ব্যাংক ঋণের জামানত: দুর্নীতি বন্ধে চালু হচ্ছে তথ্যভাণ্ডার

ঋণগ্রহীতার সব তথ্য একসঙ্গে পাওয়া যাবে * শনাক্ত করা হবে একই জমি একাধিকবার জামানত, ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রকল্প, বন্ধক জমির কম ও বেশি মূল্য প্রদর্শন

  মিজান চৌধুরী ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি
দুর্নীতি। প্রতীকী ছবি

ব্যাংক ঋণের বিপরীতে জামানত সংক্রান্ত জালিয়াতি ধরতে চালু হচ্ছে ‘তথ্যভাণ্ডার’। এর নাম হবে কালেক্টরাল ইনফরমেশন সিস্টেম। এই ভাণ্ডারে ঋণগ্রহীতার সব তথ্য থাকবে।

জামানতের বিপরীতে ভুয়া, অস্তিত্বহীন জমি বা প্রকল্প, ব্যাংকে বন্ধক দেয়া জমির প্রকৃত মূল্য প্রদর্শন না করলে তা ধরা পড়বে তথ্যভাণ্ডারে। পাশাপাশি একই জমি জামানত রেখে একাধিক ঋণ নেয়ার বিষয়টিও শনাক্ত করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এটি কার্যকর হলে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেয়ার প্রবণতা কমে আসবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তথ্যভাণ্ডার তৈরির পেছনে জোর দিয়েছেন।

সম্প্রতি তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডিদের সঙ্গে বৈঠকে তথ্যভাণ্ডার গঠনসহ কয়েকটি নির্দেশও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে যে গ্যারান্টি নেয়া হয়, তা স্বচ্ছ হতে হবে। বন্ধক হিসেবে জমি ও দালান সরেজমিন পরিদর্শন এবং যাচাই করতে হবে।

এছাড়া খেলাপি ঋণের ঘটনা ঘটে ব্যাংক কর্মকর্তা ও ঋণগ্রহীতাদের যোগসাজশে। এজন্য প্রতিটি ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে যাচাই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন।

প্রসঙ্গত, অস্তিত্বহীন ও ভুয়া জামানতের মাধ্যমে বহুল আলোচিত বেসিক ব্যাংকের ১৮ হাজার কোটি টাকা খেলাপির মধ্যে ৩ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা লুটপাট হয়। আর ৩৮৯ কোটি টাকার জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপ হাতিয়ে নেয় আড়াই হাজার কোটি টাকা।

এই গ্রুপ ৬ হাজার ১১৭ দশমিক ৬০ শতাংশ জমি মর্টগেজ রাখে ব্যাংকে। ব্যাংক কর্তৃক নিরূপিত ওই জমির মূল্য হচ্ছে ৩৮৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। একই কায়দায় প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিসমিল্লাহ গ্রুপ।

এই তিনটি ঘটনা ছাড়াও জামানত জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে কতিপয় ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করছে। ঋণ জামানতের বিপরীতে এই দুর্নীতি বন্ধ করতে এই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তথ্যভাণ্ডার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, এ উদ্যোগটি ভালো, যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়।

কারণ এর মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের সব ধরনের তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যাবে। এখন দেখতে হবে তথ্যভাণ্ডার গঠনের পর এটি কীভাবে পরিচালনা করা হবে।

জানা গেছে, তথ্যভাণ্ডার নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি এর অগ্রগতি জানতে চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এর জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আর্থিক বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে একটি চিঠি দেয়।

সেখানে বলা হয়, জামানত তথ্যভাণ্ডারের সফটওয়্যারটি চূড়ান্ত করার কাজ প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্যভাণ্ডারের জন্য তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান।

তবে এ পদ্ধতির সার্বিক নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে নতুন সিস্টেমটি চালু করা হয়নি। কারণ পুরনো ডাটা সেন্টার থেকে নতুন তথ্যভাণ্ডারে অন্যান্য সিস্টেম মাইগ্রেশন হচ্ছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষামূলক এ তথ্যভাণ্ডারের কার্যক্রম খুব শিগগিরই চালু হবে। এরপর এটি পরীক্ষামূলক ৬ মাস চালানো হবে। তা সফল হলে চূড়ান্তভাবে এর কার্যক্রম চালু করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, জামানত সংক্রান্ত জালিয়াতির ঘটনা ব্যাংকগুলোয় অহরহ ঘটছে। এটি হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, আমার নিকটাত্মীয় যাত্রাবাড়ীতে ৫ কাঠার ওপর ভবন নির্মাণ করেছে।

সে একটি ঋণের জন্য আবেদন করলে ব্যাংক জমি ও ভবনের প্রকৃত মূল্য দেখিয়েছে ৫০ লাখ টাকা। অথচ তার ভবন নির্মাণে এর চেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে। এটি হয়েছে মূলত ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে দূরত্ব থাকার কারণে।

অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক অতিমূল্যায়ন করে। আবার ঋণগ্রহীতার নিজস্ব সার্ভেয়ার দিয়ে বন্ধক জমির মূল্যায়ন করে। এতে ঘাপলাগুলো হয়।

বেসিক ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা গেছে, তাদের আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে এর মধ্যে শুধু ভুয়া জামানত ও জামানতবিহীন ঋণ নেয়া হয় ২ হাজার ২৪৮ কোটি ৮১ লাখ টাকার। ৫৫টি ঘটনার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের এই অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়।

বাংলাদেশে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) অফিস সূত্রে কিছু ভুয়া জামানতের তথ্য পাওয়া গেছে। ভুয়া জামানত, ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমবিহীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১০০৪ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়। এ অর্থ ব্যবসায়িক কার্যক্রমবিহীন নামসর্বস্ত্র ২টি প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নেয়।

সূত্র আরও জানায়, ওয়ান গ্রুপ নামের একটি কোম্পানিকে ৬৩ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে কনসোর্টিয়াম লোন অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী শর্ত অনুসরণ না করে। অডিট বিভাগ দেখতে পায়, ওয়ান গ্রুপ বিপুল পরিমাণ ঋণ নিলেও তার জামানত হচ্ছে খুবই অপ্রতুল। ফলে ব্যাংকের পুরো ঋণটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করেছে অডিট বিভাগ।

অপর ঘটনায় দেখা গেছে, অস্বিত্বহীন প্রকল্পের নামে প্রায় ৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মেসার্স প্রিটেক্স (প্রাইভেট) লিমিটেড। বর্তমান ব্যাংকের পক্ষ থেকে ওই অর্থ পাওয়া এবং আদায় করা পুরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অডিট বিভাগ দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে। অপর আরেকটি ঘটনায় নামমাত্র সহায়ক জামানতের বিপরীতে অনিয়মিতভাবে একটি প্রকল্পে ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকার ঋণ দেয়া হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×