ঘাট সংস্কারের কাজ চলছে: ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু

কক্সবাজারে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত * যে কোনো সময়ে প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে -পররাষ্ট্র সচিব

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘাট সংস্কারের কাজ চলছে: ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু
ফাইল ছবি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। টেকনাফের কেরুণতলী ঘাট দিয়ে তালিকাভুক্ত ৩ হাজার ৫৪০ রোহিঙ্গাকে প্রথম পর্যায়ে মিয়ানমার ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে শুরু হতে পারে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম। এ জন্য শনিবার থেকে ওই ঘাট প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে। প্রস্তুতি চলছে টেকনাফের নয়াপাড়া শালবন রোহিঙ্গা শিবিরেও।

রোববার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে গঠিত টাস্কফোর্সের জরুরি বৈঠক হয়েছে কক্সবাজারে।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে রোববার ঢাকায় একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রত্যাবাসন সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে কোনো মুহূর্তেই শুরু হতে পারে। বিষয়টি আলোচনার টেবিলে আছে।’

পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের কাছে সব সময় একটি অগ্রাধিকার ইস্যু এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে। যদি রোহিঙ্গারা ফিরে না যায়, তবে শুধু জমির অধিকার নয় তারা তাদের সব অধিকার হারাবে।

এদিন বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়েও টাস্কফোর্সের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুরুল আলম নেজামী সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিশনার মো. আবুল কালাম যুগান্তরকে বলেন, অনেকদিন টাস্কফোর্সের বৈঠক হয় না। সেজন্য আমরা বসেছিলাম। ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের যে কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে তা নিয়েও এ বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আমরা সব সময়ই প্রস্তুত। প্রত্যাবাসনের ঘাট সংস্কারের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বর্ষাকাল হওয়ায় ঘাটটি সংস্কারের প্রয়োজন পড়েছে। ওটা স্বাভাবিক কার্যক্রমেরই অংশ।’

যুগান্তরের কক্সবাজার প্রতিনিধি শফিউল্লাহ শফি জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে টেকনাফের কেরুণতলী প্রত্যাবাসন ঘাট ও নয়াপাড়া শালবন রোহিঙ্গা শিবিরে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। রোববার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রত্যাবাসন টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকে অংশ নেয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে যুগান্তরকে বলেন, আগামী ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। যেহেতু রোহিঙ্গাদের নিতে মিয়ানমার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, সেহেতু প্রত্যাবাসন সফল হতে কোনো জটিলতা আছে বলে মনে হয় না। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যাবাসন সফল করতেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তবে বৈঠকে আর কী আলোচনা হয়েছে তা বলতে রাজি হননি তিনি।

এর আগে বৈঠকে যাওয়ার সময়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যা যা প্রয়োজন তা করা হবে। সরকারের নির্দেশনা মতে, আমরা প্রত্যাবাসন সফল করতে বদ্ধপরিকর। আজকের বৈঠক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় খুবই গুরুত্ব বহন করে।’

ঘাট প্রস্তুতের কাজ চলছে : কক্সবাজার প্রতিনিধি আরও জানান, শনিবার টেকনাফের সদর ইউনিয়নের কেরুণতলী প্রত্যাবাসন ঘাট প্রস্তুত করার কাজ শুরু হয়। এ লক্ষ্যে কিছু শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে একইদিন নয়াপাড়া শালবন রোহিঙ্গা শিবিরে সিআইসি কার্যালয়ের পাশে ‘প্রত্যাবাসনের তালিকায়’ নাম থাকা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য তড়িঘড়িভাবে প্লাস্টিকের ছোট ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে বলে জানান একাধিক সূত্র।

ঘাটের দায়িত্বে থাকা প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শহীদ জানান, এই ঘাট দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হওয়ার কথা রয়েছে। তাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এখানে কয়েকদিন ধরে কাজকর্ম চলছে। একইভাবে প্রত্যাবাসন ঘাটে দায়িত্বরত ১৬ আনসার ব্যাটালিয়নের হাবিলদার মো. আইনুল হক বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঘাটে কয়েকদিন ধরে কাজ চলছে। তাদের আমরা সহযোগিতা করছি।

উল্লেখ্য, এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বর নির্ধারিত সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রতিবাদের মুখে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। ওই সময় উখিয়ার ঘুমধুম ও টেকনাফের নাফ নদীর তীরে কেরুণতলী (নয়াপাড়া) প্রত্যাবাসন ঘাট নির্মাণ হয়েছিল। এর মধ্যে টেকনাফের প্রত্যাবাসন ঘাটে নির্মাণ করা প্যারাবনের ভেতর দিয়ে লম্বা কাঠের জেটি, ৩৩ আধাসেমি টিনের থাকার ঘর, চারটি শৌচাগার রয়েছে। সেখানে ১৬ আনসার ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।

যে কোনো সময়ে প্রত্যাবাসন শুরু- পররাষ্ট্র সচিব : রোববার বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি আলোচনার আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন পররাষ্ট্র সচিব। রেড এন গ্রি রিসার্চ আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, বিআইআইএসের চেয়ারম্যান ও চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফায়েজ আহমেদ।

অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র সচিবের কাছে প্রশ্ন ছিল, ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা নাগরিকদের প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে কিনা। এর জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আলোচনার টেবিলে আছে। প্রত্যাবাসন যে কোনো সময় শুরু হতে পারে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘পর্দার অন্তরালে অনেক কিছু হচ্ছে, চেষ্টা চলছে। তবে সব চেষ্টা সফল হবে এমন নয়। আগামী কয়েক সপ্তাহ আমরা রোহিঙ্গাদের উৎসাহিত করব, যাতে তারা নিজ দেশে ফিরে যায়। এটা শুধু বাংলাদেশের নয়, এটা রোহিঙ্গাদেরও প্রধান উদ্দেশ্য। প্রত্যাবাসনটি তাদের কল্যাণেই করা হবে। তারা যদি ফিরে না যায়, তবে শুধু জমির অধিকার নয়- তারা তাদের সব অধিকার হারাবে।’

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, অনেকে রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশ বনাম মিয়ানমারের সমস্যা বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। এটি প্রকৃতপক্ষে মিয়ানমার এবং তাদের লোকদের মধ্যে সমস্যা।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান তিনটি। প্রথমটি প্রত্যাবাসন, পরেরটি পুনর্বাসন এবং শেষটি সমাজে পুনর্বাসন করে নেয়া (রিইন্টিগ্রেশন)। এখন বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের রিইনটিগ্রেশন করে নেবে কিনা সে ব্যাপারে আমার বক্তব্য হচ্ছে অবশ্যই না। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাদের রিইনটিগ্রেশনের সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিকীকরণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে এ বিষয়ে আরও সচেষ্ট হতে হবে।’

বিআইআইএসের চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত মুনশি ফায়েজ আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গাদের পুরো বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারের কয়েকজন জেনারেল, কয়েকজন বৌদ্ধ নেতা ও কিছু রাজনৈতিক নেতা সুবিধা নিচ্ছেন। কিন্তু প্রকারান্তরে তারা মিয়ানমারের সার্বিক নাগরিকদের বিপদে ফেলছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×