রোহিঙ্গা সংকটের দু’বছর: প্রত্যাবাসনে আস্থার অভাব

নিরাপত্তা নিশ্চিতে মিয়ানমারকেই উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে

  মাসুদ করিম ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের ভিড়

রোহিঙ্গা সংকটের দু’বছর অতিবাহিত হলেও পারস্পরিক আস্থার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের পদক্ষেপের ওপর কোনো আস্থা রাখতে পারছে না। অপরদিকে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতেও আন্তরিক নয় মিয়ানমার।

এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তাদের নিরাপত্তার জন্যে মিয়ানমারের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। রোহিঙ্গা সংকটের দু’বছর পূর্তির ঠিক পূর্বমুহূর্তে তাদের প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় উদ্যোগটিও ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্লেষকরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন।

তারা বলেন, মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।

মিয়ানমারের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য নিহত হন। তার প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, নারীদের ধর্ষণ ও তাদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পেরিয়ে দলে দলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশে আগে থেকে থাকা তিন লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে নতুনরা যুক্ত হওয়ার ফলে বর্তমানে এ দেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখের উপরে।

রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলিমদের চিরতরে বিতাড়িত করতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সব ধরনের নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে ও চীনের বিশেষ উদ্যোগে রোহিঙ্গা সংকটের দু’বছর পূর্ণ হওয়ার লগ্নে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তালিকা থেকে প্রাথমিকভাবে তিন হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার নাম বাছাই করে পাঠায় মিয়ানমার। বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যাক। সে জন্য সরকারের ত্রাণ, পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসন কমিশন এবং জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআরের যৌথ কমিটি ফেরত পাঠানোর তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের মতামত গ্রহণ করে।

কিন্তু কোনো রোহিঙ্গাই মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী হয়নি। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এর আগে গত নভেম্বরে একবার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তখনও কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চায়নি।

রোহিঙ্গারা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ কিছু দাবি তুলে ধরে। এসব দাবি মিয়ানমার সরকার পূরণ করলেই রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফিরে যাবে।

সরকারের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে যে, দেশি-বিদেশি কতিপয় এনজিও রোহিঙ্গাদের ফিরে না যাওয়ার জন্যে উদ্বুদ্ধ করেছে। এসব এনজিও রোহিঙ্গা শিবিরে প্রত্যাবাসনবিরোধী লিফলেট বিতরণ করেছে বলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন অভিযোগ করেন।

তিনি মন্তব্য করেন, এসব এনজিওকে চিহ্নিত করা হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্যে নির্ধারিত ২২ আগস্টের আগের দিন রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত ৬১ এনজিওর যুক্ত বিবৃতিতে। তারা বিবৃতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না করার জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানায়।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ কতটা আন্তরিক তা দেখার জন্য চীন ও মিয়ানমারের প্রতিনিধি কক্সবাজারে পুরো প্রক্রিয়াটি প্রত্যক্ষ করেন।

চীনের প্রতিনিধি মন্তব্য করেন যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তার দেশ দুই বন্ধু- বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে উৎসাহিত করে যাবে।

অপরদিকে, বাংলাদেশের আরেক বড় প্রতিবেশী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকালে মন্তব্য করেছেন যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হল ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জাতীয় স্বার্থ। ফলে আঞ্চলিক প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠককে সামনে রেখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার কিছুটা রাজি হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৭ কিংবা ২৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন। এতে তিনি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সিএম শফি সামি শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে অনাগ্রহী কারণ তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। তাদের আরও কয়েকটি দাবি রয়েছে তবে সবচেয়ে বড় দাবি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রয়াস আরও শক্তিশালী করতে হবে। চীন ও ভারতকে এই উপলব্ধিতে আনতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকট সমস্ত অঞ্চলের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের গভীর নিরাপত্তাহীনতা যতদিন দূর না হবে ততদিন তারা ফিরে যেতে চাইবে না। রোহিঙ্গাদের এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। যদিও প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে এখন কিছুটা নড়চড় হচ্ছে। আশা করি, নিরাপত্তার প্রশ্নে মিয়ানমার সরকার উদ্যোগ নেবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির যুগান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। নিরাপত্তার প্রশ্নে রোহিঙ্গারা যাবে কি যাবে না- এ দ্বিধায় আছে। এনজিওগুলো তাদের প্রত্যাবাসনবিরোধী প্রচারণা করেছে। রোহিঙ্গা আমাদের জন্য বিরাট এক সমস্যা। দু’বছরে প্রায় এক লাখ শিশু জন্ম নিয়েছে। মিয়ানমার সেনাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে প্রবেশে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তাতে কাজ হচ্ছে না। কারণ মিয়ানমারের সেনারা যুক্তরাষ্ট্রে যায় না। মিয়ানমারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের ঘিরে আঞ্চলিক সংকট তৈরি করে তাতে ভূমিকা রাখার চেষ্টা হতে পারে। জঙ্গিবাদ সৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে। এই বিষয়টি পুরো অঞ্চলের জন্য অশনিসংকেত। তাই কৌশলগত কারণে চীন ও ভারতের উপলব্ধি করা উচিত যে, অস্থিতিশীলতার বীজ বপন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা- এই তিন পক্ষই মূল বিষয়। অন্য পক্ষ যদি বাধাগ্রস্ত করে তবে তাদের চিহ্নিত করা উচিত। একটা দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে কাজ করা উচিত। আমি নিজে কয়েকবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়েছি। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছি। রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চায়। যদি তাদের চাওয়ার জায়গাকে বিপথে নেয়া হয় তবে তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া নিজ স্বার্থেই প্রয়োজন।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত বিদেশি এনজিও মেডিসিন সান ফ্রন্টিয়ার্সের (এমএসএফ) ইমার্জেন্সি কো-অর্ডিনেটর আরুন জেগান বলেন, যখন আমি রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি, আমি সবচেয়ে বেশি চাই যেন তারা নিরাপদে নিজেদের বাড়ি ফিরতে পারে। আমি আশা করি, ততদিন পর্যন্ত তারা ব্যাপকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে, যতদিন শিক্ষার অধিকার ও আশানুরূপ বৈধ স্বীকৃতি পাবে। যদি এই কাজগুলো এখন করা না হয়, আমার আশঙ্কা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আগামী দু’বছরও একই অবস্থায় থাকবে। তখন হয়তো আরও কম সেবা তারা পাবে। মানবিক সহায়তার হার যে কোনো পরিমাণে কমানো হলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বাবলম্বী হওয়ার পথ উন্মুক্ত করতে হবে।

টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, একদিন বন্ধ থাকার পর আজ আবারও রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু হবে। নির্ধারিত টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে অবশিষ্ট ৬৯৮ পরিবারের সাক্ষাৎকার।

এর আগে ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনকে সামনে রেখে নির্বাচিত ১০৩৭ পরিবারের ৩ হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গার মধ্যে ৩৩৯ পরিবার সাক্ষাৎকার পর্বে তাদের মতামত দেন। এর মধ্যে একজনও মিয়ানমারে ফিরে যেতে সম্মত হননি।

টেকনাফ শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. খালেদ হোসেন জানান, শনিবার থেকে যথারীতি কার্যক্রম শুরু হবে। কোনো পরিবার ফিরে যেতে সম্মত হলে মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলে প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে।

শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ব্লক মাঝি জাকারিয়া জানান, এ অবস্থায় কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যাবে না। নিজের ঘরবাড়িতে ফিরতে না পারলে ক্যাম্পে থাকার জন্য তারা কেন যাবেন? এখানেও তো ক্যাম্পেই আছেন। স্বদেশে ফেরার পার্থক্যটা কি থাকল তাহলে।

প্রত্যাবাসন সফল না হওয়ায় উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় চলছে।

টেকনাফ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক গোরা মিয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, বড় আফসোস সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন কিন্তু বর-কনের খবর নেই। তাদের খবর না রেখে এ আয়োজন করল কে? লোক দেখানো আয়োজন কেন? ভেল্কিবাজির কারণ কি? এভাবে অনেকে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও এনজিওদের দায়ী করেছে অনেকে ।

রোহিঙ্গাদের দাবি মধ্যে রয়েছে- রোহিঙ্গা স্বীকৃতি দিয়ে নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটে-বাড়ি ও জমি-জমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় এডিবি ক্যাম্পে আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়িতে ফেরত, বুচিদং ও মংডু জেলায় বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রোহিঙ্গাদের মুক্তি, হত্যা-ধর্ষণের বিচার ও জাতিসংঘ রক্ষী মোতায়েন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×