রিফাত শরীফ হত্যা মামলা

শর্তসাপেক্ষে জামিন পেলেন মিন্নি

গণমাধ্যমের সঙ্গে মিন্নি কথা বলতে পারবেন না * এসপির বক্তব্য সুষ্ঠু তদন্তের পরিপন্থী - হাইকোর্ট * অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা যাবে না

  যুগান্তর রিপোর্ট ৩০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শর্তসাপেক্ষে জামিন পেলেন মিন্নি

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি হাইকোর্ট থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ জামিন প্রশ্নে রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন।

আদালত বলেন, জামিনে থাকাকালে মিন্নি তার বাবার জিম্মায় থাকবেন এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে তিনি কোনো কথা বলতে পারবেন না। এর ব্যত্যয় ঘটলে তার জামিন বাতিল হবে।

এদিকে মিন্নির জামিনে তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অপরদিকে মিন্নির জামিন আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল করার কথা বলেছেন রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ। এ জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার আগে মিন্নি দোষ স্বীকার করেছেন বলে বরগুনার এসপি মারুফ হোসেন সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। এ ঘটনায় তাকে (এসপি মারুফ) সতর্ক করে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।

আদালত বলেন, আসামি মিন্নি রিমান্ডে থাকাকালে দোষ স্বীকার করেছেন বলে এসপি মারুফ গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা শুধু অযাচিত, অনাকাক্সিক্ষতই নয়, ন্যায়নীতি ও সুষ্ঠু তদন্তের পরিপন্থী।

পরিস্থিতি ও বাস্তবতা যা-ই হোক না কেন, দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন ধরনের বক্তব্য দিলে তা জনমনে নানান প্রশ্নের জন্ম দেয়। একই সঙ্গে এসপি মারুফ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেননি। এটা দুঃখজনক ও হতাশাজনক।

উচ্চপর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত ও কাম্য নয়। এরপর থেকে তিনি (এসপি মারুফ) সতর্ক ও পেশাদার মনোভাবের পরিচয় দেবেন- এটাই আদালতের অনুরোধ। আদালত বলেন, মামলা চলমান থাকায় এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হচ্ছে না। তবে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেন, আজকাল দেখা যাচ্ছে কোনো আলোচিত ঘটনার তদন্ত চলাকালে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতার ব্যক্তি, অভিযুক্ত বিষয় বা তদন্ত সম্পর্কে প্রেস বিফ্রিং করছে। কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই গণমাধ্যমের সামনে গ্রেফতার ব্যক্তি, সন্দেহভাজন বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হাজির করা হয়।

তদন্ত চলছে এমন বিষয়ে অনেক কর্মকর্তাকে অতি উৎসাহ নিয়ে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। এসব বিষয় অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ বিষয়ে আদালতের একটি রায়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এ কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে- যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি অপরাধী বা অপরাধ করেছেন তা বলা যাবে না। তদন্ত বা বিচার পর্যায়ে গণমাধ্যমে এমনভাবে বক্তব্য দেয়া যাবে না যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী।

মামলার তদন্ত পর্যায়ে, তদন্তের অগ্রগতি বা গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিষয়ে গণমাধ্যমকে কতটুকু জানানো যাবে সে বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা বাঞ্ছনীয়। এ নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রচারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালত এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিন্নির জামিন আবেদন নাকচ হওয়ায় হাইকোর্টে আসেন তার আইনজীবীরা। ২০ আগস্ট আংশিক শুনানি নিয়ে রুল জারি করেন আদালত।

আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়ার আগে মিন্নি দোষ স্বীকার করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলন করায় এসপির ব্যাখ্যা চান আদালত। একই সঙ্গে মামলার নথিসহ তদন্ত কর্মকর্তাকে হাইকোর্টে হাজির হতে বলা হয়। বু

ধবার মিন্নির জামিন প্রশ্নে হাইকোর্টের রুলের ওপর শুনানি শেষ হয়। এ বিষয়ে রায়ের জন্য বৃহস্পতিবার দিন রেখেছিলেন হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে রায় ঘোষণা করেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।

সংক্ষিপ্ত রায়ে আদালত বলেন, ‘এজাহারে আসামির নাম উল্লেখ না থাকা, গ্রেফতারের আগে দীর্ঘ সময় মিন্নিকে পুলিশ লাইনসে আটক রাখা এবং গ্রেফতারের প্রক্রিয়া, আদালতে হাজির করে রিমান্ড শুনানির সময় তার আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ না পাওয়া, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিপিবদ্ধ করার আগেই আসামির দোষ স্বীকার সম্পর্কিত জেলা পুলিশ সুপারের বক্তব্য, তদন্তকারী কর্মকর্তার মতে মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে সুতরাং আসামি কর্তৃক তদন্ত প্রভাবিত করার কোনো সুযোগ না থাকা, সর্বোপরি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮, ৯৭ ধারার ব্যতিক্রম, অর্থাৎ আসামি একজন নারী- এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে তাকে জামিন দেয়া ন্যায়সঙ্গত মনে করছি এবং জারি করা রুলটি আমরা যথাযথ ঘোষণা করলাম। সে তার বাবার জিম্মায় থাকবে এবং মিডিয়ার সামনে কোনো কথা বলতে পারবে না।’

আদালতে জামিন আবেদনের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেডআই খান পান্না ও আইনজীবী মনসরুল হক চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসাইন বাপ্পী। এছাড়া আদালতে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন। রায়ের পর সাংবাদিকদের মিন্নির আইনজীবী জেডআই খান পান্না বলেন, মিন্নির জামিন মঞ্জুর হয়েছে। তবে তার প্রতি একটা নির্দেশনা আছে। তিনি মিডিয়ার সামনে কথা বলতে পারবেন না। জামিন হওয়ায় মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি খুব খুশি হয়েছি।’

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বাপ্পী বলেন, মিন্নিকে কেন জামিন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন আদালত। সে রুল যথাযথ ঘোষণা করে মিন্নিকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। তিনি (মিন্নি) বাবার জিম্মায় থাকবেন, তাই তাকে জামিন দেয়া হয়েছে। তবে তিনি এ জামিনের অপব্যবহার এবং মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। জামিনের শর্ত অপব্যবহার হলে নিম্ন আদালত তার জামিন বাতিল করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, আমরা মর্মাহত (উই ভেরি শকড)। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মিন্নিকে কতদিনের জামিন দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা রায়ের কপি না দেখে বলা যাবে না। তবে আদালত জামিন প্রশ্নে রুল যথাযথ ঘোষণা করেছেন। এ সময় হাইকোর্টে উপস্থিত ছিলেন রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ। সাংবাদিকদের তিনি জানান, এ রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল বিভাগে যাবেন।

২৬ জুন বরগুনার রাস্তায় রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির চেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে সারা দেশে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরদিন রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এতে প্রধান সাক্ষী করা হয় মিন্নিকে। পরে মিন্নির শ্বশুর তার ছেলে হত্যায় পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন। এ ঘটনা নতুন মোড় নেয়। ১৬ জুলাই মিন্নিকে বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে পুলিশ দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করে। এরপর এ মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির ১৭ জুলাই মিন্নিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে দেন ম্যাজিস্ট্রেট। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ১৯ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। মিন্নির আইনজীবী ২১ জুলাই ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিনের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর হয়। ২৩ জুলাই বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিন্নির জামিনের আবেদন করা হলে ওই আবেদন ৩০ জুলাই শুনানি শেষে জামিন নামঞ্জুর হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য : বৃহস্পতিবার বিকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির যুগান্তরকে বলেন, হাইকোর্ট বুধবার মামলার তদন্তের সিডি (কেস ডকেট) দেখেছেন। হাইকোর্টে বলেছি, মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। হাইকোর্টে মিন্নির জামিন শুনানি থাকায় চার্জশিট দাখিল করতে বিলম্ব হয়েছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করতে পারব।

মিন্নির জামিন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া : বরগুনা ও দক্ষিণ প্রতিনিধি জানান, হাইকোর্টে মিন্নির জামিন হওয়ার সংবাদে বিকালে বরগুনা শহরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জসিম বলেন, মিন্নির সামনে তার স্বামীকে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করেছে। নিজের জীবন বাজি রেখে মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মিন্নির জামিন হওয়ায় তিনি খুশি। বরগুনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি হাচানুর রহমান ঝন্টু বলেন, মিন্নি একজন নারী। আইনি সহায়তা তিনি পেতেই পারেন। আর মিন্নি তো মামলার সাক্ষী ছিলেন। সে তো খুনের সঙ্গে জড়িত নয়। সমাজসেবক সুজন বলেন, মিন্নির চরিত্র সম্বন্ধে হাইকোর্ট সব জানলে তার জামিন হতো না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×