মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সচিবের রুদ্ধদ্বার বৈঠক

শোকজ নারকোটিক্সের ৭০ কর্মকর্তাকে

‘আপনার হাইভোল্টেজ তদবিরের কারণে আমি তো চেয়ারে ঠিকমতো বসতেও পারি না’

  তোহুর আহমদ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাদকবিরোধী কার্যক্রম সন্তোষজনক না হওয়া এবং ঘুষ ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিফতরের (নারকোটিক্স) অন্তত ৭০ কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। রোববার বিয়াম মিলয়নায়তনে আয়োজিত অধিদফতরের পরিদর্শক থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ সমন্বয় সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেবা সুরক্ষা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী শোকজের এ সিদ্ধান্ত দেন। এ সময় তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তীব্র ভাষায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। উপস্থিত কর্মকর্তাদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সচিব প্রকাশ্যে কারও কারও ঘুষ, চাঁদাবাজি ও হাইভোল্টেজ তদবিরের প্রমাণও তুলে ধরেন। দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণে পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে সভাকক্ষ থেকে তিনি বের করে দেন। সাড়ে তিন ঘন্টাব্যাপী এ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ ও মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আতিকুল ইসলাম।

জানা যায়, সভার শুরুতেই সচিব অধিদফতরের মাদক উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা নয় সহকারী পরিচালক থেকে অতিরিক্ত পরিচালকদের কাজের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, সব স্তরের কর্মকর্তাদের মাদকবিরোধী অভিযানে সংযুক্ত থাকতে হবে। তিনি বেশ কয়েকজন পরিদর্শকের কাছে তাদের মাদকবিরোধী তৎপরতার বিষয়ে কৈফিয়ত চান। এদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের উত্তরা, গুলশান, রমনা, তেজগাঁও, সূত্রাপুরসহ বেশ কয়েকটি মাদকপ্রবণ এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক মাসুদ হোসেন বক্তব্য দেয়ার জন্য দাঁড়ানোর পর সচিব ক্ষিপ্ত হন। তিনি মাসুদকে বলেন, ‘আপনি উত্তরা এলাকার মাদক নির্মূলে ভূমিকা পালন না করে রীতিমতো চাঁদাবাজিতে মেতে আছেন। প্রতিটি বার থেকে মাসোয়ারা নেন আবার সেখান থেকে নিয়মিত খাবারের প্যাকেটও নেন। এসব অভিযোগের সপক্ষে আমার মোবাইল ফোনে প্রমাণ আছে’। সচিব বলেন, ‘আগামী ২ মাসের মধ্যে আপনি সংশোধন হবেন। না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ একই ভাবে গুলশান সার্কেলের পরিদর্শক মোজাম্মেল হক খানের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার পারফরম্যান্স হতাশাজনক। গুলশান এলাকার মতো জায়গায় আপনি মাত্র ৫ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছেন।’ মতিঝিল পরিদর্শক সাজেদুল হককে বলেন, ‘আপনি মতিঝিলের আগে কোথায় ছিলেন।’ উত্তরে সাজেদুল বলেন, মোহাম্মদপুরে। সচিব তাকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল কিভাবে এলেন। ঢাকার ভেতরে এক সার্কেল থেকে আরেক সার্কেলে বদলি করতে নিষেধ করেছে মন্ত্রণালয়।’

এভাবে দীর্ঘ সাতে তিন ঘণ্টাব্যাপী সভায় যোগ দেয়া মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন করেন সচিব। অধিদফতরে বেশ কয়েকজন অতি ক্ষমতাবান কর্মকর্তা রয়েছে উল্লেখ করে সচিব বলেন, ‘এদের ক্ষমতার উৎস কোথায় তা আমার জানা নেই।’ ভোলায় কর্মরত পরিদর্শক এলতাস উদ্দীন ৬ মাসে মাত্র ১টি মামলা ও ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করেছেন শুনে সচিব ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি এলতাসকে উঠে দাঁড়াতে বলেন। এ সময় এলতাস গোঁজামিল দেয়ার চেষ্টা করলে সচিব বলেন, ‘আপনার ক্ষমতার উৎস কোথায়। ৬ মাসে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করে প্রাইজ পোস্টিংয়ের তদবির করেন? আপনার হাইভোল্টেজ তদবিরের কারণে আমি তো চেয়ারে ঠিকমতো বসতেও পারি না। আপনি পারফরম্যান্সের বিষয়ে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেবেন।’ একপর্যায়ে সচিব তাকে বলেন, ‘আপনি এখনি সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। গেটআউট। এরপর এলতাস বেরিয়ে যান।’ সচিব ঢাকা জেলার মাদক উদ্ধার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি ঢাকা জেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে এর জন্য কৈফিয়ত চান। ঢাকা জেলার উপ-পরিচালক আলী আসলাম হোসেন বলেন, তিনি নতুন এসেছেন। এর আগে ছিলেন মাসুদ হোসেন। তিনি এখন রংপুরে অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে কর্মরত। হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণে মাসুদ হোসেনকে তিরস্কার করা হয়। কৈফিয়ত তলব করা হয় নারায়ণগঞ্জের সহকারী পরিচালক বিল্পব কুমার মোদক ও পরিদর্শক তমিজ উদ্দীন মৃধাকে। গাজীপুর জেলার সহকারী পরিচালক রাসেল হোসেনকে মাদক উদ্ধার তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়। গাজীপুরের সাবেক সহকারী পরিচালক আজিজুল হক সভায় উপস্থিত না থাকায় তাকে শোকজ করা হয়।

কুমিল্লা উপ-অঞ্চলের উপ-পরিচালক মাঞ্জারুল ইসলামের কাছে হতাশাজনক মাদক উদ্ধারের জন্য কৈফিয়ত চাওয়া হয়। এছাড়া বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক আবুল আলা হাফিজুর রহমানকে মাদক উদ্ধার তৎপরতা না থাকায় শোকজ করা হয়।

সভায় ভালো কাজের জন্য দু’জন পরিদর্শকের প্রশংসা করেন সচিব। এদের অন্যতম হলেন খিলগাঁও সার্কেলের পরিদর্শক সুমনুর রহমান। তিনি গত ৬ মাসে ৮৬ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার এবং ৪৮টি মাদকসংক্রান্ত মামলা করেন। উদ্ধার করেন প্রায় ২৬ কেজি গাঁজা। অপরজন হলেন সুনামগঞ্জের পরিদর্শক সোয়েব আহমেদ।

সচিব অধিদফতরকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সাবেক মহাপরিচালক সালাউদ্দীন মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির শক্ত অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। এ জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। সচিব বলেন, সালাউদ্দীন চলে গেছেন। এখন জামাল উদ্দিন এসেছেন। আশা করি তিনি ভালো কাজ করবেন।

সভা শেষে সচিব প্রতি মাসে ৬টি করে বিশেষ সমন্বিত মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের রাখতে বলা হয়। এসব অভিযান সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত পরিচালকের নেতৃত্বে পরিচালনা ও গোপনীয়তা রক্ষার কথা বলেন সচিব।

সভার শেষ দিকে সচিব ফরিদউদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী অধিদফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পূরণের আশ্বাস দেন। বিশেষ করে যানবাহন ও অস্ত্র দেয়ার বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সদিচ্ছার কথা জানান তিনি। এছাড়া জনবল কাঠামো বাড়িয়ে অধিদফতরকে একটি শক্তিশালী ও স্বশাসিত অধিদফতর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলেন সচিব। তিনি বলেন, আমি জানি আপনাদের সীমাবদ্ধতা আছে। জেলায় মাত্র ৬-৭ জন করে লোকবল আছে। তারপরও আপনাদের মাদক উদ্ধারে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। আমি আপনাদের সব দাবি-দাওয়ার বিষয়ে অবগত আছি। সেগুলো পূরণের যথাসাধ্য চেষ্টা চলছে। সভায় সমাপনী বক্তব্য দেন মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ।

বিশেষ সভার প্রসঙ্গে রোববার রাতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সমন্বয় সভায় সচিব স্যার অনেকগুলো দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এ সভার মধ্য দিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে মাদকবিরোধী তৎপরতা ও অভিযান আরও জোরদার হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter