অস্ত্র, মাদক ও মানি লন্ডারিং আইনে ৪ মামলা

সাত দিনের রিমান্ডে খালেদ

এজাহারে মাদক ও অস্ত্র বিক্রির অভিযোগ * অর্থপাচারের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছেন গোয়েন্দারা * দীর্ঘদিন পর মতিঝিলের ক্লাবপাড়া থমথমে

  যুগান্তর রিপোর্ট ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যুবলীগ নেতা ও ইয়াংমেন্স ক্লাবের সভাপতি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে অস্ত্র ও মাদক আইনের দুই মামলায় ৭ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে গ্রেফতারের পর গুলশান থানার দুই মামলায় ৭ দিন করে রিমান্ড চেয়ে তাকে আদালতে হাজির করে পুলিশ।

শুনানি শেষে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় ৪ দিন এবং মাদক মামলায় ৩ দিনের রিমান্ড পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে- খালেদ মাহমুদ নিজ হেফাজতে রেখে অস্ত্র ও মাদক বিক্রি করতেন।

আদালতের নির্দেশে বৃহস্পতিবার রাতেই মামলা দুটির তদন্তভার গ্রহণ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তর বিভাগ। রাতেই ডিবি আসামিকে হেফাজতে নিয়েছে।

আদালত সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ২৫ মিনিটের দিকে আসামি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এ সময় হাতে হাতকড়া ও গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো অবস্থায় তাকে এজলাসের ডকে (আসামিদের জন্য নির্ধারিত স্থান) রাখা হয়।

শুরুতেই অস্ত্র ও মাদক আইনের পৃথক দুই মামলায় আসামিকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা মহানগর হাকিম দেবদাস চন্দ্র অধিকারীর আদালতে এ শুনানি হয়।

গ্রেফতার দেখানোর শুনানিতে আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা শেখ রাকিবুর রহমান বলেন, র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে আসামি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তার কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও প্রচুর টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে উদ্ধার করা অস্ত্র, মাদক ও অর্থের উৎস সম্পর্কে জানা যায়নি। তাই আসামিকে এ দুই মামলায় গ্রেফতার দেখানো প্রয়োজন। শুনানি শেষে আদালত ওই দুই মামলায় আসামিকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

এরপর একই এজলাসে বিচারক পরিবর্তন হয়। ঢাকা মহানগর হাকিম মাহমুদা আক্তারের আদালতে অস্ত্র আইনের মামলার রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ মামলায় আসামির সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক মো. আমিনুল ইসলাম।

অপরদিকে আসামিপক্ষে মাহমুদুল হক রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, আসামি পলিটিক্যালি ভিকটিমাইজ হয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তার নামে থাকা অস্ত্রের সব কাগজপত্র ঠিক ছিল। পরবর্তী সময়ে তা আর নবায়ন করা হয়নি।

ফলে এটি অবৈধ হয়েছে। তিনি (খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া) সরকারকে লাখ লাখ টাকা ট্যাক্স দিচ্ছেন। তিনি অসুস্থ। তার রিমান্ডের কোনো প্রয়োজন নেই। সবকিছু উদ্ধার হয়েছে। বড়জোর জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে।

তিনি কোনো খুন করেননি। আর বড় ব্যবসায়ীর কাছে লাখ লাখ টাকা থাকতেই পারে। রিমান্ডে নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। শুনানি শেষে আদালত এ মামলায় আসামির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এরপর একই এজলাসে বিচারক পরিবর্তন হয়ে ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান আসেন। এ আদালতে গুলশান থানায় করা মাদক আইনের মামলার রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ মামলায়ও আসামির সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

অপরদিকে রিমান্ড বাতিলপূর্বক আসামির জামিন আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে এ মামলায় আদালত আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড শুনানিতে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী আজাদ রহমান। শুনানি শেষে যুগান্তরকে তিনি বলেন, অস্ত্র মামলায় চার দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার পর থেকে মাদক মামলায় তিন দিনের রিমান্ড শুরু হবে।

এদিকে অস্ত্র ও মাদক আইনের পৃথক দুই মামলায় প্রায় একই তথ্য উল্লেখ করে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। দুই মামলার রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।

তার দখলে ও হেফাজত থেকে ইতালির তৈরি একটি কালো রঙের ১২ বোর শটগান, শটগানের ৫৭ রাউন্ড গুলি, ফ্রান্সের তৈরি ওয়ালথার ব্র্যান্ডের ৭.৬৫ পিস্তল, তিনটি খালি ম্যাগাজিন ও পিস্তলের ৫৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধার করা হয় আসামির নিজ নামে করা পিস্তলের লাইসেন্স দুটি যা ২০১৭ সাল পর্যন্ত নবায়ন করা। আর আসামির নামীয় শটগানের লাইসেন্স দুটি যা ২০১৭ সাল পর্যন্ত নবায়ন করা।

এ ছাড়া আসামির একই রুমের দক্ষিণ পাশের দেওয়ালের স্টিলের লকার থেকে ৩টি ছোট নীল রঙের পলিব্যাগে ৫৮৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট এবং মাদক বিক্রির নগদ ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা যা বাংলাদেশি টাকার মূল্যমান আনুমানিক সাত লাখ ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা, সিঙ্গাপুরের এক হাজার কারেন্সির ১০টি নোট, ৫০ কারেন্সির একটি নোট, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৫০ কারেন্সির নোট দুটি, ১০ কারেন্সির নোট দুটি, সৌদি ৫০০ কারেন্সির নোট চারটি, ১০০ কারেন্সির নোট তিনটি, ৫ কারেন্সির নোট দুটি, ১০ কারেন্সির নোট একটি, ৫০ পয়সা একটি, এক কারেন্সির কয়েন একটি, ভারতীয় ৫০০ কারেন্সির নোট সাতটি, মালয়েশিয়ার ৫০ কারেন্সির নোট পাঁচটি, এক কারেন্সির নোট ছয়টি, ৫০ কারেন্সির নোট আটটি, থাইল্যান্ডের ১০০ কারেন্সির নোট চারটি, ৫০ কারেন্সির নোট একটি, ২০ কারেন্সির নোট দুটি, এক হাজার কারেন্সির নোট ১০টি উদ্ধার করা হয়।

আসামি দীর্ঘদিন নিজ হেফাজতে অবৈধ অস্ত্র রেখে মাদক (ইয়াব) ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজ করে আসছিলেন বলে জানা যায়। উদ্ধারকৃত অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্যের সঙ্গে জড়িত সহযোগী আসামিদের বিষয়ে তথ্য, নাম-ঠিকানা উদ্ধারসহ তাদের গ্রেফতার ও ব্যাপক পুলিশি অভিযান পরিচালনার জন্য আসামিকে রিমান্ডে পাওয়া একান্ত প্রয়োজন। অস্ত্র ও মাদকের এ দুটি মামলা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা করা হয়েছে।

মানি লন্ডারিংসহ বাকি দুই মামলায় আসামিকে এখনও গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়নি।

এদিকে খালেদ মাহমুদকে গ্রেফতারের পর মতিঝিলের ক্লাবপাড়াসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ক্যাসিনোতে তালা দিয়ে পালিয়েছে জড়িতরা। ফের অভিযানের ভয়ে অনেক ক্যাসিনো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সরিয়ে ফেলা হয়েছে জুয়া খেলার সরঞ্জাম। এসব এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

আগ্রহী জুয়াড়িরা ক্লাবপাড়ায় এসে অবস্থা দেখে দর্শক হিসেবে পথে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন পর মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় এ অবস্থা দেখা যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলে ভুক্তভোগীরা বলছেন, ক্লাবে জুয়ার সঙ্গে মাদক বিক্রি ও সেবনের কথা।

এ ছাড়া ক্যাসিনোগুলো চালুর পর তারা কীভাবে সর্বস্বান্ত হলেন সেই গল্প। চিরতরে বন্ধের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, ক্যাসিনোগুলো ফের চালু হলে তরুণ সমাজকে রক্ষা করা যাবে না। কারণ জুয়ার সঙ্গে ফিরে আসবে মাদকও। এতেই তারা শেষ হয়ে যাবে।

এদিকে বুধবার রাত এবং বৃহস্পতিবার র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে খালেদ জানিয়েছেন, তিনি ক্যাসিনো চালাতে গিয়ে কাদের চাঁদা দিয়েছেন, টাকার ভাগ কতদূর গেছে। কীভাবে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন- এসব বিষয়েও তথ্য দিয়েছেন।

কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাকে ধরে নিয়ে আসা হতো তার টর্চার সেলে- এসব তথ্যও দেন। পরে অভিযান চালিয়ে তার টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।

এর আগে বুধবার রাতে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে গুলশানের বাসা থেকে খালেদ মাহমুদকে অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। দুপুরের পর থেকে ইয়াংমেন্স ক্লাবের ক্যাসিনোতেও অভিযান চালায় র‌্যাব।

বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত তিনি র‌্যাব-৩-এর হেফাজতে ছিলেন। দুপুরের পর তাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। বিকালে তার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মাদক, অস্ত্র ও মানি লন্ডারিং আইনে আলাদা তিনটি এবং মতিঝিল থানায় মাদক আইনে একটি মামলা করে র‌্যাব।

র‌্যাবের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে খালেদ জানিয়েছেন, ক্যাসিনো ব্যবসা এবং চাঁদাবাজি করে আয় করা কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব টাকা পাচার করেছেন তিনি।

তবে কত টাকা তিনি পাচার করেছেন, এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে এরই মধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছেন গোয়েন্দারা।

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, অস্ত্র, মাদক ও মানি লন্ডারিং আইনে খালেদ মাহমুদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেছে র‌্যাব।

এর মধ্যে অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলাটি পুলিশ তদন্ত করবে। মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলাটি নিয়ম অনুযায়ী পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করবে।

মামলা দুটির তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে গুলশান থানার মামলা দুটির তদন্তভার ডিবির হাতে এসেছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার তদন্তভার আমরা নিয়েছি। আসামি এখন ডিবির হেফাজতে আছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম যুগান্তরকে বলেন, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক এবং মানি লন্ডারিং আইনে চারটি মামলা হয়েছে। তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য দিয়েছেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

র‌্যাবের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত রাজধানীতে র‌্যাবের পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিভিন্ন ক্যাসিনোতে অভিযান চালানো হয়। এতে ১৮২ জন গ্রেফতার হয়।

এর মধ্যে মতিঝিলের ইয়াংমেন্স ক্লাব থেকে ২৪ লাখ ২৯ হাজার টাকাসহ ১৪২ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গুলিস্তানে পীর ইয়ামেনী মার্কেটসংলগ্ন ক্লাব থেকে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬০০ টাকাসহ ৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ১০ লাখ ২৭ হাজার টাকা, ২০ হাজার ৫০০ জাল টাকা উদ্ধারের পর সিলগালা করে দেয়া হয় ক্যাসিনোটি।

বনানীর আহম্মেদ টাওয়ারের গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামের ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে ক্যাসিনোটি সিলগালা করে দেয়া হয়।

এদিকে বুধবার রাতে গুলশান-২ এর ৫৯ নম্বর রোডের ৫নং বাসা থেকে যুবলীগ নেতা খালেদকে গ্রেফতারের সময় ৫৮৫ পিস ইয়াবা ও তিনটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

এর মধ্যে একটি লাইসেন্সবিহীন, অপর দুটি লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ করে রাখা হয়েছিল। এছাড়া দশ লাখের বেশি টাকা এবং ৭ লাখ টাকা সমমূল্যের বিদেশি মুদ্রাও উদ্ধার করা হয়।

ক্লাবপাড়া থমথমে : বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় দেখা যায়, সেখানে আগের মতো কর্মব্যস্ততা নেই। পুরো এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সেখানে কিছু উৎসুক মানুষের ভিড়। তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন সময় ক্যাসিনোতে জুয়া খেলে নিঃস্ব হয়েছেন।

এদিকে ক্লাবগুলোয় দেখা যায়, সেখানে দায়িত্বশীল কেউ নেই। স্টাফরা কাজ করলেও তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইয়াংমেন্স ক্লাব ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সামনে র‌্যাবের কয়েকটি গাড়ি দেখা গেছে। দুটি ক্লাবেই অবস্থান করছিলেন র‌্যাবের সদস্যরা।

ইয়াংমেন্স ক্লাবে গিয়ে জানা যায়, র‌্যাব সদস্যরা ক্যাসিনো সিলগালার কাজ করছেন। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবেও র‌্যাব সদস্যরা একই কাজ করছেন। ওই এলাকার কয়েকটি ক্লাবের কার্যালয়ে তালা লাগানো ছিল।

ক্লাবপাড়ায় সরেজমিন দেখা যায়, মতিঝিল থানা থেকে ইয়াংমেন্স এবং ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ৩০০ গজের মধ্যে। অথচ বছরের পর বছর এসব ক্লাবে ক্যাসিনো ব্যবসা চলেছে। সরেজমিন এর সত্যতা মিলেছে।

দুপুরে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সামনে দাঁড়িয়ে এক তরুণ বলেন, আমাদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনোগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল। এগুলো আগে এমন ছিল না। শুরুতে কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা না হলে কেউ ক্যাসিনোতে খেলতে পারত না।

কিন্তু ধীরে ধীরে ক্যাসিনোর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সর্বনিু রেট কমানো হয়। কমতে কমতে এখন ১০০-২০০ টাকায়ও ক্যাসিনো খেলার ঘুঁটি পাওয়া যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এমন জায়গায় মাত্র ১০০-২০০ টাকায় খেলার সুযোগ থাকায় অনেকেই এদিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে নিু আয়ের মানুষও এদিকে ঝুঁকেছে। এতে ক্ষতিটা তাদেরই বেশি হয়েছে। এভাবেই ক্লাবপাড়ার হোটেলের বয়-বেয়ারা পর্যন্ত ক্যাসিনোতে ঢুকে পড়েছে।

তাদের পুঁজি কম, তাই অল্প কয়েক দিনেই সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে। হাতের ঘড়ি, স্ত্রীর কানের দুল কিংবা নাকের ফুল বেচাকেনাও হয় ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনোগুলোয়। টাকা ফুরিয়ে গেলে এসব জিনিস বিক্রি করে আবার কোমর বেঁধে নেমে পড়েন অনেকেই।

জুয়া খেলতে খেলতে ঘরবাড়ি-সংসারের কথাও ভুলে যান এরা। এখানকার ক্যাসিনোগুলোয় দেখা যায় প্রায়ই কিছু নারী ছবি নিয়ে এসে তাদের স্বামীর খোঁজ করেন। অনেকে অভিযোগ করেন, দু-তিন মাস তার স্বামী বাসায় যায় না। শুনেছেন এখানে জুয়া খেলে, এখানে খায়, এখানেই ঘুমায়।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে যা বলেছেন খালেদ : র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেটের বিষয়েও তিনি মুখ খুলেছেন।

তিনি যাদের নাম বলেছেন, তাদের মধ্যে বিদেশে অবস্থানকারী আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী এবং রাজিনীতিবিদ রয়েছেন। প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের ম্যানেজ করেই ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন।

যুবলীগের একজন প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় থেকে ক্যাসিনো ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করতেন বলেও জানান। তার দেয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই হচ্ছে।

র‌্যাব জানায়, খালেদ তাদের কাছে দাবি করেছেন, প্রতিটি ক্যাসিনোতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হতো। লাভের অংশের টাকা তিনি প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দিতেন।

কাউকে কাউকে তিনি গাড়িও উপহার দিয়েছেন। অনেককে দামি মোবাইল ফোনও উপহার দিয়েছেন। পুলিশের ডিসি থেকে ওসি পর্যন্ত মাসিক ভিত্তিতে টাকার ভাগ পৌঁছে দিতেন বলেও জানান।

পুলিশের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত তার ক্যাসিনো ব্যবসার কথা জানত। ক্যাসিনোর অর্থ তিনি বিদেশে অবস্থানকারী আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের কাছেও পৌঁছে দিতেন।

মগবাজার এলাকার একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী নাজির আরমান নাদিম ও শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের হয়ে তিনি ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের তিনি ঢাকা থেকে অর্থ পাঠাতেন।

এজাহারে যা আছে : গুলশান থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বুধবার গুলশান এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার সময় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারে, খালেদ অস্ত্র ও মাদক নিজ হেফাজতে রেখে বিক্রি করছে।

পরে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গাউছুল আজমের নেতৃত্বে ওই বাসা থেকে খালেদকে আটক করা হয়। র‌্যাবের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন, তার কাছে অস্ত্র ও মাদক রয়েছে। পরে বাসা তল্লাশি করে ৫৮৫ পিস ইয়াবা এবং তিনটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : ক্যাসিনোয় অভিযান

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত