পর্ষদের চাপ

ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অকার্যকর

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিআইবিএম
বিআইবিএম। ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ইচ্ছায় ঋণ বিতরণ করা হয়। অনেক সময় রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (আরএমডি) বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের কোনো সম্মতি থাকে না। এরপরও ঋণ বিতরণ হয়। এভাবে পর্ষদের চাপে বিতরণ করা ঋণই পরে খেলাপি হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইচ্ছা থাকলেও আরএমডির কিছুই করার থাকে না। ফলে ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ।

সোমবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) ‘ইফেকটিভনেস অব রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন অব ব্যাংকস-অ্যান অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা।

এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএম নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং বিআইবিএমের মহাপরিচালক মো. নাজিমুদ্দিন।

কর্মশালায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ও পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমদ চৌধুরী, সাবেক সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি, অধ্যাপক ও পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব, ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুখ মঈনুদ্দিন আহমেদ। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের ড. মোজাফফর আহমদ চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা।

বাংলাদেশে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের কার্যক্রম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত বিভাগটি পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। সে কারণেই দিনের পর দিন বাড়ছে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং অ্যাডভান্স ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) বা ঋণসীমা লঙ্ঘন।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বিআইবিএমের অধ্যাপক মো. নেহাল আহমেদ বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে আগে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যকর ছিল না। ধীরে ধীরে ধারণাটি তৈরি হয়েছে। আশা করি, ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে ঋণ দেয়া অনেকটা ভূমিকম্পের আগে নিজেদের প্রস্তুত করে নেয়ার মতো। সে কারণে প্রত্যেক ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব নীতিমালা থাকা উচিত। বিভাগটিকে অটোমেশনের আওতায় আনার পাশাপাশি অভিজ্ঞ লোক দিয়ে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মুক্ত আলোচনায় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন বলেন, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশের খেলাপি ঋণ ৩-৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে আমাদের দেশের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে তুলনামূলকভাবে ঋণ বিতরণ কম হচ্ছে। অন্যদিকে একশ্রেণির রাঘববোয়ালরা ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দিতে চায় না। থাকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইনের পরিবর্তন এবং তা যথাযথ প্রয়োগের পরামর্শ দেন তিনি।

সীমান্ত ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি বলেন, গবেষণার জন্য যখন মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে, তখন অনেকেই সঠিক তথ্য লুকিয়েছি। নিজেদের সমস্যার কথা উপস্থাপন করতে চাই না।

এক্ষেত্রে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার কাছে নিজেকে ভালো প্রমাণ করলেও সামগ্রিকভাবে ক্ষতির শিকার হয় ব্যাংকিং খাত। এছাড়া ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সব ব্যাংককে একই মাপকাঠিতে পরিমাপ না করার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর ব্যাংক এবং অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের ঝুঁকির মাত্রা একেবারেই আলাদা।

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড বা বিডিবিএলের একজন প্রতিনিধি বলেন, পদ্মা ব্যাংক ও পিপলস লিজিংয়ের ঘটনায় আমরা বুঝতে পারি তারা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছে।

তবে সবসময় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কথা চিন্তা না করে পরিচালকদের সুশাসনের বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত। এছাড়া অর্থঋণ আদালতে ১০-১২ বছর পর্যন্ত পড়ে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরামর্শ দেন তিনি।

মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারী আরও একজন বলেন, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ইচ্ছা না থাকলেও অনেক সময় পরিচালনা পর্ষদের অনুমতিতে ঋণ দেয় ব্যাংক। এক্ষেত্রে রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সিদ্ধান্ত কোনো কাজে আসে না।

ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুখ মঈনউদ্দিন আহমেদ বলেন, শুধু রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটি থাকলে সব সমস্যার সমাধান হবে না। সবার আগে কর্মীদের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন প্রয়োজন। যেহেতু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না, তাই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের দায়ী করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিআইবিএম মোজাফফর আহমেদ চেয়ার প্রফেসর বরকত-এ-খোদা বলেন, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে শুধু একটি বিভাগ নয়, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদ এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থা- সব পক্ষ মিলে একত্রে কাজ করতে হবে। ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ কমিয়ে ক্ষুদ্রঋণে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×