ডিএসসিসির অপরিকল্পিত কর্মসূচি, মশক নিধনে ছয় কোটি টাকাই জলে!

প্রতি হোল্ডিং মালিকের জন্য ৪৭৫ মিলিলিটারের একটি করে ওষুধের ক্যান, বরাদ্দ নেই ভাড়াটিয়াদের * এত অল্প পরিমাণ ওষুধে কোনো কার্যকর ফল আসবে না -মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের

  মতিন আব্দুল্লাহ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মশক নিধন

ঢাকা দক্ষিণ সিটির উত্তর যাত্রাবাড়ীর ৮৪/৭/এ হোল্ডিংটি চারতলা। এ ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে ৩টি করে ১২টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ভবন মালিকসহ ওই হোল্ডিংয়ে ১৫টি পরিবারের বসবাস। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এডিস মশার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে ওই ভবন মালিককে ৪৭৫ মিলিলিটারের একটি অ্যারোসলের ক্যান দিয়েছে।

এ বিষয়ে ভবন মালিক সাইদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এডিস মশা তো শুধু ভবন মালিকদের কামড়ায় না, ভাড়াটিয়াদেরও কামড়ায়। তাই এ অল্প পরিমাণ অ্যারোসল দিয়ে ক’টা মশা মারব? ভাড়াটিয়াদের বাসায় যে মশা আছে, সেগুলোর কী হবে?

এ সমস্যা শুধু সাইদুল ইসলামের ক্ষেত্রেই নয়, এমন চিত্র ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) অধিকাংশ বাড়ির মালিকের। কারণ ডিএসসিসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি হোল্ডিং মালিকের জন্য ৪৭৫ মিলিলিটারের একটি করে ক্যান বরাদ্দ। যদিও এ সিটির মোট হোল্ডিংয়ের ৮০ শতাংশই ভাড়াটিয়া।

কিন্তু ভাড়াটিয়াদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। আবার যেসব হোল্ডিং মালিক ট্যাক্স পরিশোধ করেননি, তাদেরও দেয়া হচ্ছে না অ্যারোসল। কিন্তু মশা কামড় দেয়ার সময় তো আর বুঝবে না কে নিয়মিত ট্যাক্স পরিশোধ করেছেন অথবা করছেন না- এমন মন্তব্য এলাকাবাসীর।

আবার সব বাড়ির মালিকের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে না এ অ্যারোসল। শুধু ভিআইপিদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। অন্যদের ওয়ার্ডের নির্ধারিত স্থানে ট্যাক্স পরিশোধের রসিদ দেখিয়ে নিতে হচ্ছে অ্যারোসল। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অ্যারোসল আনতে অনেকেই সাড়া দিচ্ছেন না।

যাই হোক, সবমিলিয়ে অধিকাংশ বাসাবাড়িতেই পৌঁছাচ্ছে না কর্পোরেশনের বিতরণ করা এ অ্যারোসল।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় করা এ ‘অ্যারোসল কর্মসূচি’ কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখছে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যখন এডিসের প্রকোপ তুঙ্গে ছিল, তখন এ স্প্রে করলে বাসার ভেতরের এডিস নিধনে হয়তো কিছুটা কার্যকর হতো।

যদিও নগরীর মোট বাসাবাড়ির তুলনায় হোল্ডিং মালিকদের একটি করে দেয়া এ ক্যান খুবই অপ্রতুল। আর একেবারেই বাসার ভেতরের মশা মারার দায়িত্ব নেয়াটা সিটি কর্পোরেশনের জন্য কতটুকু যৌক্তিক, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া হুটহাট এভাবে অ্যারোসল কেনায় জনগণের ট্যাক্সের বিপুল অর্থ একরকম জলে পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন কীটতত্ত্ববিদ, নগর বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ কর্মসূচিতে কারও আর্থিক লাভ হলেও হতে পারে। তবে মশক নিধনে কোনো লাভ হবে না।

কারণ এ অল্প পরিমাণ অ্যারোসল একেকজন বাড়ির মালিককে দিয়ে নিজ বাসার মশা কয়েকদিনের জন্য মারা ছাড়া বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এ উদ্যোগ বাহুল্য এবং স্রেফ লোক দেখানো।

কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এডিস মশার প্রকোপের সময় ডিএসসিসির অ্যারোসল বিতরণের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক ছিল। এটা নগরবাসী বাসাবাড়িতে নিয়মিত ব্যবহার করলে উড়ন্ত মশক নিধনে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

কিন্তু সঠিক সময়ে এবং সর্বস্তরে ওষুধ সরবরাহ করতে না পারায় ‘অ্যারোসল’ মশক নিধনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভবন মালিক ও ভাড়াটিয়া সবার বাসায় মশা ঢুকবে, সবাইকে মশা কামড়াবে। এক্ষেত্রে কাউকে অ্যারোসল দেয়া হবে আর কাউকে দেয়া হবে না- এভাবে মশক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ফল বয়ে আনবে না।

ডিএসসিসির উদ্যোগ ভালো ছিল, তবে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে তার সুফল মেলেনি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ঘরের ভেতরের মশা মারার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের নয়।

ঘরের বাইরের আবর্জনা পরিষ্কার, নর্দমা ও খালগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করলে ঘরে মশা আসবে কোথা থেকে।

তিনি বলেন, অ্যারোসল বিতরণ কর্মসূচি কারোর ব্যক্তিগত মত বা সিদ্ধান্ত হতে পারে। এছাড়া কাউকে আর্থিকভাবে সুবিধা দেয়ার জন্যও করা হয়ে থাকতে পারে।

যেই উদ্দেশ্যে এটা করা হোক না কেন, এটি ব্যাপকভাবে মশক নিধনে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখছে না এবং রাখবেও না। এর পুরো অর্থই অপচয় হয়েছে।

নগর বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক যুগান্তরকে বলেন, ডিএসসিসি একটি বাহুল্য উদ্যোগ নিয়েছে। মশক নিধনের জন্য ডিএসসিসির এ অপচয় এবং বাহুল্য কাজ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

মশক নিধন বা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন ছিল শহরে সৃষ্ট বিভিন্ন কঠিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যসহ সব ধরনের বর্জ্য শতভাগ অপসারণ করা। দুই ভবনের মাঝখানের আবর্জনা পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা।

তাহলে মশক নিয়ন্ত্রণ বা নিধনে ওষুধ ব্যবহার করার প্রয়োজন হতো না। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন সেসব কাজ গুরুত্ব দিয়ে না করে বাহুল্য কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকা নষ্ট করে সিটি কর্পোরেশনের এসব কাজ করার কোনো অধিকার নেই। এ টাকা নিয়ে যদি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করত, সেটা মশক নিধনে আরও বড় ভূমিকা রাখত।

তবে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরের কাছে দাবি করে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিনিধিরা ডিএসসিসিতে এলে মশক নিধনে অ্যারোসল ব্যবহারে উপকার হতে পারে বলে পরামর্শ দেন।

ওই পরামর্শের ভিত্তিতে ‘অ্যারোসল’ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অ্যারোসল বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিতরণ কার্যক্রম শেষ করার চেষ্টা চালাচ্ছি।

ডিএসসিসির ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম অণু যুগান্তরকে বলেন, শুধু বাড়ির মালিকদের অ্যারোসল দেয়ার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। এতে আমরা বিব্রত হচ্ছি। আর অ্যারোসল বিতরণের বিষয়টি মেয়রের একক সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে কাউন্সিলরদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি।

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ২৯ জুলাই থেকে অ্যারোসল বিতরণ শুরু করে ডিএসসিসি। এরই মধ্যে ১ মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও অর্ধেক অ্যারোসলও বিতরণ শেষ হয়নি। অ্যারোসল শুরুতে ডিএসসিসি এলাকার স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মন্দির বা অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করেছে।

এসব প্রতিষ্ঠানে এক বা দুটি করে বিতরণ করেছে। এরপর ডিএসসিসি এলাকার ১ লাখ ৬৯ হাজার হোল্ডিংয়ে অ্যারোসল বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু ১ মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও অ্যারোসল বিতরণ করতে না পারায় ডিএসসিসির চরম ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে।

সরবরাহ সক্ষমতা না থাকলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে কেন অ্যারোসল কেনা হল- এমন প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী।

এ ব্যাপারে ৮৫ হোসনি দালান রোডের ভবন মালিক মো. মোস্তাকিম বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, এ এলাকার অ্যারোসল মাজেদ সরকার কমিউনিটি সেন্টারে বিতরণ করা হচ্ছে। হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের কপি দেখিয়ে এলাকাবাসীকে সেখান থেকে অ্যারোসল আনার অনুরোধ করা হয়েছে।

আমরা এসব ঝামেলা মাড়িয়ে অ্যারোসল আনার কথা ভাবছি না। এলাকার আরও অনেক মানুষও একটি অ্যারোসলের জন্য এত ঝামেলা অনুসরণ করে সংগ্রহ করতে রাজি নন, এ কারণে তারাও অ্যারোসল সংগ্রহ করছেন না।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, এসিআই ব্র্যান্ডের ৪৭৫ মিলিলিটারের অ্যারোসল ক্রয় করেছে সংস্থার ক্রয় ও ভাণ্ডার বিভাগ। জরুরি ভিত্তিতে ক্রয় করায় উন্মুক্ত দরপত্রে না গিয়ে সরাসরি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করেছে।

২৮৮ টাকা করে ২ লাখ ৩ হাজার ক্যান অ্যারোসল ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা।

সংস্থার রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সোমবার পর্যন্ত ১ লাখ ১৫ হাজার অ্যারোসল বিতরণ করা হয়েছে। বাকিগুলোর বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রুটিন কার্যক্রম বাদ দিয়ে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যস্ত সময় ব্যয় করছেন অ্যারোসল বিতরণে। সক্ষমতার অভাবে রাত-দিন পরিশ্রম করেও কাক্সিক্ষত সাফল্য নেই অ্যারোসল বিতরণে।

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×