ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগামী বছরের কর্মপরিকল্পনা সেপ্টেম্বরে

২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ১২৯৯ জন, মৃত্যু আরও ৩ * সন্দেহজনক মৃত্যু ১৬৯, নিশ্চিত ৪৭টি -আইইডিসিআর * মৃত্যুর হার দশমিক ২ শতাংশের কম-বিএসএমএমইউ

  রাশেদ রাব্বি ২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু

এ বছর ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ব্যাপক। প্রকোপ কমে এলেও উদ্বেগ এখনও ঘরে ঘরে। এবার দেশের ৬৪ জেলায়ই ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। মৃতের সংখ্যাও কম নয়। তবে আগামী বছর যাতে ডেঙ্গু এভাবে না ছড়ায় সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সংস্থাটি আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে প্রয়োজনীয় কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী চিকিৎসক, সেবিকা, টেকনোলজিস্ট, কীটতত্ত্ববিদ, পরিচ্ছন্নতা ও মশা মারার কাজে সম্পৃক্ত সবাই কর্মশালায় অংশ নেবেন। সেখান থেকেই পরবর্তী কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা) আরও ১২৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সংখ্যা আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় ১২০ জন বেশি। অর্থাৎ আক্রান্তের হার নিুমুখী হলেও সেটি টেকসই নয়। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বর সন্দেহে ১৬৯ জনের মৃত্যুর তথ্য রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) এসেছে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৮০টি মৃত্যুর পর্যালোচনার পর ডেঙ্গুতে ৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে এক জনসহ ৩ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ সংখ্যা এখনও সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ নিয়ে যুগান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১০২ জনে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আয়োজিত সেমিনারে বলা হয়েছে- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার এক শতাংশ বা তার বেশি হলে সেটা অস্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশে এই রোগে মৃত্যুর হার শূন্য দশমিক ২ শতাংশেরও কম। মোট মৃত্যুর ৫ শতাংশই ডেঙ্গু আক্রান্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। মৃত্যুর এ সংখ্যা সাধারণের তুলনায় ২০-২৫ গুণ বেশি। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু সংখ্যা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।

আগামী মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ ঠেকাতে কর্মকৌশল নির্ধারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, আগামী বছর যেন ডেঙ্গু বা মশাবাহিত রোগের প্রকোপ না হয় সে জন্য ইতিমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছি। জাতীয় পর্যায়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হবে। এ বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তাদের সবাইকে নিয়ে কর্মশালা হবে। বিশেষ করে চিকিৎসক ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা, কীটতত্ত্ববিদ, সাংবাদিকসহ এ কাজে সম্পৃক্ত সবার পরামর্শেই প্রয়োজনীয় কর্মকৌশল ঠিক করা হবে। সেই অনুসারে পরবর্তী সময়ে কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার জানান, গত ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬৩ হাজার ৫১৪ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৭ হাজার ৪০৫ জন। যা মোট আক্রান্ত রোগীর ৯০ শতাংশ। শুধু চলতি আগস্ট মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৫ হাজার ৫৩ জন। বর্তমানে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫৯৪০ জন। এর মধ্যে ঢাকার ৪১টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ৩ হাজার ২৬৮ জন এবং অন্যান্য বিভাগে ২ হাজার ৬৭২ জন। এ পর্যন্ত আইইডিসিআরে পর্যালোচনার জন্য ১৬৯ জন রোগীর তথ্য এসেছে। যার মধ্যে ৮০ জনের পর্যালোচনা সম্পন্ন করে ৪৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

মৃত্যু তিন : রোববার ডেঙ্গুতে ঢামেক হাসপাতালে একজন এবং মাদারীপুরের শিবচর হাসপাতাল থেকে ঢাকা আনার পথে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী নিবাসী ফজলুর রহমান (৫৫) শুক্রবার ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। শনিবার রাত দেড়টায় তার মৃত্যু হয়।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, ঢাকা মেডিকেলে ‘ডেথ রিভিউ’ প্রক্রিয়া চালু হওয়ায় ফজলুর রহমান ডেঙ্গুতেই মারা গেছেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে শনিবার যে ৫৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, ফজলুর রহমান তাদেরই একজন।

শিবচর প্রতিনিধি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ঢাকায় আনার পথে ডেঙ্গু আক্রান্ত সুমি আক্তার (৩০) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। তিনি ২০ আগস্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। অবস্থায় অবনতি হলে রাতে তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঢাকায় নেয়ার পথে মাঝ পদ্মায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন শিবচর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল মোকাদ্দেস।

সাঁথিয়া প্রতিনিধি জানান, পাবনার সাঁথিয়ার জীবন নাহার রত্না (৪৪) নামে এক স্কুলশিক্ষিকা ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। রাতেই তাকে ঢাকায় নেয়া হয়। পরে ঢাকার হাসপাতালে রোববার তিনি মারা যান।

রাজশাহীতে নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু : রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রোববার থেকে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননের স্থানগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। পরে সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা হবে। গত ২-৬ আগস্ট রাজশাহী নগরীতে এডিস মশার উপস্থিতি নিয়ে মাঠে নমুনা সংগ্রহ করেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশসহ নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের ১০০টি স্পট থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন তারা। এ সময় তারা ১৪টি স্পটে এডিস মশার লার্ভার ব্যাপক উপস্থিতি দেখতে পান। রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. গোপেন্দ্রনাথ আচার্য বলছেন, এডিস মশার প্রজননের সময়কাল এখনও বাকি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ ছাড়াও জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন দফতরের উদ্যোগে মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। নগরীর নির্মাণাধীন ভবনে সাধারণ মানুষের প্রবেশ করা ঠিক হবে না। এসব ভবনে এডিস মশার জন্ম নেয়ার আশঙ্কা বেশি। আমরা আবারও নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছি। নমুনা পরীক্ষার পর বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যাবে।

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার দশমিক ২ শতাংশের কম : রোববার বিএসএমএমইউর এ-ব্লকের মিলনায়তনে সেমিনারে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার শূন্য দশমিক ২ শতাংশেরও কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার সাব-কমিটির উদ্যোগে ‘ডেঙ্গু: বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবমতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬২ হাজারেরও বেশি রোগী, মারা গেছেন ৪৭ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর হার এর দ্বিগুণ।

সরকারি বা বেসরকারি যে হিসাবই ধরা হোক না কেন চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ানদের নিরলস প্রচেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট সবার সুন্দর ব্যবস্থাপনার কারণে মৃত্যুহার দশমিক ২ শতাংশের নিচে রাখা সম্ভব হয়েছে এবং ডেঙ্গুর সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করাও সম্ভব হয়েছে। সেমিনারের প্রধান অতিথির উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, প্রতিরোধেই অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও রেসিডেন্ট ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. চৌধুরী আলী কাওসার, এডিটর-ইন-চিফ, ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু, অধ্যাপক ডা. কাজী তরিকুল ইসলাম।

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×