অভিযোগপত্রে তথ্য: লাথির জবাব দিতে হত্যার ছক মিন্নির

  বরগুনা ও দক্ষিণ প্রতিনিধি ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হত্যা

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শাহনেওয়াজ শরীফ হত্যার পরিকল্পনা করেছেন তারই স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। নয়ন বন্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ও তার বাসায় যাতায়াতে বাধা, কলেজে তার ওপর নজরদারি, ইচ্ছেমতো চলাফেরায় বাধা দেয়া ও কারণে-অকারণে মারধরে ক্ষুব্ধ হয়ে এ ছক কষেন তিনি।

হেলাল শিকদার নামে নয়নের এক বন্ধুর মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়ায় রিফাত শরীফকে ভর্ৎসনা করেছিলেন মিন্নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে চড়-থাপ্পড় দেন ও তলপেটে লাথি মারেন রিফাত। ক্ষুব্ধ হয়ে মিন্নি ‘প্রতিশোধ’ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর শুধু পরিকল্পনাতেই ক্ষান্ত হননি তিনি, তা বাস্তবায়নে করেছেন সর্বোচ্চ সহযোগিতা।

রিফাত হত্যায় আদালতে জমা দেয়া অভিযোগপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ১ সেপ্টেম্বর জমা দেয়া দুই খণ্ডের ১২৩২ পৃষ্ঠার এ অভিযোগপত্রে মিন্নির কর্মকাণ্ডই বর্ণনা করা হয়েছে ৩২ পৃষ্ঠাজুড়ে। সেখানে কেন হত্যার পরিকল্পনা, কোথায়-কীভাবে তা করা হয়েছে, পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও হত্যার আগে-পরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, রিফাত শরীফ ও নয়ন বন্ড একসময় বরগুনা জিলা স্কুলে লেখাপড়া করেছে। সেই সুবাদে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। দু’বছর আগে রিফাতের সঙ্গে মিন্নির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রিফাত শরীফ মিন্নিকে নয়ন বন্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কিছুদিন পর রিফাত শরীফ আরেক মেয়ের সঙ্গে প্রেমে জড়ান। মিন্নি তা জানতে পারলে রিফাতের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরে। এরই মধ্যে ২০১৮ সালে রিফাত শরীফ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দেড় মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সুযোগে নয়ন বন্ড মিন্নিকে প্রেম নিবেদন করে। মিন্নি তাতে সাড়া দিয়ে তার সঙ্গে গাঢ় সম্পর্ক তৈরি করে। রিফাত সুস্থ হয়ে উঠলে একই সঙ্গে দু’জনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যেতে থাকেন মিন্নি।

অভিযোগপত্রে উঠে আসে- এরই মধ্যে ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর রেজিস্ট্রি কাবিনমূলে মিন্নি বিয়ে করেন নয়ন বন্ডকে। এরপর থেকে মিন্নি-নয়ন বন্ড স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেলামেশাসহ প্রকাশ্যে ও গোপনে সম্পর্ক রাখেন। বিয়ের পর মিন্নি ধীরে ধীরে জানতে পারেন নয়ন বন্ড মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত এবং নয়ন বন্ডের নামে বরগুনা থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এ কারণে নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। পুনরায় রিফাত শরীফকে ভালোবাসতে শুরু করেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, তদন্তে উঠে এসেছে, মিন্নি ও তার পরিবার নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের বিষয়টি গোপন রেখে নয়ন বন্ডের সঙ্গে বিয়ে বিচ্ছেদ ছাড়াই এ বছর ২৬ এপ্রিল পারিবারিকভাবে রিফাত শরীফের সঙ্গে মিন্নিকে বিয়ে দেয়। তবে এরপরও মিন্নি কলেজে যাওয়া-আসাসহ নানা অজুহাতে নয়ন বন্ডের বাসায় যান, দৈহিক মেলামেশা করেন, মোবাইল ফোন ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন। মিন্নি তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতেও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

তদন্তে আরও উঠে আসে, নয়ন বন্ডের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন রিফাত শরীফ। মিন্নিকে নিষেধ করেন। কিন্তু মিন্নি গোপনে নয়ন বন্ডের বাসায় যাওয়া-আসা করতে থাকেন। এ নিয়ে রিফাত শরীফ ও মিন্নির মধ্যে কলহ ও হাতাহাতি হয়। মিন্নি একাধিকবার রিফাত শরীফের কাছে ডিভোর্স চান। ফিরে যেতে চান নয়ন বন্ডের কাছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, তদন্তে প্রকাশ পায়, রিফাত শরীফের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের আগে এ বছর মার্চ মাসে বরগুনা ইউটিডিসি সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নয়ন বন্ড জন্মদিন উদ্যাপন করে। ওই অনুষ্ঠানে মিন্নি ছিলেন প্রধান মেহমান। অনুষ্ঠানের ভিডিও করেন নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হেলাল শিকদার। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, মিন্নি নয়ন বন্ডকে মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছেন। ভিডিওটি হেলাল শিকদার অনলাইনে ছেড়ে দিলে রিফাত শরীফ ক্ষুব্ধ হন। ২৪ জুন বেলা সাড়ে ১১টায় রিফাত শরীফ বরগুনা জিলা স্কুল মাঠে ডেকে নিয়ে এ বিষয়ে হেলাল শিকদারকে জিজ্ঞাসা করেন। একপর্যায়ে হেলালের একটি ওয়ালটন মোবাইল ফোন রিফাত শরীফ কেড়ে নেন।

হেলাল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়ন বন্ডকে বিষয়টি জানান। নয়ন বন্ড আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু রিফাত ফরাজীকে জানায়। রিফাত শরীফকে ফোন করে ফোনটি দিতে বলে রিফাত ফরাজী। এ সময় রিফাত শরীফ রিফাত ফরাজীকে মা-বাবা তুলে গালিগালাজ করেন। পরে রিফাত ফরাজী বিষয়টি জানিয়ে মিন্নিকে হেলালের ফোন উদ্ধার করে দিতে বলে। মিন্নি হেলালের ফোনটি আনার জন্য রিফাত শরীফকে ভর্ৎসনা করে ফোনটি ফেরত দিতে বলেন। এতে রিফাত শরীফ ক্ষুব্ধ হয়ে মিন্নিকে চড়-থাপ্পড় দেন ও তলপেটে লাথি মারেন। এতে মিন্নি ক্ষুব্ধ হয়ে রিফাত শরীফের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হত্যার পরিকল্পনা করেন।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, মিন্নি মোবাইল ফোনে নয়ন বন্ডের কাছে তার ওপর রিফাত শরীফের অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে কান্নাকাটি করেন। নয়ন বন্ডকে তার পথের কাঁটা (রিফাত শরীফ) সরিয়ে দিতে বলেন। সে মোতাবেক ২৫ জুন বিকাল সাড়ে ৫টায় বরগুনা সরকারি কলেজের শহীদ মিনারে মিটিং করে বন্ড ০০৭ গ্রুপের সদস্য নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী, রিশান ফরাজী, রায়হান, অলি উল্লাহ অলি, টিকটক হৃদয়, রাব্বি আকন, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার, রাকিবুল হাসান নিয়ামত, তানভীর ও নাজমুল হাসান। মিটিংয়ে হত্যাকাণ্ডের ছক কষা হয়।

অভিযোগপত্রে উঠে আসে, ছক বাস্তবায়নে বন্ড ০০৭ গ্রুপের সদস্যদের ২৬ জুন সকাল ৯টায় বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে থাকার জন্য ওইদিন সকাল ৮টা ৬ মিনিটে রিফাত ফরাজী গ্রুপে পোস্ট দেয়। সে অনুযায়ী গ্রুপের সদস্যরা কলেজের আশপাশে অবস্থান নেয়। নয়ন বন্ড ও মুসা সন্ধ্যা রানী মণ্ডলের দোকানের সামনে অবস্থান নেয়। রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ড সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখে- কে কে কোথায় অবস্থান করবে। নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর পরিকল্পনা অনুযায়ী রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার একটি ব্যাগে করে দুটি বগি দা নিয়ে আসে। রিফাত ফরাজীর নির্দেশমতো অলি উল্লাহ অলি ব্যাগটি কলেজের পূর্ব পাশে বাউন্ডারি দেওয়াল সংলগ্ন গলির মুখে মাইনুল ট্রেডার্স নামক দোকানের বিপরীত পাশে নুরুল হকের টিনশেড পরিত্যক্ত ঘরের বারান্দার চালের ওপর রেখে আসে।

তদন্তে উঠে আসে, ২৬ জুন সকাল ৯টা ২০ মিনিটে রিফাত শরীফ মিন্নিকে নিয়ে কলেজে আসেন। মিন্নি কলেজে ঢুকে রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের সঙ্গে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি জেনে নেন। সকাল ১০টায় মিন্নিকে নিয়ে রিফাত শরীফ কলেজ গেটের বিপরীতে মোটরসাইকেলের দিক যেতে থাকলে মিন্নি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্য আসামিদের রিফাত শরীফকে ধরার সুযোগ করে দেয়ার কৌশল নেন। রিফাত শরীফের মোটরসাইকেলে না উঠে পুনরায় মিন্নি কলেজ গেটের দিকে ফিরে যান। ওই সময় রিফাত শরীফ মিন্নিকে ফেরানোর জন্য তার পেছনে পেছনে যান। তখন মিন্নি রিফাত শরীফকে ধরার জন্য রিফাত ফরাজীসহ অন্যদের ইশারা দেন। সঙ্গে সঙ্গে রিশান ফরাজী রিফাত শরীফের দুই হাতসহ কোমর পেছন থেকে জাপটে ধরে। রিফাত ফরাজী শার্টের কলার ধরে এবং রায়হান, নাঈম, তানভীর, রাব্বি আকন, রিফাত হাওলাদার, টিকটক হৃদয়, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, প্রিন্স ও নাজমুল রিফাত শরীফকে কলেজ গেট থেকে টেনে-হিঁচড়ে ক্যালিক্স একাডেমির গেটের সামনে রাস্তার ওপর নিয়ে মারতে থাকে।

তদন্তে আরও উঠে আসে, মিন্নি পরিকল্পনা অনুযায়ী কোনো বাধা না দিয়ে আসামিদের পেছনে পেছনে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যান। ওই সময় নয়ন বন্ড পূর্বদিক থেকে দৌড়ে এসে রিফাত শরীফকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। রিশান ফরাজী তখনও রিফাত শরীফের কোমর জাপটে ধরে ছিল। একপর্যায়ে নয়ন বন্ড ক্যালিক্স একাডেমির গেটের পাশে থাকা চটপটির দোকান থেকে একটি স্টিলের চামচ নিয়ে তা দিয়ে রিফাত শরীফকে পেটাতে থাকে। রিফাত ফরাজী দৌড়ে গিয়ে নুরুল হকের টিনের চালে রাখা ব্যাগ থেকে দুটি বগি দা দুই হাতে নিয়ে আসে। একই সময় টিকটক হৃদয় ও রিফাত হাওলাদার দৌড়ে গিয়ে দুটি লাঠি আনে। রিফাত ফরাজী একটি দা রাস্তার ওপর রেখে অন্যটি দিয়ে রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এ সময় নয়ন বন্ড রিফাত ফরাজীর হাত থেকে দা নিয়ে রিফাত শরীফকে কোপাতে থাকে। রিফাত ফরাজী রাস্তার ওপর রাখা দা নিয়ে তা দিয়ে রিফাত শরীফকে আবার কোপাতে থাকে। এ সময় টিকটক হৃদয়, রাকিবুল হাসান রিফাতসহ অন্য আসামিরা পাহারা দেয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, এতক্ষণ মিন্নি স্বাভাবিক থাকলেও নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী যখন রিফাত শরীফকে কোপাতে থাকে তখন ঘটনার দায় এড়ানোর জন্য কৌশলে রিফাত শরীফকে বাঁচানোর অভিনয় করে শুধু নয়ন বন্ডকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, মিন্নি যে মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করতেন সেটি নয়ন বন্ডের মা সাহিদা বেগমের। ২৬ জুন ঘটনার দিন মিন্নি তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর ০১৭১০৬১৬১১৩ দিয়ে নয়ন বন্ডের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর ০১৭৩৪৭৫৭৩১৬-তে সকাল ৯টা ৮ মিনিটে ফোন করে ৬ সেকেন্ড কথা বলেন। এ ছাড়াও ওইদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত ৭ বার নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী, রিশান ফরাজী ও রকিবুল হাসানের সঙ্গে কথা বলেন মিন্নি। ঘটনার পর বেলা ১১টা ৩১ মিনিটে নয়ন বন্ড তার ফোন দিয়ে মিন্নির কাছে এসএমএস দেয়। তাতে লেখা ছিল-‘আমারে আমার বাপে জন্ম দিয়েছে।’ রিফাত শরীফ মৃত্যুর আধা ঘণ্টা আগে বিকাল ৩টায় নয়ন বন্ড মিন্নিকে ফোন করে ৮০ সেকেন্ড কথা বলে।

অভিযোগপত্রে মিন্নিকে ‘রিফাত শরীফ হত্যার মাস্টার মাইন্ড’ বলা হয়েছে। আর মিন্নিকে ৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে। মাস্টারমাইন্ড হলে মিন্নি সাত নম্বর আসামি কেন- এমন প্রশ্নে তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির বলেন, পরিকল্পনাকারী হলেও সরাসরি হত্যায় অংশ নেয়নি সে (মিন্নি), হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেছে। ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টায় প্রকাশ্যে বরগুনা সরকারি কলেজ গেটের সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে আহত করা হয়। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিকাল ৪টার দিকে মারা যান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×