অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন

বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়বে দ্বিগুণ

তিন বছরে ব্যয় হবে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা * গত তিন বছরে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা

  শেখ মামুনূর রশীদ ও মিজান চৌধুরী ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদেশি ঋণ
প্রতীকি ছবি

২০১৮-২১ অর্থবছর পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় হবে ১২ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। যা গত তিন বছরের ব্যয়ের (৬ হাজার ২শ’ কোটি টাকা) চেয়ে দ্বিগুণ। ঋণের সুদ হার বৃদ্ধি ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ ব্যবহারের কারণে সুদ পরিশোধ ব্যয়ের এ উল্লম্ফন বলে আভাস দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন।

মূলত মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যয় কাঠামো ধরে বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি সংক্রান্ত ব্যয়ের আগাম ধারণা সংক্রান্ত এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১৮-২১ এই তিন অর্থবছরে সুদ-আসলে পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু প্রকৃত ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি গত তিন বছর অর্থাৎ ২০১৫-১৮ অর্থবছরে সুদ-আসলে পরিশোধ করা হয়েছিল ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। যার মধ্যে ঋণ শোধ দেয়া হয় ১৫ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ বাড়ছে। কারণ আগের তুলনায় ঋণ সহায়তা ব্যবহারের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। আর বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে চলে যাওয়ায় ঋণের বিপরীতের সুদের হার বেড়েছে। তাই সুদ পরিশোধ ব্যয়ও বেড়েছে।

সূত্র মতে, ২০১৮-২১ এই তিন অর্থবছরে বিদেশি ঋণের বিপরীতে কি পরিমাণ সুদ পরিশোধ করতে হবে, আসল কত টাকা কাটা হবে এবং একই সময়ে বিদেশ থেকে কত টাকা পাওয়া যাবে এর প্রাক্কলন করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। চলতি বছরে এ ব্যয় আরও বেশি হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুদ খাতে ব্যয়ের আগাম যে প্রাক্কলন করা হয়েছে তা হচ্ছে ৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।

ওই হিসেবে গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে এ খাতে অতিরিক্ত ৭৬৫ কোটি টাকা বেশি সুদ পরিশোধ করতে হবে। আর আগামী অর্থবছরে ঋণের সুদ পরিশোধে প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৮৫০ কোটি টাকা বেশি।

সুদের ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক সহায়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণের পরিমাণও বাড়বে। লাইবরসহ সুদের হার ও নতুন ঋণ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। কারণ বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এতে অর্থনৈতিক মর্যাদায় উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনৈতিক কারণে বিশ্বব্যাংক, জাপানসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের আর্থিক শর্তাবলি আরও কঠিন করেছে।

এছাড়া দেশে বিনিয়োগের চাহিদা পূরণের জন্য বিদ্যুৎসহ অবকাঠামো খাতে অনমনীয় শর্তের ঋণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগামীতে অনমনীয় ঋণের পরিমাণও বাড়বে বলে প্রতীয়মান হয়। সুদ খাতে ব্যয়ও বাড়বে।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ঋণের কঠিন শর্ত ও উচ্চ সুদ কার্যকর করেছে দাতা সংস্থাগুলো। এর মধ্যে শুধু বিশ্বব্যাংক তাদের ঋণের সুদের হার শূন্য থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ কার্যকর করেছে। এর সঙ্গে আগে থেকে অব্যাহত থাকা সার্ভিস চার্জ দশমিক ৭৫ শতাংশ বলবৎ রয়েছে। তাই সব মিলিয়ে সুদের হার দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশ।

প্রথমবারের মতো ‘সাসটেইনেবল ফরেস্ট অ্যান্ড লাভলিহুডস (সুফল)’ প্রকল্পের মাধ্যমে এ সুদ হার কার্যকর হয়। এছাড়া ঋণ পরিশোধের সময়ও কমিয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। অর্থাৎ আগে আইডিএ তহবিল থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধে সময় পাওয়া যেত ৩৮ বছর। এখন ৮ বছর কমিয়ে ৩০ বছর করা হয়েছে। অন্যদিকে আগে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ৬ বছরের গ্রেস পিরিয়ড (রেয়াতকাল) ছিল। কিন্তু এখন এক বছর কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সব দিক দিয়েই বিশ্বব্যাংকের ঋণে শর্ত কঠিন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এমকে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে চলে যাওয়ায় যে কোনো ঋণ বেশি সুদে নিতে হবে বাংলাদেশকে। যা আগে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ কম সুদে দিত। যে কারণে আগামীতে পর্যায়ক্রমে ঋণের সুদ বেশি দিতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে বাংলাদেশ যেন ঋণ ও সুদ পরিশোধের সক্ষমতার বাইরে চলে না যায়। যে পরিমাণ ঋণ নেয়া হয়েছে বাংলাদেশ তা শোধ দিতে পারবে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।

তিনি আরও বলেন, এসব উচ্চ সুদের ঋণ সঠিক ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

সাধারণ ঘাটতি বাজেট পূরণের লক্ষ্যে সরকার বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহার হয় এসব ঋণ। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত পাঁচ বছরে ৫ হাজার ১শ’ কোটি টাকা ডলারের বৈদেশিক ঋণ সহায়তার চুক্তি হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের মূল প্রকল্প, এমআরটি প্রকল্প ও মাতারবাড়ীসহ বড় কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরগুলোতে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ বাড়বে।

প্রতিবেদন সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ নেয়া হয়েছে ৬৩৫ কোটি ডলার, একই সময়ে প্রকৃত ঋণ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয় ১২৪ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৮৪৮ কোটি ডলার, এর বিপরীতে একই সময়ে প্রকৃত ঋণ পরিশোধ খাতে ব্যয় হবে ১৩৫ কোটি ডলার। আর আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে ঋণপ্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৮৮৫ কোটি ডলার। একই সময়ে ঋণ পরিশোধের লক্ষ্য হচ্ছে ১৪০ কোটি ডলার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: jugantor.ma[email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×