ডেঙ্গু নিয়ে আন্তর্জাতিক ৩ সংস্থার অভিমত

মশা বন্ধ্যাকরণ নয়, চলমান ‘অভিযানই’ কার্যকর

আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়াল * আরও তিনজনের মৃত্যু

  রাশেদ রাব্বি ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলে অরিদ্র দাসের পরিচর্যায় মা অনিমা ঘোষ
মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলে অরিদ্র দাসের পরিচর্যায় মা অনিমা ঘোষ। ছবি: যুগান্তর

বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার গৃহীত চলমান মশক নিধন অভিযান অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকায় সফররত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলের তিন প্রতিনিধি। তাদের মতে, (এসআইটি) বা বন্ধ্যাকরণ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।

কিন্তু বাংলাদেশে এ মুহূর্তে বেশ ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বন্ধ্যাকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ প্রক্রিয়ায় সফলতা পাওয়া সম্ভব।

বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশন, জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তিন প্রতিনিধির দেয়া বক্তব্যে উল্লিখিত বিষয় উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এ তথ্য দিয়ে যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে পুরুষ এডিস মশা স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) বা বন্ধ্যা করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি কার্যকর করা যাবে কিনা- এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ

দলটি বুধবার ঢাকায় আসে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ডব্লিউএইচও প্রতিনিধি একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন।

এদিকে গত ৪ দিন ধরে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উঠানামা করছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪৪৬ জন।

এর আগের ৩ দিন ভর্তি ছিলেন যথাক্রমে ১৫৯৭ জন, ১৬২৬ ও ১৫৭২ জন। অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে রোগীর সংখ্যা কমছে সেটি বলা যাচ্ছে না। শুক্রবার দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

এ নিয়ে যুগান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী চলতি মাসের ২৩ তারিখ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯৪ জনে। যদিও চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪৭ জন।

একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৩৮ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র।

বিশেষজ্ঞদের প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানসম্মত বিভিন্ন পদ্ধতি খতিয়ে দেখতেই এ বিশেষজ্ঞ দল এ দেশে আসে।

তারা জেনেভা থেকে বুধবার ঢাকায় নেমেই দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তারা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ এবং ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিধনে যেসব কার্যক্রম চলমান রয়েছে, সেগুলো অব্যাহত রাখতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

কারণ দেশে ডেঙ্গুর যে আউটব্রেক চলছে সেটি নিয়ন্ত্রণে র‌্যাপিড ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তারা আক্রান্ত রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা প্রদানের পাশাপাশি, মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস, ফগিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক মশা মারার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল পুরুষ এডিস মশা বন্ধ্যা করার পদ্ধতি কয়েকটি দেশে কার্যকর করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে।

ঢাকার কাছে সাভারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে পুরুষ এডিস মশাকে বন্ধ্যা করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে একটি গবেষণা সম্প্রতি সম্পন্ন করেছে।

তবে পাইলটিং এখনও চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বৃহস্পতিবার সাভারে গিয়ে সেখানকার গবেষকদের সঙ্গেও আলোচনা করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু সংক্রমণ ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে মানুষকে আক্রমণকারী মশাবাহিত ভাইরাস প্রতিরোধে ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করছে।

এ ব্যাকটেরিয়া নিরাপদ। প্রকৃতিতে অন্যান্য পোকা-মাকড়ের মধ্যে এটি পাওয়া গেলেও এডিস ইজিপ্টি মশায় এটি পাওয়া যায় না। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এ ব্যাকটেরিয়া যদি এডিস ইজিপ্টির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া যায় তাহলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ লাঘব সম্ভব হবে।

এটি মূলত দু’ভাবে মশার দেহে কাজ করে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে মশার শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ায় এবং ভাইরাস বৃদ্ধি ব্যাহত করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ প্রক্রিয়াটি প্রাকিৃতিক, সাশ্রয়ী এবং টেকসই। ওয়ার্ল্ড মস্কিটো প্রোগ্রাম নামক প্রকল্প অস্ট্র্রেলিয়াসহ বিশ্বের ১২টি দেশে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করছে।

এছাড়া স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) বা মশা বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতি প্রয়োগ করেও কোনো কোনো দেশে এডিস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় গামা রশ্মি ব্যবহার করে এডিস পুরুষ মশাকে বন্ধ্যাকরণ করা হয়।

তারপর এ মশা স্বাভাবিক মশার তুলনায় ১০ গুণ বেশি ছেড়ে স্ত্রী মশার সঙ্গে প্রজনন ঘটানো হয়। তারপর স্ত্রী এডিস ডিম পাড়লে সেই ডিম থেকে আর লার্ভা জন্মায় না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ওলবাকিয়া এবং এসআইটি পদ্ধতি দুটিই ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।

বর্তমানে আমাদের দেশে ডেঙ্গুর যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সে অবস্থা এসব পদ্ধতি প্রয়োগ সময়োপযোগী নয়। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে উন্নত মানের ফগিং মেশিন ও কার্যকর ওষুধ ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ এলাকায় ফগিং করে প্রাপ্তবয়স্ক এডিস মশা মারতে হবে। পাশপাশি প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক আয়েশা আক্তার জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এ পর্যন্ত ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৯৫৬ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬,০৩৫ জন।

এরমধ্যে ঢাকার সরকারি-বেসরকারি ৪১টি হাসপাতালে ৩৪১১ জন এবং অন্যান্য জেলায় ২৬২৪ জন।

অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা জানান, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ভর্তি রোগীদের ৯০ শতাংশই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বৃহস্পতিবারের তুলনায় ৯ শতাংশ কমেছে।

কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে ১০১ জন।

মিটফোর্ডে ৭১ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭০ জন, কুর্মিটেলা জেনারেল হাসপাতালে ৫০ জন। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ২০ জন এবং ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ২১ জন। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৯১, ময়মনসিংহে ২৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯১, খুলনায় ১৮০, রাজশাহীতে ৫৪, রংপুরে ২৬, বরিশালে ১২৫ এবং সিলেটে ১৮ জন। এ সময়ে বান্দরবান ও ঝালকাঠি জেলায় নতুন কোনো ডেঙ্গু রোগীর তথ্য পাওয়া যায়নি।

তিন মৃত্যু : শুক্রবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বাদশা মিয়া (২০) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এদিন দুপুর ২টা ১০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬০২ নম্বর ওয়ার্ডের মেডিসিন বিভাগে তার মৃত্যু হয়।

মৃতের বড় বোন ফারজানা আক্তার জানান, ২১ আগস্ট ঢামেক হাসপাতালে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাদশা ভর্তি হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার তার মৃত্যু হয়েছে। ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের পুলিশ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্বজনরা মৃতদেহ নিয়ে যান। নিহতের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন থানার বোরুনপুর।

এছাড়া সাতক্ষীরার গৃহবধূ শাহানারা খাতুন (৩৭) এবং নাটোরের বড়াইগ্রামের গৃহবধূ ফরিদা বেগম (৪৮) ডেঙ্গুজ্বরে মারা গেছেন। সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সাতক্ষীরায় শাহানারা খাতুন (৩৭) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। তিনি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ছয়ঘরিয়া গ্রামের খলিলুর রহমানের স্ত্রী।

তার স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে সাতক্ষীরা থেকে খুলনায় নেয়ার পথে ডুমুরিয়ায় তার মৃত্যু হয়। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, শাহানারা খাতুন জ্বর নিয়ে ১৮ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হন। বৃহস্পতিবার রাতে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় পাঠানো হলে পথিমধ্যে মৃত্যু হয়।

নাটোর প্রতিনিধি জানান, নাটোরের বড়াইগ্রামে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ফরিদা বেগম (৪৮) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শনিবার ফরিদা বেগম ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হন। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দিয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় মঙ্গলবার তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তিনি মারা যান।

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×