ফয়েজ চেয়ারম্যানের নৃশংসতা

শিবগঞ্জে যুবকের দুই হাতের কব্জি কেটে নিয়ে উল্লাস

  রাজশাহী ব্যুরো ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিবগঞ্জে যুবকের দুই হাতের কব্জি কেটে নিয়ে উল্লাস

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে তরুণ আম ব্যবসায়ী রুবেল হোসেনের দুই হাতের কব্জি কেটে নিয়েছে ‘ফয়েজ বাহিনী’।

বুধবার গভীর রাতে পদ্মা নদী তীরবর্তী বেড়িবাঁধে আওয়ামী লীগ নেতা ও উজিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দিনের গড়া ‘ফয়েজ বাহিনী’র ক্যাডাররা এ নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে।

পরে তারা দুটি বিচ্ছিন্ন কব্জি নিয়ে উল্লাস করতে করতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। সীমান্তে ‘খাটাল’ ও ফেরিঘাট থেকে চাঁদা আদায় নিয়ে রুবেলের চাচাতো ভাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সালামের বিরোধ চলছিল।

স্থানীয়রা বলছেন, ওই বিরোধের জেরেই হয়তো এ নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে ফয়েজ চেয়ারম্যান। পুলিশ কব্জি দুটি উদ্ধারে অভিযানে নেমেছে। এ ঘটনায় ফয়েজ চেয়ারম্যানসহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রুবেলকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ফয়েজ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চাঁদাবাজি, লুট, অগ্নিসংযোগ ও মাদকের অন্তত ৬টি মামলা আছে। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় কথা হয় নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের নয়ালাভাঙ্গা গ্রামের খোদা বখস আলীর ছেলে আহত রুবেলের সঙ্গে। তিনি বলেন, বুধবার রাত ১০টার দিকে বন্ধু রবিউল ও হাবুকে নিয়ে মোটরসাইকেলে উজিরপুর বেড়িবাঁধ দিয়ে যাচ্ছিলাম।

এ সময় ফয়েজ বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডার হোসেন আলী, জাহাঙ্গীর, বাবু, আলাউদ্দিন, জিয়া, ইয়াসিন, ফারুক, শাহীন, আশরাফুল, ফিরোজ, কাজল, সারিফুল, শহিদুর ও তোসিকুলসহ ১০-১২ জন আমাদের তিনজনকেই তুলে ফয়েজের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের একদফা রড ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটায়।

পরে আমাদের একটি ঘরে আটকে রাখে। রুবেল বলেন, ওরা রাত ২টার দিকে রবিউল ও হাবুকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে ফয়েজের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের পেছনে বেড়িবাঁধ এলাকার মাঠে নিয়ে যায়। ওই সময় তারা কালো কাপড় দিয়ে আমার চোখ ও দু’হাত বেঁধে ফেলে।

একপর্যায়ে সন্ত্রাসী জিয়া ও হোসেন আলী ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমার দুই হাতের কব্জি কেটে ফেলে। কাটা কব্জি নিয়ে ওরা উল্লাস করতে থাকে। একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ওরা আমাকে ফেলে কব্জি দুটি নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে।

পরে আমার চিৎকারে এলাকাবাসী ছুটে আসেন এবং আমাকে ভোর ৪টার দিকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করেন। রুবেল বলেন, আমাদের ছেড়ে দেয়ার জন্য ফয়েজ চেয়ারম্যানের কাছে অনেক কান্নাকাটি করেছি। কিন্তু তার মন গলেনি। ফয়েজ চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই।

রুবেল হোসেনের চাচাতো ভাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে উজিরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফয়েজ চেয়ারম্যানের সঙ্গে সীমান্তে গবাদিপশুর খাটাল ও পদ্মার ফেরিঘাট থেকে চাঁদা আদায় নিয়ে আমার বিরোধ চলছিল। ফয়েজ চেয়ারম্যানের ক্যাডাররা খাটাল ও পদ্মার ফেরিঘাটগুলো থেকে নির্বিচারে চাঁদাবাজি করছিল। এরই জেরে ফয়েজ বাহিনীর সন্ত্রাসীরা আমার ভাইয়ের দুই হাত কেটে নিয়েছে।

ফেরিঘাটে আমারও ব্যবসা রয়েছে। ফয়েজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও মাদক সিন্ডিকেটের বড় হোতা বলেও শিবগঞ্জ থানার ওসি নিশ্চিত করেছেন।

শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ আশপাশে তল্লাশি চালিয়েও কব্জি দুটি উদ্ধার করতে পারেনি। এই নৃশংস ঘটনার পরই এর মূলহোতা ফয়েজ চেয়ারম্যান দলবল নিয়ে গা-ঢাকা দেয়।

দীর্ঘ দিন ধরেই ফয়েজ চেয়ারম্যানের এই বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এরা জাল টাকার কারবার, ফেনসিডিল ও ইয়াবা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। এমন কোনো অপরাধ নেই যা তারা করে না।

ফয়েজ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে শিবগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় অস্ত্রবাজি, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও রাহাজানির ৬টি মামলা রয়েছে। কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে বলে শিবগঞ্জ থানার একজন কর্মকর্তা জানান।

উজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্য জানান, ২০১৭ সালের শুরুতে ইউপির ৯ জন সদস্য ফয়েজের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করার পর আমাদের গুলি করে হত্যার হুমকিও দিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। গত ২৭ মার্চ চাঁদা না পেয়ে স্থানীয় জলোবাজারে ব্যাপক বোমাবাজি ও অগ্নিসংযোগ করে এই ‘ফয়েজ বাহিনী’। শতাধিক দোকান জ্বালিয়ে দেয় তারা। পরে পুলিশ ফয়েজ চেয়ারম্যানকে গ্রেফতারও করে। পরদিনই জামিনে বেরিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে ফয়েজ ও তার বাহিনী।

মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আলামিন জুয়েল বলেন, ফয়েজের ক্যাডাররা চাঁদাবাজি ছাড়াও ইয়াবা ও অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। ওরা প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে আসছে। পুলিশে অভিযোগ দিলেও কাজ হয় না।

শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা বলেন, স্থানীয় এমপির দুই ভাই পলাশ ও মিতুর সঙ্গে ফয়েজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফয়েজ তাদের প্রশ্রয় পাচ্ছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের এমপি ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল যুগান্তরকে বলেছেন, বুধবার রাতে যখন রুবেলকে ফয়েজ বাহিনী ধরে নিয়ে যায় তখন আমি ফয়েজকে ফোন করে তাদের ছেড়ে দিতে বলি। ফয়েজ কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু সকালে জানতে পারি রুবেলের দুই হাতের কব্জি কেটে নেয়া হয়েছে। এটা খুবই মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা। দোষী যেই হোক আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

ফয়েজ চেয়ারম্যানকে প্রশ্রয় না দেয়ার দাবি করে তিনি বলেন, এর আগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পুলিশকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলাম। সেখানে পুলিশ ফয়েজকে ছেড়ে দিতে পারেনি। তবে শিবগঞ্জের সদ্য বদলি হয়ে যাওয়া ওসির সঙ্গে ফয়েজের সুসম্পর্ক এলাকাবাসীর কাছে ভীতির কারণ ছিল। শিবগঞ্জ থানার ওসির দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ পরিদর্শক আতিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যে কোনো মূল্যেই ফয়েজ ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারে আমরা বদ্ধপরিকর।

যেভাবে ফয়েজ চেয়ারম্যান আটক : চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) টিএম মোজাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরে চেয়ারম্যান ফয়েজ নওগাঁর দিকে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। চাঁ পাইনবাবগঞ্জের আমনুরায় চেকপোস্টে তাকে বহনকারী অটোরিকশা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে শিবগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ নিয়ে এ ঘটনায় ৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। অন্য তিনজন হচ্ছেন- মো. তারেক, জাহাঙ্গীর আলম ও মো. আলাউদ্দিন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×