এবার এইচএসসির প্রশ্ন ফাঁসের আগাম ঘোষণা!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শতাধিক অ্যাডমিন থেকে প্রশ্ন ফাঁসের এমন ঘোষণায় গোয়েন্দারা বিস্মিত, জড়িতদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে

  নূরুল আমিন ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এবার এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘোষণা আসল। সরকার যখন প্রশ্ন ফাঁস রোধে মরিয়া এবং বিষয়টি নিয়ে ঘরে-বাইরে প্রশ্নবাণে বিব্রত, তখন প্রশ্ন ফাঁসের এমন আগাম ঘোষণা অনেকটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার মতো বিরল ঘটনা। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শতাধিক অ্যাডমিন থেকে মিলেছে বিম্মিত হওয়ার মতো এমন তথ্য, যা দেখে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও রীতিমতো হতবাক।

এ প্রসঙ্গে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, যারা প্রশ্ন ফাঁসের এ ধরনের আগাম ঘোষণা দিচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এসব পেজের অ্যাডমিনদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞারা বলছেন, মূল হোতাদের গ্রেফতার করতে না পারায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের সদস্যরা। ফলে এভাবে প্রকাশ্যে প্রশ্ন ফাঁসের আগাম ঘোষণা দেয়ার দুঃসাহস পাচ্ছে তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি ড. জিয়া রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আগাম ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস এটি তো ভাবাই যায় না। যদি খবরটি সত্য হয় তাহলে এ বিষয়ে মন্তব্য করার কোনো ভাষা আমার নেই। তবে যারা এভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করছে তাদের কেন গ্রেফতার করা যাচ্ছে না সেটাও আমার বোধগম্য নয়।’

এদিকে সমালোচকদের অনেকে যুগান্তরের কাছে এমন মন্তব্য করেন যে, এ ঘটনার জন্য শিক্ষামন্ত্রী তার দায় এড়াতে পারেন না। প্রথম থেকে যদি এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হতো তাহলে এত বাড়তে পারত না। অতীতে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠলে তিনি তা আমলে নিতেন না। গুজব বলে উড়িয়ে দিতেন। এমনকি শিক্ষামন্ত্রী কিছুদিন আগে সাংবাদিকদের কাছে এও বলেন, তিনি যখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন তখনও এমন অভিযোগ ছিল। তারা বলেন, অন্য কোনো দেশ হলে এ দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে যেভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তাতে তিনি এখন অনেকটা নির্ভার।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন যেসব সামাজিক মাধ্যম থেকে ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোর অ্যাডমিন এখনও সচল রয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত এমন শতাধিক অ্যাডমিন থেকে উত্তরপত্রসহ এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন শতভাগ কমনের নিশ্চয়তা দিয়ে পরীক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। আকর্ষণীয় বাক্য লিখে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে তারা। আগ্রহী পরীক্ষার্থীদের টাকার বিনিময়ে ওই সব পেজের সদস্য করা হচ্ছে। এমনকি এসব পেজে পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকরা নীতি-নৈতিকতা জলাঞ্জলি দিয়ে টাকার বিনিময়ে সদস্য হচ্ছেন। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এটিকে ভয়াবহ আসক্তি উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা এসব অপরাধীদের শেকড় উপড়ে ফেলতে যথাসম্ভব সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু অভিভাবকরা যদি সচেতন না হন তাহলে পুরো সমাজ ব্যবস্থায় পচন ধরবে। আমরা এক সময় মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত হব।’

সূত্র আরও জানায়, চলমান পরীক্ষাগুলোর প্রশ্ন শুধু দেশ থেকে ফাঁস হচ্ছে এমন নয়। বিদেশ থেকেও ফাঁস হয়েছে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মনিটরিং করে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তাদের ধারণা, এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন দেশের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও ফাঁস হতে পারে। এমন আশঙ্কাকে মাথায় রেখে প্রশ্ন ফাঁস রোধে আরও কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যায় সে বিষয়ে পর্যালোচনা অব্যাহত আছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, দেশে এত কঠোর নজরদারির মধ্যেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তাদের ধারণা ছিল মধ্যপাচ্যের সাতটা কেন্দ্রে এমনটি হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। তাহলে ধরে নিতে হবে, প্রশ্ন ফাঁসকারীরা শুধু দেশে নয়, একই পন্থায় বিদেশেও এর নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এমরানুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগ থেকেই র‌্যাব সামাজিক মাধ্যমগুলো মনিটরিং করে যাচ্ছে। প্রশ্ন ফাঁস রোধে জড়িতদের গ্রেফতারে র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসএসসির লিখিত পরীক্ষার ১২ বিষয়ের প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছে অন্তত ১৫৩ জন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি অ্যাডমিন পরীক্ষা চলাকালে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেয়।

এইচএসসির প্রশ্ন ফাঁস রোধে জড়িতদের পাশাপাশি যারা প্রশ্ন ক্রেতা তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। এমনটি বলছেন পুলিশ ও র‌্যাবসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা মনে করেন শেকড়ের সন্ধান করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। তবে কেউ যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন সেদিকেও নজর রাখা হবে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.