুষকে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, একবারের বেশি কেউ সরকারি ত্রাণ পায়নি।

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) : গত সপ্তাহে বন্যার পানির প্রচণ্ড স্রোতে চৌহালীর মোকারভাঙা সড়কের বেইলি সেতুটি দেবে হেলে পড়ে। এতে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এখানে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে চৌহালী উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, বর্ষার পরই বিধ্বস্ত বেইলি সেতু ভেঙে ৪৫ মিটার আরসিসি গার্ডার নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা হবে।

শেরপুর (বগুড়া) : বাঙ্গালি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় শেরপুরের বিনোদপুর গ্রামের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে এলাকাবাসী আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়রা জানান, বাঙ্গালী নদীতে পানি বৃদ্ধি শুরু হলে বাঁধটির একটি অংশ ধসে পড়ে। তখন সেটি বালু ও মাটির বস্তা ফেলে মেরামত করা হয়। কিন্তু দিন দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বাঁধটি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে নদী তীরবর্তী কয়েকটি বাড়িঘর সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

শেরপুর : চরাঞ্চল থেকে বন্যার পানি খুব ধীর গতিতে নামার কারণে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। এখনও অধিকাংশ গ্রামীন রাস্তা-ঘাট, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এবং ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। বিভিন্ন এলাকায় পানিবাহিত রোগ-বালাই দেখা দিয়েছে।

দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) : বন্যার পানি কমে যাচ্ছে। তবে নগদ অর্থের অভাবে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়া লোকজন ঘরে ফিরতে পারছেন না। রোববার বানভাসি লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পানির স্র্রোতে তাদের বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাতে টাকা না থাকায় মেরামত করতে পারছেন না। তাই বাড়িঘরে ফেরাও সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ১২ লাখ টাকার চাহিদা দেয়া হয়েছিল। ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আরও ৪ লাখ টাকা প্রয়োজন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×