জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন: গণহত্যার অভিপ্রায়েই রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ

মিয়ানমারে এখনও সংখ্যালঘুদের যৌন নিপীড়ন করছে সেনাবাহিনী * আইসিসিকে এখনই বিচার শুরু করতে হবে -এইচআরডব্লিউ

  যুগান্তর ডেস্ক ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা বর্বরতা
রোহিঙ্গা বর্বরতা। ছবি: সংগৃহীত

সংখ্যালঘু মুসলমানদের নির্মূল করতে গণহত্যার অভিপ্রায় থেকেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়ন করে। দেশটির পশ্চিমের রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাস দমনের নামে সেনা অভিযান নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে এমন উপসংহার টানা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত শত রোহিঙ্গা নারী ও মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তথ্য-প্রমাণ বলছে, ধর্ষণের ৮০ শতাংশ ঘটনাই ইচ্ছে করে ঘটানো হয়েছে। গণধর্ষণের যত ঘটনা ঘটেছে তার ৮২ শতাংশের দায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে কয়েকটি সীমান্ত পুলিশ পোস্টে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ হামলায় ৯ পুলিশ নিহত হওয়ার পর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সেনা অভিযান শুরু হয়। প্রাণ বাঁচাতে সেখানকার প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র ও নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পালিয়ে আসা ওইসব রোহিঙ্গার অনেকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বা শরীরে পোড়া ক্ষত নিয়ে আসেন। নারীদের শরীরে গণধর্ষণের শিকার হওয়ার চিহ্ন ছিল স্পষ্ট।

পালিয়ে আসা এসব মানুষের অভিযোগ ছিল, সেনাবাহিনী গ্রামের পর গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালায় এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। নারী ও শিশুদের ধর্ষণ করছে। অভিযোগ তদন্তের জন্য ওই বছরই জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল বিভিন্ন দেশের তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত দল (স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন) গঠন করে।

মিয়ানমার সরকার গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত কাউকে আটক করেনি জানিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গণহত্যার অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের ‘জেনোসাইড কনভেনশন’-এর অধীন বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানে ব্যর্থতার দায় মিয়ানমার সরকারের।

মিয়ানমার সরকার শুরু থেকেই রাখাইন রাজ্যে বেসামরিক মানুষদের ?ওপর দমন-নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণের সুযোগ তারা কাউকে দেয়নি।

এমনকি, জাতিসংঘের তদন্ত দলকেও রাখাইন রাজ্যে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। যে কারণে তদন্ত কর্মকর্তারা বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান, গবেষক এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কথা বলে এ তদন্ত প্রতিবেদনটি তৈরি করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকেই রাখাইনে নারী ও মেয়েদের ওপর যৌন সহিংসতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করতেই সেখানে গণধর্ষণ চালায়। যুক্তিসঙ্গতভাবেই একে গণহত্যার ষষ্ঠ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে আমরা আমাদের প্রতিবেদনের ইতি টানছি।

বিপুল সংখ্যায় এবং বেছে বেছে নারী ও মেয়েদের হত্যা, সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারী ও মেয়েদের বেছে বেছে ধর্ষণ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ছোট শিশুদের ওপর আক্রমণ, নারীদের যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত এবং শরীর, বিশেষ করে গাল, গলা, স্তন ও উরুতে কামড়ের দাগ দেখে তারা এই উপসংহারে পৌঁছেছেন বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তারা।

রাখাইনে গণহত্যা চালানোর দু’বছর হতে চললেও এখন পর্যন্ত এর জন্য দায়ী কোনো সেনা কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীন বিচারের আওতায় আনা হয়নি। এর মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ‘জঘন্যভাবে নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে’ বলেও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে দুই শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে তদন্তের আহ্বান জানানো হলেও তারা এখনও স্বদর্পে নিজেদের পদে বহাল আছেন। মিয়ানমারের ওই দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নতুন কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তাদের নাম গোপন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।

২০১৮ সালের আগস্টে এ তদন্ত দলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাখাইন অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল গণহত্যা। অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ আখ্যা দিয়ে ওই প্রতিবেদনে আইন প্রয়োগের নামে ভয়ংকর ওই অপরাধ সংঘটনের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ও জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করার সুপারিশ করা করে তদন্ত দলটি।

প্রতিবেদনে রাখাইনের পাশাপাশি শান ও কাচিন অঞ্চলেও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়। এর আগে আরেক প্রতিবেদনে তদন্ত দলটি জানিয়েছিল, রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার ওই অভিযানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নারীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

গণহত্যা প্রমাণে এটিসহ পাঁচটি প্রমাণ তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ চালানো হয়েছে মিয়ানমারে। এবার তারা ষষ্ঠ প্রমাণ উপস্থাপন করল।

এখনও যৌন নিপীড়ন করছে সেনাবাহিনী : মিয়ানমারে সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর মানুষের ওপর এখনও যৌন সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ তদন্ত দলের (ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন) এক প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার এমনটি বলা হয়েছে।

দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় কাচিন ও শান রাজ্য এবং পশ্চিমের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনা সদস্যরা নিয়মিতই ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং নারী, পুরুষ, হিজড়াদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতামূলক নানা কর্মকাণ্ড করে আসছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এ থেকে সেনা সদস্যদের বিরত রাখতে এবং অন্যায়কারীদের সাজা দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কঠোর হতে হবে।

আরও বলা হয়, নারীদের এমনভাবে আঘাত করা হয়েছে যেন তারা স্বামীর সঙ্গে সহবাস করতে না পারে এবং সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ আক্রমণই ছিল নারী ও কিশোরীদের ওপর। তাদের সিগারেটের আগুনে পোড়ানো হয়েছে, ছুরি দিয়ে কাটা হয়েছে এবং সামরিক ঘাঁটিতে বেশ কয়েকজনকে যৌনদাসী করেও রাখা হয়েছে।

তদন্ত দলের সদস্য রাধিকা কুমারাসামি বলেন, অবশ্যই এ নীরবতা ভাঙবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের গণহত্যার মাধ্যমে তারা ধ্বংস করতে চেয়েছিল এবং তাদের পালাতে বাধ্য করেছে।

প্রত্যাবাসন সম্পর্কে তিনি বলেন, এখনও তাদের ফিরে আসার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি। তারা যে কোথায় ফিরে যাবে তাও নিশ্চিত নয়। তবে এটা নিশ্চিত তারা নিজেদের গ্রামে ফিরতে পারবে না।

বিচার শুরুর সুপারিশ এইচআরডব্লিউর : নির্যাতন ও গণহত্যার মাধ্যমে রোহিঙ্গা জাতিকেই অদৃশ্য করে দিতে চেয়েছিল মিয়ানমারের সামরিক জান্তারা। আন্তর্জাতিকভাবে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়লেও এর জন্য সাজা পায়নি দেশটি।

এ নির্যাতনের জন্য মিয়ানমারের বিচার এখনই শুরু করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

রোহিঙ্গা নির্যাতন ও নির্বাসনের ২ বছর পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানায় সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউ বলছে, দাতা ও সচেতন মহলকে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতেই হবে, যেন দেশটি তাদের এ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করে। এ প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছা, নিরাপদ ও সম্মানজনক।

এশিয়া অঞ্চলের সহপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, জাতিগত নিধনের ২ বছর হয়ে গেল। পরে এ নির্যাতন লুকাতে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরের ওপর বুলডোজার চালিয়ে সব প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউ বলছে, রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে কোনো ভূমিকাই নেয়নি মিয়ানমার সরকার। মিয়ানমারে যে ৫ লাখ রোহিঙ্গা এখনও আছে, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের চতুর্দিক দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। তাদের স্বাধীনভাবে চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। তাদের মৌলিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করছে সরকার।

টেকসই জীবনমান অর্জন থেকে তাদের আটকে রাখা হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় খাবার, টেকসই আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার কিছুই পাচ্ছে না। এতকিছু করেও তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। নাগরিকত্বের অধিকার থেকে একটি সম্পূর্ণ গোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে তাদের রাষ্ট্রহীন করে রাখা হয়েছে। যারা বেঁচে আছে সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের দয়ায়।

আইসিসির ভূমিকা এ বিষয়ে আরও কঠোর হওয়া উচিত বলে মনে করে এইচআরডব্লিউ।

তারা বলছে, মিয়ানমারের যদি এই অপরাধের শাস্তি না হয় তবে বিশ্বজুড়েই এ ধরনের জঘন্য অপরাধের পরিমাণ বাড়তেই থাকবে। যা কোনোভাবেই হতে দেয়া উচিত নয়। মিয়ানমার রোম ঘোষণায় স্বাক্ষর করেনি। তবে বাংলাদেশ করেছে। আর বাংলাদেশ এ ঘটনার অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ। এ বিষয়টি আমলে নিয়েই মিয়ানমারের বিচার শুরু করা উচিত।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×