উখিয়ায় ক্যাম্প পরিদর্শনে ৩ নোবেলজয়ী

আন্তর্জাতিক আদালতে খুনিদের বিচার হোক

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মুসলিমবিশ্বকে এগিয়ে আসার আহ্বান

  উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের নির্মূলে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালানো হচ্ছে। এর দায় এড়াতে পারেন না অং সান সু চি ও তার সরকার। দোষীদের আন্তর্জাতিক আদালতের মুখোমুখি করা হোক। এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশ সফররত তিন নোবেলজয়ী। উখিয়ার থাইংখালী তাজনিমারখোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্প সোমবার পরিদর্শন শেষে বিকাল ৪টায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে শান্তিতে নোবেলজয়ী ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান, উত্তর আয়ারল্যান্ডের মেরেইড ম্যাগুয়ার ও ইরানের শিরিন ইবাদি কথা বলার সময় আবেগে কেঁদে ফেলেন। তারা বলেন, মিয়ানমারে যে গণহত্যা, জাতিগত নিধন, গণধর্ষণ ও শিশুহত্যার জঘন্য ঘটনা ঘটেছে, তা মেনে নেয়া যায় না। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করে মুসলিমবিশ্বকে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

শান্তিতে নোবেলজয়ী ইরানের শিরিন ইবাদি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে নির্যাতিত, নিপীড়িত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ আজ বাংলাদেশে এসে পরবাসে জীবনযাপন করছে। এসব সর্বস্বান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য অমুসলিম রাষ্ট্রগুলো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বের হস্তক্ষেপ দাবি করছেন, সেখানে মুসলিম দেশগুলো চুপ থাকার বিষয়টি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে বিস্মিত হতে হয়। তিনি সমগ্র মুসলিম জাতিসত্তাকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। শান্তিতে নোবেলজয়ী ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান চোখের পানি ফেলে বলেন, রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের কথা আমরা শুনে আসছিলাম। আজ বাস্তবে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের হৃদয়বিদারক নির্যাতনের বর্ণনা শুনে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না। তিনি রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশুদের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, এর জন্য অং সান সু চি’র পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি বলেন, যেহেতু সু চি শান্তিতে নোবেলজয়ী একজন নারী। পাশাপাশি তিনি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর হিসেবে এর দায়ভার এড়াতে পারেন না।

শান্তিতে আরেক নোবেলজয়ী উত্তর আয়ারল্যান্ডের মেরেইড ম্যাগুয়ার বলেন, মিয়ানমারের সেনা, পুলিশ ও রাখাইনদের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও মানবিক সেবা দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে হৃদ্যতা দেখিয়েছেন, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এজন্য নোবেলজয়ী নিজে ও তার দেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাধুবাদ জানান। তিনি বলেন, এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দিয়ে সসম্মানে ফিরিয়ে নিতে হবে মিয়ানমারকে। এজন্য তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্ব তথা সমগ্র জাতিকে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে আরও বলেন, রোহিঙ্গা নারীদের যেভাবে ধর্ষণ, উৎপীড়ন ও নির্যাতন করা হয়েছে, এজন্য অং সান সু চি এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত।

এর আগে দুপুর ২টার দিকে তিন নোবেল বিজয়ী উখিয়ার থাইংখালী তাজনিমারখোলা রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছলে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও সংস্থা সংশ্লিষ্টরা তাদের স্বাগত জানান। পরে নোবেল বিজয়ীরা ওই ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে ক্যাম্পে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় ক্যাম্পের সার্বিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান এবং রোহিঙ্গাদের জীবনযাপনের খোঁজখবর নেন। উপস্থিত ডেপুটি সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহীন নোবেলজয়ীদের উদ্দেশে জানান, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের পাশাপাশি সব ধরনের মানবিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এরপর তিন নোবেল বিজয়ী সরাসরি তাজনিমারখোলা ক্যাম্পের ভেতরে যেখানে ধর্ষিতা, গুলিবিদ্ধসহ অসংখ্য নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু রয়েছে সেখানে যান। তারা একটি কক্ষে অপেক্ষমাণ মিয়ানমারের রাশিদংয়ের ছেয়াপ্রাং গ্রামের স্বামীহারা রোহিঙ্গা নারী ছুফাইয়া বেগম, সন্তানহারা নুর জাহান, সাবেকুন নাহার ও মিয়ানমার সেনার ধর্ষণের শিকার ৩ নারীর মুখ থেকে পাশবিক নির্যাতনের দীর্ঘ বর্ণনা শোনেন নোবেলজয়ীরা। এ সময় সাংবাদিকরা ওই রোহিঙ্গা নারীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তাদের কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন নোবেলজয়ীরা। মহিলাদের টিম লিডার সাবেকুন নাহার জানান, গত বছরের ২৭ আগস্ট মিয়ানমার সেনারা বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার দু’সন্তান, শ্বশুর, দেবরসহ একই পরিবারের ৫ জনকে চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করেছে। এ ঘটনা শোনার পর নোবেল বিজয়ীরা তাদের সামনে চোখের জল ফেলেন এবং বলেন, মিয়ানমার সরকারকে একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। নোবেলজয়ীরা গুলিবিদ্ধ, হাত-পা কাটা, চোখ উপড়ে ফেলা, স্বামী-সন্তান, স্ত্রী-পুত্রহারাসহ ক্ষতবিক্ষত বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter