রোহিঙ্গা সংকটের দু’বছর: পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে, প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত

গণহত্যা দিবস পালন করবে রোহিঙ্গারা * সংকট নিরসনে চেষ্টা চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র * টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যক্রম বন্ধ * রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা সংখ্যালঘু

  শফিক আজাদ, উখিয়া ও নুরুল করিম রাসেল, টেকনাফ ২৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা

রোহিঙ্গা সংকটের দু’বছর পূর্ণ হলেও তা সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরুর লক্ষ্যে দু’দফা দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হলেও তা ব্যর্থ হয়।

উপযুক্ত নিরাপত্তা নেই বলে রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। এতে অনিশ্চতায় পড়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।

এদিকে শনিবার টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওগুলো অঘোষিতভাবে কাজ বন্ধ রাখে। বৃহস্পতিবার উগ্রপন্থী রোহিঙ্গাদের হাতে স্থানীয় যুবলীগ নেতা নিহতের জের ধরে স্থানীয়রা বেশ কিছু এনজিও সংস্থার সাইনবোর্ড ও বেড়া ভাংচুর করেন। এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এনজিওগুলো কাজে বিরত থাকে।

২০১৭ সালের এ দিনে মিয়ানমারের সেনা, বিজিপি, নাটালা বাহিনীর নির্যাতনের মুখে নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে এসব রোহিঙ্গা।

উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় লোকের সংখ্যা পাঁচ লাখের কিছু বেশি হলেও এ দুই থানায় বর্তমানে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। ফলে এখানে স্থানীয় বাংলাদেশি অধিবাসীরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে।

বিপুল পরিমাণ বনভূমি ধ্বংসসহ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গা সংকটের দু’বছর উপলক্ষে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এক বিবৃতিতে বলেছে, দুই বছর আগে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রাখাইন রাজ্যে নিরীহ মানুষের ওপর নির্বিচারে নিষ্ঠুর হামলা চালায়। সংকট নিরসনে চেষ্টা চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিবৃতিতে কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করবে বলেও বিৃবতিতে বলা হয়।

এদিকে দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করবে কক্সবাজারে থাকা রোহিঙ্গারা। এ লক্ষ্যে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে ব্যাপক সমাগমের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা উখিয়ার ২২টি ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের কুতুপালং ডি-৪ নামক স্থানে জমায়েত করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা ও ভয়েচ অব রোহিঙ্গা নামের সংগঠনের নেতা মাস্টার নুরুল কবির।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে প্রতিটি ক্যাম্প কমিউনিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। নিজ নিজ ক্যাম্পে তারা ব্যানার, ফেস্টুন বিতরণ করেছে।

বাংলাদেশ সরকার অনুপ্রবেশকারী এসব রোহিঙ্গাকে স্বদেশে ফেরত পাঠাতে কূটনৈতিকভাবে জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিকতায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়া ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে দীর্ঘ ২ বছর সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি চীন সফরে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান ও তাদের প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরপরই মিয়ানমারের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসে এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে। এ সময় রোহিঙ্গারা তাদের নির্যাতনের বর্ণনার পাশাপাশি নাগরিকত্বসহ বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরে।

প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার তালিকা দেয়। গত ২২ আগস্ট তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য দিনক্ষণ ঠিক করা হয়।

দু’দেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হলেও প্রত্যাবাসনে তালিকাভুক্ত কোনো রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরতে রাজি না হওয়ায় ওইদিন প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি বলে জানান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম।

তিনি বলেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। যারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হবেন তাদেরই ফেরত পাঠানো হবে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান চৌধুরীও একই কথা বলেন।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন উখিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসন শুরুর আগে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকজনকে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে হবে।

এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বর একইভাবে প্রত্যাবাসন শুরু করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে না চাওয়ায় সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। যার ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া গ্যাঁড়াকলে পড়েছে।

এদিকে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ায় রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ২ বছরে ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছে তারা সহজে মিয়ানমারে ফিরে যাবে বলে মনে হয় না।

তাই সরকারের উচিত, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দুই বছরেও আলোর মুখ না দেখায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন স্থানীয়রা। কারণ রোহিঙ্গারা দিন দিন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়রাও রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে দিন দিন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। তাদের দাবি, আমরা রোহিঙ্গাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা এখন বেপরোয়া হয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে টেকনাফের যুবলীগ নেতা ফারুককে। উখিয়া-টেকনাফজুড়ে এর প্রভাব পড়েছে। রোহিঙ্গা খেদাওসহ বিভিন্ন স্লোগানও দেন স্থানীয়রা।

শনিবার বন্ধ ছিল রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ইউএনএইচসিআরের পরামর্শে শনিবার শুরু হয়নি অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার পর্ব। এ ব্যাপারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম সাংবাদিকদের বলেন, ইউএনএইচসিআরের পরামর্শে শনিবার সাক্ষাৎকার কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়নি।

আবার রোববার (আজ) রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে গণহত্যা দিবস পালন করবে। সব মিলিয়ে দু’দিন বন্ধ রাখা হয়েছে। সোমবার থেকে পুনরায় কাজ শুরু করা হবে। টেকনাফ শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরের ইনচার্জ খালেদ হোসেনও একই তথ্য জানান।

এদিকে শনিবার টেকনাফের শালবাগান-জাদিমুরা-লেদাসহ অন্য ক্যাম্পের এনজিওগুলো অঘোষিতভাবে কাজ বন্ধ করেছে। বৃহস্পতিবার উগ্রপন্থী রোহিঙ্গাদের হাতে স্থানীয় যুবলীগ নেতা নিহতের জের ধরে স্থানীয়রা বেশ কিছু এনজিও সংস্থার সাইনবোর্ড ও বেড়া ভাংচুর করেন।

এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এনজিওগুলো কাজে বিরত থাকে। তবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। শুধু রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেয়া স্থগিত ছিল।

গত ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে নির্বাচিত ১ হাজার ৩৭ পরিবারের ৩ হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গার মধ্যে ৩৩৯টি পরিবারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে কিনা। কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরে যেতে সম্মত হয়নি।

ফলে ওইদিন নির্ধারিত প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। অবশিষ্ট ৬৯৮ পরিবারের সাক্ষাৎকার শনিবার পুনরায় আরম্ভ হওয়ার কথা ছিল।

রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের আগে তাদের বেশ কিছু দাবি পূরণের আবেদন জানিয়েছে মিয়ানমার সরকারের প্রতি। যেসব দাবি না মানলে তারা ফিরে যাবে না বলে জানিয়েছে।

দাবিগুলো হচ্ছে- রোহিঙ্গা স্বীকৃতি দিয়ে নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটেবাড়ি ও জমিজমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় এডিবি ক্যাম্পে আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়িতে ফেরত, বুচিদং ও মংডু জেলায় বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রোহিঙ্গাদের মুক্তি, হত্যা-ধর্ষণের বিচার ও জাতিসংঘ রক্ষী মোতায়েন।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×