অনিশ্চয়তার মধ্যেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রস্তুতি চলছে

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কূটনৈতিক রিপোর্টার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুতে অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবুও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ফেরত পাঠাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রত্যাবাসনের তালিকাভুক্ত ৩ হাজার ৪৫০ জনের মধ্যে দুই শতাধিক পরিবারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে।

এতে রোহিঙ্গারা সরকার ও জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিদের সামনে তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী কি না, সে বিষয়ে মত দিয়েছেন। সরকার আজ বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন শুরুতে আগ্রহী হলেও এখনই চায় না এনজিওগুলো। তারা প্রত্যাবাসন শুরুতে আপত্তি জানিয়েছে।

জানা গেছে, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বেশকিছু দাবি পেশ করেছে।

জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ, পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বুধবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা আজ (বুধবার) ২১৪ পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এখন তাদের বক্তব্যগুলো যাচাই-বাছাই করছি।’ বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা কাল (আজ) বলতে পারব।

এখন আমরা আজকের (বুধবারের) কাজ করছি। পরিবারগুলোর বক্তব্য বিচার-বিশ্লেষণ করছি।’ বিষয়টি নিয়ে তিনি আর বিস্তারিত কিছু বলেননি। এদিকে বুধবার ৬১টি এনজিও এক যুক্ত বিবৃতিতে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে।

এতে তারা বলেছে, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনবিষয়ক সাম্প্রতিক খবরে শঙ্কিত এবং উদ্বিগ্ন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তারা নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত। এনজিওগুলো মিয়ানমারে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা ব্যক্ত করে নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমি রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এনজিওগুলো নিরুৎসাহিত করছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন অভিযোগ করার পর প্রত্যাবাসন শুরুর সব প্রস্তুতি সম্পাদনের মধ্যেই তারা এ বিবৃতি দিয়েছে। ঢাকার সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রত্যাবাসন শুরুর ব্যাপারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার বদ্ধপরিকর। তবে এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া শুরু করার আগ্রহ দেখিয়েছে। চীন ও ভারত প্রত্যাবাসনের পক্ষে। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি এক কূটনীতিক বুধবার যুগান্তরকে বলেছেন, প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারলে মিয়ানমার জাতিসংঘে বাংলাদেশকে দোষারোপ করবে।

এদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি পরস্পরকে দোষারোপের খেলায় হারিয়ে যাবে। ফলে ফেরার কার্যক্রম শুরু করাটা খুবই জরুরি। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৭ কিংবা ২৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। তিনি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা ৩ হাজার ৪৫০ জনের মধ্যে দুই শতাধিক পরিবারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) ও ইউএনএইচসিআর মঙ্গল ও বুধবার দু’দিনে টেকনাফের শালবাগান ক্যাম্পে এ সাক্ষাৎকার নেয়।

তালিকায় থাকা ৯৫ ভাগের মাঝে প্রত্যাবাসনের বার্তা পৌঁছানো হয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত আজ বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে প্রত্যাবাসনের জন্য কেরুনতলী ও ঘুমধুম ঘাট প্রস্তুত রয়েছে। এদিকে ক্যাম্পে প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে সেনা, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসারের টহল জোরদার রয়েছে। ২১ আগস্ট টেকনাফে শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

শালবাগান সিআইসি (ক্যাম্প ইনচার্জ) অফিসে সাক্ষাৎকার দেয়া শেষে ফেরার পথে মো. আলম, ইসমাইল, নুর বাহার, নুরুল ইসলাম, নুর হাসান, শব্বির আহমদের সঙ্গে কথা হলে তারা দাবি পূরণ সাপেক্ষে মিয়ানমারে ফিরে যাবেন বলে জানান। অন্যথায় তারা স্বদেশ ফিরতে রাজি নন।

তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে সরাসরি নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটে-বাড়ি ও জমিজমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় আশ্রয়ে থাকাদের নিজবাড়িতে ফেরত, কারাগারে বন্দি রোহিঙ্গাদের মুক্তি, হত্যা, ধর্ষণের বিচার, অবাধ চলাফেরা ও নিরাপত্তা প্রদান।

এসব বিষয়ে রোহিঙ্গাদের একই সুরে কথা বলতে দেখা গেছে, অনেকটা শেখানো বুলির মতো। এদিকে প্রত্যাবাসনবিরোধী একটি চক্র ক্যাম্পগুলোয় সক্রিয় রয়েছে। তাদের চোখ রাঙানিতে তটস্থ সাধারণরা। এমনকি তারা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে। অদৃশ্য এ চক্রের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি নয়।

প্রত্যাবাসনের রাজি ১০-১৫টি পরিবারের খবর জানা গেলেও স্পস্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। টেকনাফ নয়াপাড়া শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের (নং-২৬) ইনচার্জ মো. খালিদ হোসেন জানান, দুই দিনে ২৩৫ পরিবারপ্রধানের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার ২১ পরিবারের সাক্ষাৎ নেয়া হয়েছিল। তবে এদের মধ্যে কত পরিবার প্রত্যাবাসনের জন্য রাজি হয়েছে, তা সাক্ষাৎ প্রক্রিয়া শেষে জানা যাবে। আবার আগের দিনের চেয়ে সাক্ষাৎকার দিতে রোহিঙ্গাদের আগ্রহ বেড়েছে।

প্রত্যাবাসনবিরোধী একটি চক্র সক্রিয় থাকার ব্যাপারে তিনি জানান, কোনো রোহিঙ্গাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে- এরকম কোনো অভিযোগ তিনি পাননি।

টেকনাফ র‌্যাবের কোম্পানি কমান্ডার লে. মির্জা শাহেদ মাহতাব জানান, র‌্যাবের তিনটি টহল দল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিরোধী উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কাজ করছে তারা।

এদিকে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম জানান, ঘুমধুম ঘাট দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হবে। এ ব্যাপারে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

মিয়ানমারের ১ জন, চীনের ২ জনসহ ৩ জন প্রতিনিধি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন। তারা ইতিমধ্যে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। প্রত্যাবাসন তালিকায় থাকা ১ হাজার ৩৩ পরিবারের মধ্যে যে ২৩৫ পরিবারের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়েছে, যাচাই-বাছাই করে তাদের মধ্য থেকে ফিরতে ইচ্ছুকদের চূড়ান্ত করা হবে। রোহিঙ্গাদের পরিবহনের জন্য ৫টি বাস ও ৩টি ট্রাক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাক্ষাৎকার গ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত টেকনাফের কেরুনতলী ও ঘুমধুম ঘাট : প্রত্যাবাসনের জন্য টেকনাফের কেরুনতলী ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ঘাট প্রস্তুত রয়েছে। নাফ নদীর কিনারে কেরুনতলী প্রত্যাবাসন ঘাটে তাদের সাময়িক অবস্থানের জন্য ৩৩টি ঘর ও অন্যান্য সুবিধা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জলপথে প্রত্যাবাসন হলে এ ঘাট দিয়েই ফেরত পাঠানো হবে। অপরদিকে স্থলপথে প্রত্যাবান হলে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ঘাট দিয়ে স্বদেশ ফেরত পাঠানো হবে রোহিঙ্গাদের।

৬১ এনজিও’র বিবৃতি : বুধবার সকালে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশে কর্মরত ৬১টি স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো বিবৃতিতে বলেছে, দুই বছরেও ন্যায়বিচার পায়নি মিয়ানমারে মানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। শরণার্থী হিসেবে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সুরক্ষা ও মর্যাদার জন্য। প্রত্যাবাসনের খবরে তারা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত। যেহেতু এ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত, তাই ভবিষ্যৎ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার সুরক্ষিত হয় না বলে মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, চলতি সপ্তাহের মধ্যে আনুমানিক ৩ হাজার ৪৫০ শরণার্থী প্রত্যাবাসনের সংবাদ প্রকাশ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছাকৃত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় ৬১টি এনজিও। এতে আরও বলা হয়, রাখাইন রাজ্যে এখনও রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার চর্চার ক্ষেত্রে কোনো অর্থপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বাস্তুচ্যুত কমিউনিটির সঙ্গে আলোচনার পরিসর খুবই সীমিত। বৈষ্যম্যমূলক নীতির কারণে রাখাইন রাজ্যে এ জনগোষ্ঠীর চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপের পাশাপাশি পড়াশোনা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার অধিকারের ক্ষেত্রে আরও সীমিত করে দেয়া হয়েছে সুযোগ-সুবিধা।

এছাড়া ২০১২ সাল থেকে প্রায় এক লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গা এবং অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায় রাখাইন রাজ্যের শিবিরে আটকা পড়ে আছে। তারা নিজবাড়িতে ফিরতে পারছে না। সীমিত করে দেয়া হয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার। তাই রাখাইন রাজ্যের অধিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়া এবং শরণার্থীদের নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া এমনকি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত দেয়াসহ তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানায় এনজিওগুলো।

বিবৃতিতে বলা হয়, এনজিওগুলো মনে করে, এদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যের সব সম্প্রদায় যাতে নিরাপদে থাকতে পারে এবং প্রাথমিক পরিষেবা ও জীবিকার সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারে, তা মিয়ানমার সরকারের নিশ্চিত করা উচিত। বর্তমান সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে কর্মরত এই ৬১টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীদের সহায়তা এবং অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতি : রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত রাখতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ পরিবেশে হতে হবে। যদিও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ভার বহন করা বাংলাদেশের জন্য কষ্টকর তবুও বলব, আপাতত প্রত্যাবাসন স্থগিত রাখা হোক।