ছাত্রলীগের পর যুবলীগকে ধরেছি : প্রধানমন্ত্রী

কোনো নালিশ শুনতে চাই না

  যুগান্তর রিপোর্ট ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছাত্রলীগের পর যুবলীগকে ধরেছি: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে কোনো নালিশ শুনতে চাই না। ছাত্রলীগের পর যুবলীগকে ধরেছি। একে একে সব ধরব। সমাজের অসঙ্গতি দূর করব। জানি এগুলো কঠিন কাজ।

কিন্তু আমি করব। এ কাজ করতে গিয়ে অনেক বাধা আসবে। এরপরও আমি করবই। এ সময় তিনি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাদামাটা জীবনযাপনের নির্দেশ দেন।

পাশাপাশি সংগঠন যাতে ইমেজ সংকটে না পড়ে, সেজন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও নিয়মিত পাঠচক্রের আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রলীগের একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গণভবনে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে উপস্থিত ছাত্রলীগের একাধিক নেতা যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। এ সময় ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের চার নেতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নীতি-আদর্শ নিয়ে চলার নির্দেশনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সততা ও আদর্শের সঙ্গে পথ চলতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথে চলতে না পারলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কারও রাজনীতি করার প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, সবার আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। আমি দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি জনগণের জন্য। জনগণের মাঝে যেন ইতিবাচক ভাবমূর্তি থাকে। তিনি বলেন, আমি কষ্ট করে সবকিছু দেশের উন্নয়নের জন্য করছি।

এর ওপর কালিমা আসুক, সেটা আমি কোনোভাবে হতে দেব না। আমি কাউকেই ছাড়ব না। যদি কেউ বাধা দেয়, কাউকে ছাড়া হবে না।

ক্যাসিনোতে যেসব বিদেশি কাজ করছে, তাদের যারা এনেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাসিনোর সঙ্গে যারা জড়িত- বিদেশি, তারা এলো কীভাবে, তারা ভিসা পেল কীভাবে, তাদের বেতন দেয়া হয় কীভাবে, ক্রেডিট কার্ডে না ক্যাশে। কে ভিসা দিয়ে আনল- সবকিছু তদন্ত করা হচ্ছে। সবই ধরা হবে।

ছাত্রলীগকে গতিশীল করতে সারা দেশে দ্রুত সাংগঠনিক সফরে নেতাদের বের হওয়ার নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নিয়মিত কর্মশালা ও পাঠচক্র করতে হবে।

ছাত্রলীগ নেতাদের সতর্ক করে তিনি বলেন, তোমাদের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে দায়িত্ব দিয়েছি। বিশ্বাস ও আস্থার মর্যাদা রাখতে হবে। ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতি ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা সো আপ’ করা, ছাত্রনেতাদের কাছ থেকে আশা করি না।

ছাত্রনেতাদের বিনয়ী হতে হবে। যত উপরে উঠবে, তত বিনয়ী হতে হবে। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল নিয়ে চলতে হবে, প্রোটোকল নিয়ে চলতে হবে, ক্ষমতার সঙ্গে চলতে হবে- এগুলো করা যাবে না। এগুলো করলে সাময়িকভাবে কিছু টাকাপয়সা হবে; কিন্তু হারিয়ে যাবে। সেটা হবে দুঃখজনক।

এসব তোমাদের কাছ থেকে আমি চাই না। তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পেলেই নিতে হবে- এ ধারণা নিয়ে রাজনীতি করলে কিছু পাওয়া যায় না। যখন যেভাবে চলার, সেই শিক্ষা নিয়ে চলতে হবে। সেই শিক্ষা বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলাম।

এ প্রসঙ্গে নিজের জীবনের ত্যাগস্বীকার করার কথা জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য কম্প্রোমাইজ করতে বলেছিল, তখন বলেছিলাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছে নেই।

নিজের জীবনে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, যত প্রতিকূল অবস্থা আমার জীবনে মোকাবেলা করতে হয়েছে, বাংলাদেশের আর কারও করতে হয়নি। আমাকে অনেক অফার দেয়া হয়েছে।

জীবনে কখনও কম্প্রোমাইজ করিনি। ছাত্রলীগকে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংগঠনকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যাতে সংগঠন আরও শক্তিশালী হয়।

তিনি বলেন, নীতি-আদর্শ, সততা, সংযম নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। যদি সেটা না কর, একটা আদর্শ নিয়ে রাজনীতি না করলে ভবিষ্যতে কার কাছে দেশ রেখে যাব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে আগামী দিনের নেতৃত্বে আসতে হবে। মানুষ তাহলে সাদরে গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, আমি চাই, একটা আদর্শ নিয়ে চল, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাও।

সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, দেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্ররা লেখাপড়া করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসে। তাদের সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

ছাত্রনেতাদের বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, বঙ্গবন্ধুর সিক্রেট ডকুমেন্ট পড়ার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এখান থেকে ভালো রাজনৈতিক শিক্ষা পাওয়া যায়।

ছাত্রলীগের ইমেজ যাতে বাড়ে, সেভাবে কাজ করতে সংগঠনের নেতাদের নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, নিজেদের ভাবমূর্তি বাড়াতে হবে, দেশের ভাবমূর্তি বাড়াতে হবে। মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়- এমন কোনো কাজে যুক্ত থাকা যাবে না।

মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের মূল্য দিতে হবে। তিনি বলেন, বিএনপির ছাত্র সংগঠন ২০০১ সালের পর ক্ষমতায় এসে যা করেছে বা এর আগে যা করেছে, সেই রকম আচরণ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের করা যাবে না।

তিনি বলেন, সত্যিকারের নীতি-আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করলে সংগঠন একটা ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। তাহলে ছাত্রলীগের ওপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অনেক বাড়বে। এটা না করে যদি ওদের (বিএনপি) মতো আচরণ করা হয়, তাহলে একই অবস্থা হবে।

ছাত্রলীগের প্রতি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস না থাকলে বিএনপি, ছাত্রদল যা করে গেছে, সেই একই ধরনের কাজ হবে। ছাত্রলীগের সোনালি অতীতের কথা তুলে ধরে তিনি সেখান থেকে শিক্ষা নেয়ার পরামর্শ দেন।

বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতাসহ নিজের ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন তিনি।

ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের ২৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।

ছাত্রলীগের অন্যদের মধ্যে ছিলেন সহসভাপতি তানজিল ভূঁইয়া তানভীর, রেজাউল করিম সুমন, সোহান খান, আরিফিন সিদ্দিক সুজন, আতিকুর রহমান খান ও কাসফিয়া ইরা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরী, আরিফুজ্জামান আল ইমরান, শামস-ই-নোমান, মো. শাকিল ভূঁইয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহম্মেদ ও বেনজীর হোসেন নিশি, সাংগঠনিক সম্পাদক সাবরিনা ইতি, মামুন বিন সাত্তার ও সাজ্জাদ হোসেন।

এছাড়া ছাত্রলীগ ঢাবি শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি মো. ইব্রাহিম হোসেন ও মো. সাইদুর রহমান হৃদয় এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি মো. মেহেদী হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মো. জুবায়ের আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও বিএম মোজাম্মেল হক উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সততা, সংযম, ধৈর্য এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার নিদর্শন ছাত্রলীগ ইতঃপূর্বে দেখিয়েছে। আগামী দিনেও সেই দীক্ষা নিয়ে তাদের চলতে হবে।

ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পুনরুদ্ধার করতে হবে। কোনো অনিয়ম, কোনো অসঙ্গতি বরদাশত করা হবে না। অন্যায় করে কেউ ছাড় পাবে না। সেই নির্দেশনাই নেত্রী দিয়েছেন।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় যুগান্তরকে বলেন, নেত্রীর আমন্ত্রণে আমরা গণভবনে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের ইতিবাচক ধারায় সংগঠন পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছেন।

মানুষের যাতে কষ্ট বা ভোগান্তি না হয়, সেজন্য প্রটোকলের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে বলেছেন। পাশাপাশি কোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে তার শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। আমরাও নেত্রীকে আশ্বাস্ত করেছি কোনো প্রটোকল নিয়ে আমরা চলব না।

ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, নেত্রী আমাদের সংগঠন পরিচালনার সার্বিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তৃণমূল সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বলেছেন। পাশাপাশি জাতির পিতার আদর্শ ছড়িয়ে দিতে বলেছেন। যাতে সংগঠনের সব পর্যায়ে আদর্শিক রাজনীতির চর্চা শুরু করা যায়।

আমরা নেত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করব। বৈঠকের বিষয়ে ছাত্রলীগের সহসভাপতি ইশাত কাসফিয়া ইরা যুগান্তরকে বলেন, নেত্রীর সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে কথা হয়েছে। তিনি দেশ নিয়ে ও আগামী প্রজন্ম নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলেছেন।

নেত্রী বলেছেন, ‘আমার বয়স এখন ৭২ বছর। এই বয়সে মানুষ চলাফেরা করতে পারে না। অথচ আমি রাতদিন দেশ ও মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করি, পরিশ্রম করি। এরপরও যদি কেউ দুর্নীতি করে, তাহলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আগামী প্রজন্মের জন্য আমি রাজনীতি সুন্দর করে যেতে চাই।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×