নজরদারিতে ৫০ জন: আড়ি পেতে দুর্নীতির তথ্য পাচ্ছে দুদক

অনুসন্ধান ও তদন্তের প্রয়োজনে গোপনে তথ্য নেয়া হচ্ছে অনেকের * সন্দেহভাজনদের গতিবিধি নজরদারি ও কথোপকথন রেকর্ড করা হচ্ছে * পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্তে প্রযুক্তি ব্যবহার -দুদক সচিব

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মিজান মালিক

দুদক। ফাইল ছবি

ঘুষ ও দুর্নীতিতে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপারে গোপনে অনুসন্ধান, তাদের গতিবিধি ও অবস্থান শনাক্তে মোবাইল ট্র্যাকিং শুরু করেছে দুদক। তারা ঘুষ লেনদেন বা দুর্নীতি সংক্রান্ত কী ধরনের আলাপচারিতা করছেন, তা জানতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সতর্কতার সঙ্গে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এছাড়া অর্থ পাচার, ঘুষ লেনদেন, কমিশন দিয়ে টেন্ডার হাতিয়ে নেয়া, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগে বেসরকারি পর্যায়ের অনেককেও নজরদারি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অন্তত ৫০ জনের তথ্য দুদকের ভাণ্ডারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের অনুমতি পায় দুদুক। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে সন্দেহভাজনদের বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করে। সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজের গতিবিধি অনুসরণ, তাদের কথোপকথন রেকর্ড, চলাফেরা ও পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্তে দুদক এ সুবিধা ব্যবহার করে আসছে। এতে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে বড় ধরনের সহায়তা মিলছে বলেও জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা সতর্কতার সঙ্গে এ সংক্রান্ত কিছু কাজ করছি। আমাদের গোয়েন্দা টিম নানা মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। দুদকের হটলাইন-১০৬ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলছে। অকারণে কেউ যেন হয়রানি না হন, সেদিকেও আমাদের নজর আছে। টিমকে সেভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ট্র্যাকিংয়ের বিষয়টি দুদক চেয়ারম্যানের হাতে রয়েছে। এর যৌক্তিকতা উল্লেখ করে একজন কর্মকর্তা বলেন, কারও কথা বলার স্বাধীনতা যেন খর্ব না হয়, সেটা কমিশন নিশ্চিত করতে চায়। তবে যাদের বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, পর্যায়ক্রমে তাদের সবাইকে এর আওতায় আনা হবে।

দুদক সচিব দিলোয়ার বখত বলেন, যাদের ট্র্যাকিং করা দরকার, আমাদের আইটি টিম তাদের ট্র্যাকিং করছে। এর মাধ্যমে অভিযুক্তদের দুর্নীতির প্রমাণ নিয়ে গ্রেফতার করাও সহজ হচ্ছে। দুদকের সক্ষমতা আরও বাড়াতে একটি ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

দুদক চায় সংস্থাটির কার্যক্রম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা- ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ও ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) আদলে পরিচালনা করতে।

দুদকের একজন মহাপরিচালক এ ধারণা দিয়ে যুগান্তরকে বলেন, এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমাদের একটি উচ্চপর্যায়ের টিম একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে সিবিআইয়ে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাচ্ছেন। এরপর আরেকটি টিমকে পাঠানো হবে এফবিআইয়ের ট্রেনিংয়ে।

জানা গেছে, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সহায়তায় দুদক পুরো কাজটি পরিচালনা করছে। এজন্য একটি বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অন্য সংস্থার হাতেও রয়েছে।

দুদকে এ কাজের দায়িত্বে রয়েছে বিশেষভাবে দক্ষ একটি টিম। দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধান পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর তত্ত্বাবধানে মোবাইল ট্র্যাকিংসহ গোয়েন্দা নজরদারি পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া দুদকের আইটি ও সফটওয়্যার টিমও যৌথভাবে কাজ করছে। এ টিমের সদস্যরা সন্দেহভাজন বা দুদকের তালিকাভুক্ত ব্যক্তির গতিবিধি অনুসরণসহ তাদের নজরদারি করছে। তাদের সবকিছু (কথা, গতিবিধি, অবস্থান ইত্যাদি) ট্র্যাকিং করে সার্ভারে ধারণ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, একজন ব্যবসায়ী জনতা ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ২০০৪ সালে ওই ব্যবসায়ী বিএনপির তৎকালীন মহাসচিবের হাত ধরে ব্যবসায় নামেন। তার বাড়িও ওই মহাসচিবের এলাকায়।

ওই সময় হাওয়া ভবনের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। ওয়ান ইলেভেনের সময় গ্রেফতারও হন। দুদকের এক কর্মকর্তা ওই ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ না করে বলেন, তার গতিবিধির ওপর নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

চট্টগ্রাম কারাগারে কর্মরত ছিলেন, এখন অন্য একটি বিভাগীয় জেলায় জেলার হিসেবে কর্মরত এক কর্মকর্তার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে জানা গেছে। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গোপনে অবৈধ অর্থ, ঘুষ ও দুর্নীতির অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।

একজন কর্মকর্তা জানান, ওই কারা কর্মকর্তার কথোপকথন থেকে জানা যায়, তার ঘরে ঘুষের ২৮ লাখ টাকা রয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর তাকে গ্রেফতারেরও পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু একই দিন আরেক কারা কর্মকর্তা সিলেট কারা কর্তৃপক্ষের ডিআইজি পার্থ গোপল সাহাকে ঘুষের টাকাসহ গ্রেফতার করতে যাওয়ার খবরটি আগেভাবে জেনে যাওয়ায় ওই জেলার সতর্ক হয়ে পড়েন।

সূত্র জানায়, দুদকের ভাণ্ডারে এমন অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি ব্যক্তির তথ্য রয়েছে। যাদের নজরদারি ও মোবাইল ট্র্যাকিং করে দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

এ তালিকায় অন্তত ৫০ জনের নাম রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজন জনপ্রতিনিধি, দু’জন ইউএনও, একজন বিতর্কিত জেলা প্রশাসক, এক ডজন সাবরেজিস্ট্রার, সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মচারীও রয়েছেন। চাকরি দেয়ার নাম করে চাকরিপ্রর্থীদের ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া একাধিক চক্রও রয়েছে দুদকের জালে।

দুদকের নাম ব্যবহার করে এমনকি দুদকের কমিশনার, মহাপরিচালক, পরিচালক ও উপপরিচালকের নাম ব্যবহার করে একাধিক চক্র বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে ফাঁদে ফেলছে।

ওই চক্রের হাতে হয়রানির শিকার একাধিক ভুক্তভোগী দুদকের কাছে অভিযোগ দিলে সেই সূত্র ধরে চক্রটিকে শনাক্তে কাজ শুরু হয়েছে। পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বাধীন টিম এরই মধ্যে ৭-৮ জনের নাম ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করেছে। তাদের ধরতেও ট্র্যাকিং করা হচ্ছে।

এছাড়া দুদকের মামলার পলাতক আসামিদের মধ্যে যারা জামিনে নেই, আবার দেশেই আছেন- এমন আসামিদের ধরতেও ফোন নম্বর সংগ্রহের পর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গ্রেফতার করা হচ্ছে।

একজন পরিচালক বলেন, বড় বড় দুর্নীতির ঘটনায় অনুসন্ধান পর্যায়েই জড়িত সন্দেহভাজন অনেকের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার পর আমরা আসামির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখা ও ইমিগ্রেশনে চিঠি দিয়ে থাকি।

তাতে আসামির নাম, ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বরসহ তালিকা দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও অনেকে দেশ থেকে চলে যায়। অনেক আসামি দেশে থাকলেও দুদক খুঁজে পায় না। তাদের (পলাতক আসামি) অবস্থান শনাক্ত করাসহ কোনো আসামি দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছে কি না, আগেভাগে তা জানতে প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া হচ্ছে।