কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন

চার চ্যালেঞ্জের মুখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক

মোট খেলাপি ঋণ ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা * রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকেই ৪৪ হাজার ৩৬ কোটি টাকা * মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে * ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল

  মিজান চৌধুরী ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়া খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণসহ চার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো। অন্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে মূলধন ঘাটতি, দুর্বল মাত্রায় শ্রেণীকৃত ঋণ আদায় ও প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান সংকটগুলো উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি’ বিভাগের প্রতিবেদনে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছে। এতে সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মূলধন ঘাটতি পূরণে আইপিও ইস্যুর সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

সূত্রমতে, ‘ব্যাংকিং খাতের বিরাজমান চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে উল্লেখ করা হয়- বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে উদ্বেগজনক হারে শ্রেণীকৃত (খেলাপি) ঋণ বাড়ছে। এ ঋণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামিয়ে আনাই ব্যাংকগুলোর অন্যতম চ্যালেঞ্জ। সেখানে আরও বলা হয়, সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। এ ছাড়া বিগত কয়েক বছরে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ। ফলে কয়েকটি ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। মূলধন ঘাটতি প্রসঙ্গে বলা হয়, বিগত কয়েক বছর ধরে সরকারি ব্যাংকগুলোকে ঘাটতি পূরণে মূলধন জোগান দেয়া হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোয় সরকার নিজেই মূলধন দেয়ার ফলে দেশের আর্থিক খাতে নৈতিক বিপদ বাড়ছে। যা ব্যাংকগুলোর জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ বটে। বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে সরকার কর্তৃক শুধু মূলধন জোগান দিয়ে নয়, আইপিও ইস্যুর মাধ্যমে তা বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইওদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখানে খেলাপি ঋণকে মূলধন ঘাটতির বড় কারণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এমডিদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ভর্তুকিতে কৃষকদের টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি এবং রাজশাহী কৃষি ব্যাংক। ফলে ব্যাংক দুটির লোকসান ও মূলধন ঘাটতি হবে এটিই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, এই চারটি সংকটে ব্যাংকিং খাত জর্জরিত। এটি নতুন কিছু নয়। আগে থেকেই হয়ে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এতদিন পর কেন এটি বলছে। আমি মনে করি এটি ঘটনা ঘটার পর নতুন করে জানানোর মতো। এক ধরনের স্মরণ করে দেয়া।

বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আউয়াল খান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, মূলধন ঘাটতি অধিকাংশ ব্যাংকের আছে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকগুলো এককভাবে এটা অতিক্রম করতে পাড়বে তা নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা দরকার। সরকার যদি আইপিও ইস্যু করে তবে তা মূলধন ঘাটতি পূরণের বড় হাতিয়ার হবে। এটি করতে পারলে ভালো। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল্লাহ আল মাসুম যুগান্তরকে বলেন, মূলধন বড় সমস্যা নয়। মূল সমস্যা হবে তারল্য সংকট। ফারমার্স ব্যাংকে মূলধন পরিস্থিতি ভালো কিন্তু টাকা দিতে পারছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে তাদের তারল্য নেই। এতেই প্রমাণ হয় তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংক দেউলিয়া হতে পারে। এ দিক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নিরাপদ জোনে আছে। তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় ব্যাংকের পক্ষে একা সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজের সব শ্রেণীর লোক নিয়ে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করতে হবে।

শ্রেণী ও অবলোপনকৃত ঋণ : শ্রেণীকৃত ঋণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনা ব্যাংকগুলোর অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি’ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকের শ্রেণী ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শ্রেণীকৃত ঋণ। ব্যাংকিং খাতে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের অর্ধেকে বেশি হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব তুলে ধরে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৭টি ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশেষায়িতসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে জুন মাসের হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের ৩৫০ কোটি টাকা। অবলোপন হচ্ছে মন্দ বা শ্রেণীকৃত ঋণ পাঁচ বছর ধরে আদায়ে ব্যর্থ হলে পরবর্তী সময়ে মামলা করে তা অবলোপন (রাইট অফ) করা হয়। অবলোপন হচ্ছে ব্যাংকিং খাতের জন্য ঝুঁকি।

শ্রেণীকৃত ঋণ আদায় : ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট শ্রেণীকৃত ঋণের মধ্যে মাত্র ৪ দশমিক ১০ শতাংশ আদায় সম্ভব হয়েছে। টাকার অঙ্কে ১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। একইভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকের আদায়ের পরিমাণ হচ্ছে ৬৪৯ কোটি টাকা, শতাংশ হিসাবে ১২ দশমিক ৭২। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণ আদায় পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়।

প্রভিশন ঘাটতি : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত কয়েক বছরে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে না। এর ফলে কয়েকটি ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা সঞ্চিতি হিসেবে রাখাই হচ্ছে প্রভিশন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত বছরের জুন পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ২৯০১ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ৩ হাজার ৪২১ কোটি টাকা।

মূলধন ঘাটতি : রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় আশঙ্কাজনক মাত্রায় মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে তা উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু তাই নয় আশঙ্কা রয়েছে সভরেন রেটিং-এ বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার। জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উল্লিখিত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে পৃথকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে এ টাকা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি মূলধনের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংক ৭০০ কোটি টাকা ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি মূলধন ৮০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×