উত্তরায় বাসচাপায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু: পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ স্বজনদের

এজাহারে কী লেখা ছিল- তা জানতেন না বাদী * ক্ষতিপূরণ নয়, হত্যার বিচার চায় পরিবার * তুরাগে মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ

  যুগান্তর রিপোর্ট ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসাধীন আলভী
চিকিৎসাধীন আলভী। ছবি: যুগান্তর

‘ভিক্টর ক্লাসিক’ পরিবহনের চাপায় কলেজছাত্র মেহেদী হাসান নিহত ও তার বন্ধু ইয়াসির আলভী রব গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনরা। তাদের দাবি, আলভী ও মেহেদী নিছক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হননি।

বাসের চালক ইচ্ছে করে তাদের চাপা দিয়েছে। তারা বলছেন, চার দিন আগে একই পরিবহনের চাপায় ইয়ামিনের বাবা সঙ্গীত পরিচালক পারভেজ রব নিহত হওয়ার ঘটনায় শনিবার সন্ধ্যায় পরিবারের সঙ্গে সমঝোতায় বসেছিল ক্লাসিক পরিবহনের সংশ্লিষ্টরা। সমঝোতা করতে না পেরে ইয়ামিনকে বাসচাপায় হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে তার সঙ্গে থাকা মেহেদী হাসান বাসচাপায় নিহত হন। বাসচালক রফিকুল ইসলাম তাকে আগে থেকেই চিনত। পুলিশ প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে নিছক দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে রোববার উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা নিয়েছে। এজাহারে কী লেখা ছিল সেটি জানতেন না বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী মেহেদীর মামাতো ভাই মো. ফিরোজ।

আলভীর মা রুমানা সুলতানা সোমবার যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করে বলেছেন, ঘটনার দু’দিন পেরিয়ে গেলেও ঘটনার বিষয়ে আলভীর সঙ্গে কথা বলেনি পুলিশ। এমনকি তার পরিবারের কারও সঙ্গে পুলিশ কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি। আর এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি হত্যাকাণ্ড।

আলভীকে ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের বাসের চালক ও হেলপাররা চেনেন দাবি করে তিনি বলেন, ধউরে আমাদের বাসার পাশেই ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের বাসগুলো রাখা হয়। এ কারণে আলভীকে তারা চেনেন। সমঝোতা না হওয়ায় তারা আলভীকে টার্গেট করে হত্যা করতে চেয়েছিল।

তাদের টার্গেটে পড়েই এখন আলভী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আর ছেলের বন্ধুকেও নির্মমভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। এসব ঘটনার কঠোর বিচার চাই আমি। আমি কোটি টাকা চাই না, আমি শুধু বিচার চাই।

এদিকে মেহেদী হত্যার বিচার এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে সোমবার তুরাগের ইস্টওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সড়ক অবরোধ করে দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা। এ সময় আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া সড়কের দু’পাশে যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে পুলিশ এসে বিচার ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলে তারা সড়ক ছেড়ে দেন। পরিবার বলছে, ক্ষতিপূরণ নয়, তারা হত্যার বিচার চান।

বাসচাপায় গুরুতর আহত আলভী শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন। সেখানে সোমবার দুপুরে যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার সন্ধ্যায় তুরাগের ধউর এলাকায় সমঝোতার জন্য এসেছিল ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের লোকজন। সমঝোতা না হওয়ায় ওরা ক্ষিপ্ত হয়ে চলে যায়।

ওইদিনই রাতে বাবার (পারভেজ রব) কুলখানির জন্য মেহেদীকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গী বাজার যাচ্ছিলাম আমি। ধউর থেকে স্লুইসগেট পর্যন্ত একটি পিকআপে যাই আমরা। যানজট থাকায় পিকআপ থেকে নেমে হাঁটা শুরু করি আমরা। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িগুলো চলতে শুরু করে।

এ সময় ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসে ওঠার চেষ্টা করি আমরা। ইশারা দেয়ার পর হেলপার বাসের দরজা খুলে দেয়। ওঠার সময় হঠাৎ করেই বাসের হেলপার দরজা বন্ধ করে দেয়। আমি জানালা ধরে ভেতরে উঁকি দিয়ে বলি, আমাদের নিয়ে যান। এ সময় চালক আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে জোরে টান দেয়। আমি জানালার মধ্যে ঝুলতে থাকি।’

আলভী আরও বলেন, ‘আমি তখন ঝুলতে ঝুলতে বলছিলাম, ‘ভাই দয়া করে বাসটা থামান। আমি যাব না।’ তখন মেহেদীও পেছন পেছন দৌড়াতে থাকে। হঠাৎ করে আমি চাকার নিচে পড়ে যাই। আমার আর কিছু মনে নেই। আমাকে ওই বাসের চালক চিনত।’

বাসচাপায় গুরুতর আহত আলভীর এই বক্তব্যের সঙ্গে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বক্তব্যের মিল নেই। মামলায় উল্লেখ করা হয়, রাত নয়টা ৫০ মিনিটে উত্তরার স্লুইসগেট বাসস্ট্যান্ড এলাকা ও আবদুল্লাহপুরের মাঝামাঝি মেহেদী হাসান ও ইয়াসির আলভী সড়ক পার হওয়ার সময় ভিক্টর ক্ল্যাসিক পরিবহনের একটি বেপরোয়া গতির বাস (ঢাকা মেট্রো-ব, ১১-৮৬৭০) পেছন থেকে তাদের ধাক্কা দেয়।

এতে তারা গুরুতর আহত হন। তাদের উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেয়া হয়। রাত ১১টার দিকে চিকিৎসকরা মেহেদীকে মৃত ঘোষণা করেন। মামলার বাদী মেহেদীর মামাতো ভাই মো. ফিরোজ যুগান্তরকে বলেন, মামলার এজাহারে কী লেখা আছে সেটি তিনি জানেন না।

পুলিশ এজাহার লেখার পর তিনি শুধু স্বাক্ষর করেছেন। তিনি আরও বলেন, রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেনি। ওরা (মেহেদী ও আলভী) বাসে ওঠার চেষ্টা করছিল। এ সময় চালক বেপরোয়া হয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন।

পুলিশের উত্তরা জোনের এসি শচীন মৌলিক যুগান্তরকে বলেন, শনিবার রাতে আবদুল্লাপুর এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় দু’জন বাসের চাপায় গুরুতর আহত হন। পরে তাদের মধ্যে মেহেদী মারা যান। আলভী নামে একজন গুরুতর আহত অবস্থায় শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন।

বাদীর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, মামলার বাদীকে তো জোর করে স্বাক্ষর করানো হয়নি। তিনি তো স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করেছেন। তার অভিযোগ ঠিক নয়।

এদিকে বৃহস্পতিবার তুরাগের ইস্টওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে বাসচাপায় পারভেজ রবের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের চালক শাহ আলমকে এখনও গ্রেফতার করেত পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে তুরাগ থানার ওসি নুরুল মোত্তাকীন বলেন, পারভেজ রবকে চাপা দেয়ার ঘটনায় বাসের চালককে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

সামনে শুধুই অন্ধকার : সোমবার দুপুরে শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারের ৬ তলায় গিয়ে দেখা যায়, ছেলের পাশে ভাবলেশহীন বসে আছেন মা রুমানা আক্তার। চার দিন আগেই তিনি স্বামী পারভেজ রবকে হারিয়েছেন।

ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস তার স্বামীর প্রাণ কেড়ে নেয়। স্বামীর মৃত্যুশোক সামলানোর আগেই একই বাসের চাপায় তার ছেলে গুরুতর আহত হন। এখন তিনি ছেলেকে কিভাবে বাঁচাবেন এ নিয়ে ভেবে সামনে শুধুই অন্ধকার দেখছেন।

তিনি বলেন, আমি কী করব বুঝতে পারছি না। চার দিন আগেই স্বামীকে হারিয়েছি। এখন ছেলে পঙ্গু হওয়ার পথে। তার চিকিৎসা ব্যয় কীভাবে মেটাব সেটাও ভাবতে পারছি না। চিকিৎসকরা বলেছেন, আলভীর চিকিৎসায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাগতে পারে। সেটা কোথা থেকে আসবে আমি ভাবতে পারছি না।

ক্ষতিপূরণ নয়, বিচার চান মেহেদীর বাবাও : মেহেদী হত্যার প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে তুরাগের ইস্টওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে স্থানীয়রা। সেখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়।

মানববন্ধনে মেহেদীর বাবা ইউসুফ মিয়া বলেন, আমার ছেলে দুর্ঘটনায় মারা যায়নি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি কোনো ক্ষতিপূরণ চাই না। আমি এই হত্যার বিচার চাই। আমি ঘাতকের ফাঁসি চাই। এ কথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, আমি চাই না এভাবে কোনো বাবা পুত্রহারা হোক। তাই প্রশাসনের কাছে একটাই দাবি, সর্বোচ্চ শাস্তি যেন নিশ্চিত করা হয়।

মানববন্ধন শেষে, স্থানীয়রা দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে মেহেদী হত্যার বিচার এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের দাবি মানা না হলে তারা সড়ক ছেড়ে যাবেন না। এ সময় আশুলিয়া-আবদুল্লাহপুর সড়কের দু’পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়। দুপুর ২টার দিকে পুলিশ তাদের আশ্বাস দিলে তারা সড়ক ছেড়ে চলে যান।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×