রংপুর-৩ উপনির্বাচন: লাঙ্গলের ঘাঁটিতে ভোটের হাওয়া আসিফের দিকে

নেতাকর্মীদের ভোট লাঙ্গলে যাবে কি না, তা নিয়ে আমিও চিন্তিত -মেয়র মোস্তাফিজার রহমান

  মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রংপুর-৩ আসন
রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে মঙ্গলবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে মোটরগাড়ি প্রতীক গহণ করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ, ছবি: যুগান্তর

রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেয়ায় ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে শুরু করেছে। বলাবলি হচ্ছে, জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনের উপনির্বাচনে লাঙ্গলের প্রার্থী বাছাইয়ের ভুলের খেসারত দিতে হতে পারে দলকে।

মাঠে নৌকার প্রার্থী না থাকায় ভোটের হাওয়া এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফের দিকে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ছাড়াও জাতীয় পার্টির ক্ষুব্ধ ভোটারদের সিংহভাগ ভোটই স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফের বাক্সে পড়ার ইঙ্গিত মিলছে।

এছাড়া বঙ্গবন্ধু ও কারাগারে ৪ জাতীয় নেতার হত্যা মামলার আসামির স্ত্রী হিসেবে বিএনপির প্রার্থী রিটা রহমান সম্পর্কেও ভোটারদের মাঝে যে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, তা ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য কাল হয়ে উঠেছে। সব মিলে উপনির্বাচনে আসিফের জয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগর কমিটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সিংহভাগ এরই মধ্যে প্রকাশ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী মকবুল শাহরিয়ার আসিফের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

শুধু তা-ই নয়, জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের সঙ্গে কথা বলার পর তাদেরও একই মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে।

কথা হয় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এই নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারব না। আমি অসুস্থ। আমি মনোনয়ন বোর্ডে ছিলাম না। কেন্দ্রীয়ভাবে যারা রাহগীর আল মাহি সাদকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন, তারাই ভালো জানেন কেন তাকে মনোনয়ন দিলেন। তারাই জানেন কীভাবে নির্বাচিত করবেন দলের প্রার্থীকে। ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভোট লাঙ্গলের পক্ষে যাবে কি না, তা নিয়ে আমিও চিন্তিত। দেখা যাক কী হয়।’

আসিফ হচ্ছেন প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই সাবেক এমপি মোজাম্মেল হোসেন লালুর ছেলে। জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতারা বলছেন, উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে জেলা ও মহানগর নেতাদের আবেগ- চাওয়া -পাওয়াকে কেন্দ্রীয় নেতারা উপেক্ষা করে গেছেন।

দলের অনেক নেতাকর্মী এখন জাতীয় পার্টির সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা কমিটির সদস্য সচিব স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফের পক্ষে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে কথা হয় জাতীয় পার্টির নগরীর ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেমের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এরশাদ পরিবারের সদস্য হিসেবে আসিফকে চিনি। আমাদের প্রয়াত নেতা এরশাদের প্রতি যদি কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়, তা হলে এরশাদের ভাইয়ের ছেলে আসিফকে নির্বাচনে জয়যুক্ত করা উচিত। আসিফকে বহু জনসভায় এরশাদ পরিচয় করে দিয়েছেন।

জাতীয় পার্টির মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সচিব এসএম ইয়াসির বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আসিফকে মনোনয়ন না দেয়ার কারণে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। আমরা চেষ্টা করছি; কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে নয়। তৃণমূল নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে স্থানীয় নেতৃত্বকে দলের মনোনয়ন না দেয়ায় নেতাকর্মীদের ক্ষোভের ভোট আসিফের বাক্সে পড়বে। আমরা এখনও প্রচারে নামার সাহস পাচ্ছি না। কারণ সাধারণ মানুষের সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই।’

দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট রেজাউল করীম রাজু সোমবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এছাড়া উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নিয়ে বিপাকে রয়েছে স্থানীয় বিএনপিও। এবারও ধানের শীষ নিয়ে জোটের প্রার্থী হয়েছেন বিলুপ্ত পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান রিটা রহমান।

তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। তাকে দলের পক্ষে মনোনয়ন দেয়ায় খুশি হতে পারেননি দলের জেলা-মহানগর কমিটির শীর্ষ থেকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীরা : রংপুর সদর-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে রংপুরের রিটার্নিং ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা জিএম সাহাতাব উদ্দিন প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেন।

বিএনপি প্রার্থী রিটা রহমান ধানের শীষ, জাতীয় পার্টির প্রার্থী রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ লাঙ্গল, স্বতন্ত্র প্রার্থী মকবুল শাহরিয়ার আসিফ মোটরগাড়ি, গণফ্রন্টের কাজী শহিদুল্লা মাছ, খেলাফত মজলিসের তৌহিদুর রহমান দেয়াল ঘড়ি, এনপিপির শফিউল আলম আম মার্কা পেয়েছেন।

প্রতীক পাওয়ার পর পরই গণসংযোগে নেমে পড়েছেন প্রার্থীরা। তারা ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চান এবং রংপুরকে আধুনিক সিটি হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রংপুরের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার করছেন।

বেলা সাড়ে ১১টায় বিশাল কর্মীবাহিনী নিয়ে নির্বাচনী প্রতীক পেয়ে প্রয়াত এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার নির্বাচন অফিসের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও জাতীয় পার্টির তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ রংপুরের মানুষ আমার সঙ্গে থাকবেন।

তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির সংকটকালীন আমি তৃণমূল নেতকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই-সংগ্রাম করেছি। সবাই আমাকে এরশাদের পরিবারের সদস্য হিসেবেই চেনেন। শুধু তা-ই নয়, দলের যারা ‘এরশাদ-ভক্ত’ তারাও আমাকে জাতীয় পার্টির নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে চেনেন।

দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আমার বড় আব্বা বা অভিভাবক হিসেবে নয়, আমি একজন জনদরদি মানুষ হিসেবে দেখেছি। তিনি মানুষকে বিশ্বাস করতেন।

তিনি দেশ ও মানুষের উন্নয়নের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। যাদের বিশ্বাস করে রংপুরের উন্নয়নের জন্য অতীতে এরশাদ দায়িত্ব দিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, তারা তাদের দায়িত্ব পালন না করে নিজেদের উন্নয়ন করেছেন।

আমি সে বলয় থেকে বেরিয়ে এসে এরশাদের রংপুরের উন্নয়নের যে স্বপ্ন, তা বাস্তবায়নে কাজ করব। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার জনবান্ধব সরকার, তাই আমি নির্বাচিত হলে সরকারের উন্নয়নের যে ধারা রংপুরে বিদ্যমান, তাকে আরও গতিশীল করা হবে।

প্রতীক বরাদ্দ শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা সাহাতাব উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট গ্রহণের জন্য সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। তিনি প্রার্থীদের আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে যা যা প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশন তা করবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×