বরগুনায় রিফাত হত্যা মামলা

মিন্নিসহ ২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র

মিন্নির জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন * এসপির বক্তব্য তদন্ত সম্পর্কে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে-হাইকোর্ট * ‘তদন্ত চলাকালে তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ সম্পর্কে নীতিমালা বাঞ্ছনীয়’

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বরগুনা ও বরগুনা দক্ষিণ প্রতিনিধি

ফাইল ছবি

বরগুনার আলোচিত রিফাত শাহনেওয়াজ শরীফ হত্যা মামলায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে পুলিশ।

বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে রোববার বিকাল সাড়ে ৪টায় দুই খণ্ডে এ অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ূন কবির।

আসামিদের ১০ জনকে এক খণ্ডে (মূল) এবং ১৪ জনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় শিশু আইনে বিচারের জন্য পৃথক খণ্ডে ওই চার্জশিট দেয়া হয়। অভিযোগপত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে রিফাত ফরাজীকে, যিনি বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের আপন ভায়রার ছেলে। আর মিন্নিকে ৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে, যিনি মামলায় ছিলেন ১ নম্বর সাক্ষী।

মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে রিফাত ফরাজীর ভাই রিশান ফরাজীকে। কোনো রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়নি।

তদন্ত কর্মকর্তা রোববার এ অভিযোগপত্র আদালতের জিআরও’র কাছে জমা দেন। তবে মামলার মূল নথি না থাকায় ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগপত্র গ্রহণ করতে পারেননি। মূল নথি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে থেকে পাওয়া গেলে অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হতে পারে। এদিকে মিন্নিকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

রোববার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আবেদন করা হয়। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর অবকাশকালীন চেম্বার আদালতে এ আবেদনের শুনানি হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

মিন্নিকে হাইকোর্টের দেয়া জামিনের পূর্ণাঙ্গ রায়ও প্রকাশিত হয়েছে রোববার। সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে দেয়া ৭ পৃষ্ঠার এ রায়ে পাঁচ যুক্তিতে মিন্নিকে আদালত জামিন দিয়েছেন বলে বলা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কোনো মামলার তদন্ত চলাকালে কতটুকু তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে, সে সম্পর্কে নীতিমালা প্রণয়ন বাঞ্ছনীয়।

আদালত মনে করেন, দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার আগেই মিন্নি দোষ স্বীকার করেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে বরগুনার এসপির বক্তব্য তদন্ত সম্পর্কে জনমনে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বরগুনা সরকারি কলেজ গেটের সামনে ২৬ জুন সকালে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে জখম করে নয়ন বন্ড ও তার সঙ্গীরা। বিকালে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল হাসপাতালে মারা যান তিনি।

রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ২৭ জুন নয়ন বন্ডসহ ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় মামলা করেন। পুলিশ এ মামলায় এখন পর্যন্ত মিন্নিসহ ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে, এরা সবাই আদালতে দোষ স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সূত্র জানায়, এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন- রিফাত ফরাজী, রিশান ফরাজী, চন্দন, মুসা, রাব্বি আকন, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রায়হান, হাসান, রিফাত হাং, অলি উল্লাহ অলি, টিকটক হৃদয়।

তদন্তে যুক্ত হওয়া আসামিরা হলেন- আরিয়াল হোসেন শ্রাবণ, কামরুল হাসান সায়মুন, নাজমুল হাসান, তানভির হোসেন, সাগর, রাতুল ইসলাম জয় ও রবিউল ইসলাম রাব্বি। অভিযোগপত্রভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন- আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি, নাঈম, মারুফ হোসেন, প্রিন্স মোল্লা ও রকিবুল।

তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির রোববার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, দুই মাস ৬ দিন পর আদালতে চার্জশিট দিতে পেরেছি। এ মামলায় গ্রেফতার ১৫ আসামিই দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। নয়ন বন্ড এক নম্বর আসামি ছিল। বন্দুকযুদ্ধে ২ জুলাই নিহত হওয়ায় তাকে বাদ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, চার্জশিটে এখন এক নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী। রিফাত ফরাজীর আপন ছোট ভাই রিশান ফরাজী নাবালক হওয়ায় তাকে কিশোর অপরাধী হিসেবে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। ১৮ বছরের উপরে ১০ জন। বাকি ১৪ জন আসামি কিশোর থাকায় তাদের শিশু আইনে চার্জশিট দেয়া হয়েছে।

হুমায়ূন কবির বলেন, বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রোববার বিকালে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। ওই আদালত কিশোরদের চার্জশিটটি শিশু আদালতে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি বলেন, আসামিদের শিশু আদালত ও দায়রা আদালতে বিচার হবে।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আদালত চার্জশিট গ্রহণ না করা পর্যন্ত কোনো তথ্য-উপাত্ত আমরা দিতে পারছি না।

মিন্নিকে কীভাবে আসামি করা হয়েছে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আমরা তদন্তে ও সাক্ষ্য-প্রমাণে মিন্নির সম্পৃক্ততা পেয়েছি। তাছাড়া মিন্নি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, যা মিন্নি ১৯ জুলাই আদালতে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। মিন্নির ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স থাকায় তাকে ১০ জনের মধ্যে ৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সব আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/২১২/১২০-বি (১)১১৪/১০৯/৩৪ ধারায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ২ মাস ৬ দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে সুদক্ষ পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিমওয়ার্ক করে ১৫ আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি আমাদের সব সময় কাজে প্রেরণা জোগাতেন। যার কারণে অল্প সময়ের মধ্যে আমরা প্রধান প্রধান আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।

অভিযোগপত্র প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার বাদী দুলাল শরীফ যুগান্তরকে বলেন, আমি আদালত ও পুলিশের ওপর কৃতজ্ঞ। তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে অল্প সময়ের মধ্যে চার্জশিট দিয়েছেন। ১৫ আসামিকে গ্রেফতার করে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এখন আমি ন্যায়বিচার পেলেই আমার ছেলের আত্মা শান্তি পাবে। আমি বিশ্বাস করি আদালতে ন্যায়বিচার পাব।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে প্রভাবিত হয়ে আমার মেয়েকে অন্যায়ভাবে আসামি করেছে। দেশবাসী দেখেছেন। আমার মেয়ে তার স্বামীকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কত কিছুই না করেছে। হাইকোর্টও বলেছেন, আমার মেয়েকে আসামি করা ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, তারপরও তদন্ত কর্মকর্তা আমার মেয়েকে যখন আসামি করেছে, তখন আমরা বিচার ফেস করব।

মিন্নির জামিন স্থগিতে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন : যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার জানান, মিন্নিকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত চেয়ে আবেদনে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড হয়েছেন সুফিয়া খাতুন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মিন্নির জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আজ (রোববার) আবেদন করেছে।

সোমবার চেম্বার আদালতে শুনানি হতে পারে। হাইকোর্ট মিন্নিকে জামিন দেয়ার পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসাইন বাপ্পী আপিল করার কথা বলেছিলেন। রোববার এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাপ্পী বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিষয়ে আমি অ্যাটর্নি অফিসকে নোট দিয়েছি। অফিস সিদ্ধান্ত নেবে। রোববার সন্ধ্যায় মিন্নির আইনজীবী জেডআই খান পান্না বলেন, মিন্নির জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের কোনো কপি এখনও পাইনি।

২৯ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিন পান আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ জামিন প্রশ্নে রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন।

নীতিমালা প্রণয়ন বাঞ্ছনীয় : মিন্নিকে জামিনের রায়টি লিখেছেন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। এতে একমত পোষণ করেছেন অন্য বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইদানীং প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় যে, বিভিন্ন আলোচিত অপরাধের তদন্ত চলাকালে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করার পূর্বেই বিভিন্নভাবে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করে, যা অনেক সময় মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অমর্যাদাকর এবং অ-অনুমোদনযোগ্য। বিভিন্ন মামলার তদন্ত সম্পর্কে অতি উৎসাহ নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে ব্রিফিং করা হয়ে থাকে।

আমাদের সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতে একজন অভিযুক্ত বিচার প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে বলা যাবে না যে তিনি প্রকৃত অপরাধী। গণমাধ্যমের সামনে কোনো ব্যক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা সঙ্গত নয় যে, তার মর্যাদা ও সম্মানহানি হয়। তদন্ত চলাকালে অর্থাৎ পুলিশ রিপোর্ট দাখিলের পূর্বে গণমাধ্যমে গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তি বা মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে এমন কোনো বক্তব্য উপস্থাপন সমীচীন নয়, যা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে বিতর্ক বা প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।

রায়ে বলা হয়, আমাদের আরও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, মামলার তদন্ত এবং বিচার পর্যায়ে একজন অভিযুক্তের প্রাপ্ত আইনি অধিকার নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

উপরোক্ত বিবেচনায় আদালতের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের আদালতে উপস্থাপনের পূর্বেই গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন এবং কোনো মামলার তদন্ত চলাকালীন সময়ে তদন্ত বিষয়ে কতটুকু তথ্য গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করা সমীচীন হবে সে সম্পর্কে একটি নীতিমালা অতি দ্রুততার সঙ্গে প্রণয়ন করা বাঞ্ছনীয়। এ নীতিমালা প্রণয়ন ও যথাযথভাবে অনুসরণের জন্য সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগ/সুরক্ষা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মহাপরিদর্শক, পুলিশকে নির্দেশ প্রদান করা হল।

আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়ার আগেই মিন্নি দোষ স্বীকার করেছে বলে সংবাদ সম্মেলন করেন বরগুনার এসপি মারুফ হোসেন।

এ প্রসঙ্গে আদালত বলেছেন, একজন আসামি রিমান্ডে থাকাবস্থায় আইনের নির্ধারিত নিয়মে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি প্রদানের পূর্বেই পুলিশ সুপারের বক্তব্য তদন্ত সম্পর্কে জনমনে নানাবিধ প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার বক্তব্যের বিষয়বস্তু যদি ধরেও নেয়া হয় যে সত্য, তাহলে গণমাধ্যমের সামনে এ পর্যায়ে প্রকাশ ছিল অযাচিত এবং ন্যায়-নীতি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পরিপন্থী।

একজন দায়িত্বশীল অফিসারের কাছ থেকে এ ধরনের কার্য প্রত্যাশিত ও কাম্য ছিল না এবং তিনি নিজেই তার দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, যা দুঃখ ও হতাশাজনক। মামলার তদন্ত যেহেতু চলমান সে কারণে এ বিষয়ে আদালত এ মুহূর্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করা থেকে বিরত থাকছে। তদন্ত শেষে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল হলে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ বিষয়ে সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।