বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: মহাবিপাকে ফিলিপাইন

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধ সূচকে চরম খারাপ অবস্থা, এক বছরের মধ্যে পরিস্থিতি উন্নয়নের আলটিমেটাম, ব্যর্থ হলে আবার ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় যাবে ফিলিপাইন -এপিজি

  বিশেষ সংবাদদাতা ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রিজার্ভ চুরি

মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিউইয়র্ক শাখায় রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছে ফিলিপাইন। এ ঘটনার পর এপিজির মূল্যায়নে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধ সূচকে চরম খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে দেশটি।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তাদের এক বছরের আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিস্থিতির উন্নয়নে ব্যর্থ হলে আবার ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় যাবে ফিলিপাইনের নাম। তখন আন্তর্জাতিক লেনদেন ও ব্যবসা বাণিজ্যে আরও নেতিবাচক অবস্থায় পড়তে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) ফিলিপাইনকে উল্লিখিত সতর্ক বার্তা দিয়েছে। ১৮ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত এপিজির বার্ষিক সম্মেলন থেকে এ বার্তা দেয়া হয়। এতে বিভিন্ন দেশের পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে ১৪ অধিবেশনের মধ্যে ৭টি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মুহা. রাজী হাসান। এসব অধিবেশনে ফিলিপাইনের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

আগামী বছরের জুলাইয়ে ঢাকায় এপিজির পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিভিন্ন দেশের ৫৫০ জন প্রতিনিধি থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএফআইইউ এ বৈঠকের আয়োজন করবে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ রিজাল ব্যাংক থেকে ফিলিপাইনের ক্যাসিনো বা জুয়ার আসরের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ফিলিপাইনের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাউন্সিলের তদন্তে উঠে এসেছে। সেই ক্যাসিনোকে এপিজির চাপে মানি লন্ডারিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে ক্যাসিনোর মাধ্যমে যেসব লেনদেন সম্পন্ন হবে সেগুলোর বিষয়ে তাদের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাউন্সিলে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মুহা. রাজী হাসান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ায় ফিলিপাইন এখন আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁদে পড়ে গেছে। কেননা রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দায় এখন তাদের বহন করতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসী অর্থায়নের ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যে কোনো হিসাব জব্দ করতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা ফিলিপাইনকে জানানোর পরও সংশ্লিস্ট হিসাবগুলো জব্দ করতে তাদের ৭ দিনের বেশি সময় লেগেছে। এতে চুরি হওয়া রিজার্ভের অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে চলে গেছে। রিজার্ভের অর্থ উদ্ধারে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে বড় ধরনের কোনো ব্যবস্থা তারা নিতে পারেনি। এসব তথ্য এপিজির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া রিজার্ভের অর্থের ২ কোটি ডলার শ্রীলংকায় গিয়েছিল। সেটি শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক জব্দ করে ফেরত দিয়েছে। কিন্তু ফিলিপাইন সে রকম কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর এবারই প্রথম মানি লন্ডারিং ইস্যুতে ফিলিপাইনের মূল্যায়ন হয়েছে। এ মূল্যায়নেই রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া এবং চুরি হওয়া অর্থ জব্দ করতে না পারায় তাদের দুর্বলতা চরমভাব ফুটে উঠেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রিজার্ভ চুরির অর্থ ওই সময়ে দ্রুত উদ্ধারে ফিলিপাইন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করলে আজকে তাদের এ বিপাকে পড়তে হতো না। এখন ওই ভুলের মাশুল তাদের দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী এখন মানি লন্ডারিং কঠোর দৃষ্টিতে দেখা হয়। একে প্রশ্রয় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সূত্র জানায়, বৈঠকে অংশ নেয়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলের প্রতিনিধিরা রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমসের নিউইয়র্ক শাখায় থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে যায়। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার যায় ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে। বাকি ২ কোটি ডলার যায় শ্রীলংকায়। শ্রীলংকা থেকে ২ কোটি ডলার দুই দিনের মধ্যেই ফেরত আনতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ফিলিপাইন থেকে এখন পর্যন্ত ফেরত এসেছে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আরও ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার আদায় করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে বেশ কিছু অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো এখন উদ্ধার করার প্রক্রিয়া চলছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×