২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ১৬১৫ জন

ডেঙ্গু ঝুঁকিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা

আরও ৬ জনের মৃত্যু * শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তনের পরামর্শ

  রাশেদ রাব্বি ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু আক্রান্ত
ডেঙ্গু আক্রান্ত। ছবি: যুগান্তর

ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রাজধানীর অধিকাংশ স্কুল-কলেজ- এমন মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গুর জীবাণু বাহক এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংসে সরকারের নির্দেশ থাকলেও অদ্যাবধি তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।

অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য নিরাপদ স্থান। কারণ বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টয়লেট-বাথরুম নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের আঙ্গিনা ও আশপাশে পানি জমে থাকে। স্প্রে করা হয় না শ্রেণিকক্ষে মশা মারার ওষুধ।

আর কক্ষগুলো থাকে কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। যেখানে মশা লুকিয়ে থাকতে পারে। এছাড়া মানুষ বেশি থাকায় এডিস মশা একই সময়ে একাধিক জনকে কামড়ে তার রক্তের চাহিদা পূরণ করতে পারে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত মশা মারার ওষুধ স্প্রে করাসহ প্রয়োজনে স্কুল-কলেজের সময়সূচি পরিবর্তন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রসঙ্গত, ঈদের ছুটি শেষে রাজধানীর অধিকাংশ স্কুল খুলেছে সোমবার। আর কলেজগুলো খুলবে শনিবার।

এ প্রসঙ্গে জানাতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) স্থাপিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ সেলের প্রধান পরিচালক অধ্যাপক প্রবীর কুমার ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, স্কুল-কলেজ থেকে যাতে ডেঙ্গু বিস্তার করতে না পারে, সে জন্য ঈদের ছুটির মধ্যে একদিন পরপর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।

বিশেষ করে ফুলের টব, বাথরুমের কমোড, বেসিন এবং প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায় পানি জমে না থাকে সেগুলো খেয়াল রাখা হয়েছে। এখন যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে এডিসের প্রজনন ক্ষেত্র থেকে থাকে, সেগুলো হয়তো নজরে আসেনি। আর সারা বছরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু নিধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সামান্য কমলেও বিভিন্ন স্থানে আরও ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ১৬১৫ জন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছিল ১৭০৬ জন।

অর্থাৎ এ সময়ে রোগী কমেছে ১০৯ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৪ হাজার ৭৯৭ জন।

যার মধ্যে শুধু আগস্টের ১৯ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ৩৬ হাজার ৩৩৬ জন। যদিও ডেঙ্গু রোগী আর বাড়বে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা।

সোমবার বিকালে তার দফতরের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭ শতাংশ ও ঢাকার বাইরে রোগীর সংখ্যা ৫ শতাংশ কমেছে।

আক্রান্তদের সংখ্যার সূচকে নিুগতি পর্যবেক্ষণ করছি। আশা করছি, এই নিুগতি অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, সকালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সংশ্লিষ্ট সব ডিরেক্টর ও লাইন ডিরেক্টরের উপস্থিতিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সিভিল সার্জন ও ইউএইচএফপিওদের ডেঙ্গুর প্রতিকার, প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নানা নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

সরকারের রোগতত্ত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) জরিপে দেখা গেছে, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী।

দেশে মোট আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে শূন্য থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরোগীর হার ২৭ শতাংশ।

এর মধ্যে এক বছরের নিচে ২ শতাংশ, এক থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু ৮ শতাংশ এবং ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশু ১৭ শতাংশ। তাই ঈদের ছুটি শেষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে স্কুল-কলেজ খোলার আগের দিন পরিচ্ছন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ক্ষেত্রে প্রতিটি বদ্ধঘরে, পর্দার আড়ালে, বেঞ্চে-চেয়ারে-টেবিলের নিচে মশার ওষুধ স্প্রে করতে বলা হয়েছে। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের মেঝে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে।

কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি থাকলে সেটি ভালোভাবে মেজে পরিষ্কার করতে এবং ছুটির পর পানি জমতে পারে এমন পাত্র অপসারণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. একেএম ছামসুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, স্কুল-কলেজ থেকে ডেঙ্গু নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে সকালে স্কুল শুরুর সময় পিছিয়ে দিতে হবে।

যেসব স্কুল খুব ভোরে শুরু হয় সেগুলো একটু পিছিয়ে দিতে হবে। কারণ সূর্যোদয়ের পরের দু’ঘণ্টা এডিস বেশি কামড়ায়। অন্যদিকে সূর্যাস্তের কমপক্ষে দু’ঘণ্টা আগে স্কুল বন্ধ করতে হবে।

বর্তমান সময়ে তিনটার দিকে স্কুল বা কলেজ ছুটি দিলে ভালো হয়। তাহলে এডিসের কামড়ের মাত্রা কমে আসবে। তাছাড়া অন্যান্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা তো নিতেই হবে।

এসব বিষয়ে বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে আমদের দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং নতুন করে যেন রোগী না বাড়ে সেজন্য উন্নত মানের ফগিং মেশিন ও কার্যকর ওষুধ ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ এলাকায় ফগিং করে প্রাপ্তবয়স্ক এডিস মশা মারতে হবে।

পাশাপাশি প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের আঙ্গিনায় ব্যাপক হারে ফগিং করে পুরো এলাকা মশামুক্ত করতে হবে। আর শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত পরিমাণ স্প্রে করতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডেঙ্গু দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই এক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এছাড়া মানুষ ও মশার মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে মশা মানুষকে কামড়াতে না পারে।

এক্ষেত্রে ফুল হাতার জামা-পায়াজামা পরা, মশারি ব্যবহার করা, বাড়িতে অ্যারোসল স্প্রে করা, গায়ে মশক নিরোধ স্প্রে বা ক্রিম ব্যবহার করতে হবে।

ছয় জনের মৃত্যু : ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এরা হলেন- খুলনার রূপসা উপজেলার খাঁজাডাঙ্গা গ্রামের সবজি বিক্রেতা মিজানুর রহমান (৪০), নেত্রকোনার কেন্দুয়ার আবদুল লতিফের ছেলে আনোয়ার হোসেন (৪০) ও ফরিদপুর সদরের নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের গোলডাঙ্গীচর গ্রামের শেখ শফিউদ্দিনের ছেলে দেলোয়ার হোসেন (৪৫) এবং ফরিদপুর শহরের কমলাপুর বটতলা এলাকার সামিয়া আক্তার নামের এক গৃহবধূ, ময়মনসিংহের আনোয়ার হোসেন এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুরের সেলিমের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে যুগান্তরের পাঠানো প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী গত ১৯ দিনে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৭৭ জনে।

ময়মনসিংহ ব্যুরো জানায়, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোববার সন্ধ্যা ও রাতে এবং সোমবার বিকালে রাসেল মিয়া, আনোয়ার হোসেন ও সেলিম মিয়া নামে তিন জন মারা গেছে।

নিহত রাসেল মিয়ার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়ায়, আনোয়ার হোসেনের বাড়ি নেত্রকোনা জেলা কেন্দুয়ায় এবং সেলিমের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এবিএম সামসুজ্জামান খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আনোয়ার হোসেন নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল থেকে এবং রাসেল মিয়া কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে রেফার্ড হয়ে রোববার বিকালে ভর্তি হয়।

এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে মারা যায় রাসেল মিয়া এবং রাত ১টার দিকে মারা যায় আনোয়ার হোসেন। রাসেল মিয়া কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার মঞ্জু মিয়ার ছেলে। আনোয়ার হোসেন নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার আবদুল লতিফের ছেলে।

এদিকে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) ভর্তি সেলিম নামে একজন সোমবার বিকাল ৩টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।

এ মৃত্যুর বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এবিএম সামসুজ্জামান জানান, জ্বরে আক্রান্ত সেলিমের শারীরিক অন্যান্য সমস্যাও ছিল। ফলে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার রিপোর্টগুলো ঢাকা আইসিইআরডিতে পাঠানো হয়েছে।

যুগান্তরের ফরিদপুর ব্যুরো জানায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেলোয়ার হোসেন (৪৫) নামের মসজিদের এক খাদেমের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার বেলা সাড়ে ১০টার দিকে সে মারা যায়।

দেলোয়ার হোসেন ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের গোলডাঙ্গী গ্রামের সফিউদ্দিন আহমেদের ছেলে। সে ফরিদপুর শহরের পূর্বখাবাসপুরস্থ লঞ্চঘাট জামে মসজিদের খাদেম ছিলেন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হয় দেলোয়ার।

অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় রোববার রাতে তাকে ফরিদপুরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে সকালে তার মৃত্যু হয়।

এদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ফরিদপুর শহরের কমলাপুর বটতলা এলাকার সামিয়া আক্তার নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে।

রোববার রাত পৌনে ৮টার দিকে তিনি ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহতের স্বজনেরা জানায়, ফরিদপুর শহরের কমলাপুর বটতলা এলাকার সৈয়দ আবু সালেহ মো. মুসার কন্যা সামিয়া আক্তার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ১২ আগস্ট প্রথমে ফরিদপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল ও পরে ডায়াবেটিক হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি গত ১৮ আগস্ট রাত পৌনে ৮টার দিকে মারা যান।

খুলনার রূপসা উপজেলার খাঁজাডাঙ্গা গ্রামের সবজি বিক্রেতা মিজানুর রহমান (৪০) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরপি) শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, মিজানুর বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সোমবার সকাল ৭টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×