চট্টগ্রাম বন্দরে তুলা ছাড়ে বিলম্ব ফাঁদ

আমদানিকারকদের হয়রানি, অর্থদণ্ডের শেষ নেই

দুই বছর ধরে দাবি জানাচ্ছি, সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছে না সরকার -মাহফুজুল হক শাহ

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা র-কটন বা কাঁচা তুলা ছাড়ে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো ও উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেনটাইন) বিভাগের বিলম্বের খেসারত দিতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। প্রায়ই নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে আমদানি তুলাভর্তি কনটেইনার সময়মতো ডিপোতে নিতে পারে না ডিপো কর্তৃপক্ষ। এ অজুহাতে কোয়ারেনটাইন বিভাগও তুলা বিষমুক্ত (ফেমিগেশন) করে না। দেয় না সঙ্গনিরোধ সনদ বা তুলার সঙ্গনিরোধ ছাড়পত্র। যে কারণে তুলাভর্তি কনটেইনার ডিপোতে পড়ে থাকে দিনের পর দিন। এতে করে আমদানিকারকদের বিপুল অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ গুনতে হয়। এ বিলম্ব ফাঁদের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন থেকে বিশেষ ফায়দা নিচ্ছে। ফলে সময়মতো তুলা ছাড় করতে না পারায় ব্যাহত হচ্ছে টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন। সবমিলিয়ে উদ্ভূত সমস্যার কারণে রফতানি আয়েও পড়ছে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব।

এদিকে ব্যবসায়ী নেতা ও আমদানিকারকরা বলছেন, দেশের বৃহৎ এ শিল্প খাতের উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দাবি-দাওয়া জানানো হয়েছে। সংকট নিরসনে হয়েছে বৈঠকও। কিন্তু সমস্যা সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসছে না সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই। ভাবখানা এমন যে, সব দায় যেন আমদানিকারকদের! অথচ এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী চট্টগ্রাম বন্দর, বেসরকারি কনটেইনার ডিপো ও কাস্টমসের আইনি জটিলতা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলে তুলার প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি। তুলা থেকে উৎপাদিত সুতা ও কাপড় দিয়েই তৈরি হয় পোশাক। রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। বাংলাদেশে বর্তমানে চার শতাধিক স্পিনিং মিল এবং প্রায় ৮০০ টেক্সটাইল মিল রয়েছে। সুতা ও কাপড় তৈরিতে এক বছরে ৫৫ লাখ থেকে ৬০ লাখ বেল তুলা দরকার হয়। ভারত, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, রাশিয়া, মিসর, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করা হয়। তুলা আমদানিতে বাংলাদেশ এখন এক নম্বরে রায়েছে। আগে ছিল চীন। সূত্র আরও জানায়, দেশের টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ কাঁচামাল তুলা আমদানির পর তা বন্দর থেকে ছাড় করাতে সীমাহীন হয়রানির শিকার হচ্ছেন আমদানিকারকরা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা (ওয়েস্টার্ন হেমিস্টার) সরকারি উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ বা কোয়ারেনটাইন বিভাগের মাধ্যমে বিষমুক্তকরণ এবং এ সংক্রান্ত সনদ নিয়ে ছাড়ের বিধান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা যে জাহাজে থাকবে, সেই জাহাজে যদি অন্য দেশ থেকে আমদানি করা তুলা থাকে, তবে ওইসব তুলাও বিষমুক্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

আমদানিকারকদের বিভিন্ন সূত্র জানায়, আমদানির পর জাহাজ থেকে নামিয়ে সরাসরি বেসরকারি ডিপোতে নেয়া হয় কনটেইনারভর্তি তুলা। এরপর আমদানিকারকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোয়ারেনটাইন বিভাগ এই তুলা ফেমিগেশন বা বিষমুক্ত করতে এক ধরনের ওষুধ ছিটিয়ে দেয়। ওষুধ ছিটানোর ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পর বিষমুক্ত সংক্রান্ত সঙ্গনিরোধ সনদ বা ছাড়পত্র দেয়া হয়। এরপরই অ্যাসেসমেন্ট বা শুল্কায়ন করে তুলা ছাড় করতে পারে আমদানিকারক। কিন্তু এ সনদ না পেলে দিনের পর দিন তুলা পড়ে থাকবে ডিপোতে। ফ্রি টাইম গড়িয়ে গেলে প্রতিদিন কনটেইনারপ্রতি আমদানিকারককে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের ডেমারেজ। পণ্যভর্তি কনটেইনার বন্দরে নামার পর চার দিন ক্ষেত্রবিশেষ সাত দিন পর্যন্ত ফ্রি টাইম ধরা হয়। অর্থাৎ বন্দরে কনটেইনার ল্যান্ডিংয়ের পর সাত দিন পর্যন্ত কনটেইনারের বিপরীতে ডেমারেজ দিতে হয় না। এর চেয়ে বেশি দিন থাকলে ডেমারেজ চার্জ দিতে হয়।

বন্দর সূত্র জানায়, ফ্রি টাইমের পর প্রতি কনটেইনারের বিপরীতে বিভিন্ন ধাপে দৈনিক ৬ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা ডেমারেজ গুনতে হয়। ২০ ফুট ও ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অঙ্কের ডেমারেজ গুনতে হয়। এ জটিলতার কারণে বিভিন্ন আমদানিকারকের শত শত কনটেইনার পড়ে থাকায় লাখ লাখ টাকা ডেমারেজ চার্জ গুনতে হয়।

সূত্র জানায়, অনেক সময় দেখা যায়, আমদানিকারক এক কনসাইনমেন্ট তুলা আমদানি করেছেন। কিন্তু বন্দর বা ডিপো কর্তৃপক্ষ পুরো কনসাইনমেন্টের সব কনটেইনার একই সময়ে ডিপোতে নিতে পারে না। কোনো সময় সফটওয়্যারে পোস্টিং না দেয়ার কারণে কনটেইনার খুঁজে পেতে বিলম্ব হয় বন্দর কর্তৃপক্ষের। আবার কোনো ক্ষেত্রে বন্দর বা অফডকের (বেসরকারি কনটেইনার ডিপো) ইকুইপমেন্ট সংকটের কারণে একই চালানের সব কনটেইনার একই সময়ে ডিপোতে নেয়া সম্ভব হয় না। কনসাইনমেন্টের বাকি কনটেইনার খুঁজে পেতে বা ডিপোতে নিতে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় গড়িয়ে যায়। এছাড়া একটি চক্র আছে, যারা বিশেষ উদ্দেশ্যে ইচ্ছে করে সঙ্গনিরোধ পরীক্ষার সময় ২-১টি কনটেইনার রেখে দেয়। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়। চালানের সব পণ্য একসঙ্গে না পাওয়ায় সঙ্গনিরোধ বিভাগও তুলা বিষমুক্ত করে না। এভাবেই আমদানি করা তুলার কনটেইনার পড়ে থাকায় ডিপোগুলো আমদানিকারকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা ডেমারেজ চার্জ আদায় করে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কোয়ারেনটাইন বিভাগ চট্টগ্রামের উপপরিচালক জহিরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, কাস্টমস অ্যাক্টেই বলা আছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা (ওয়েস্টার্ন হেমিস্টার ক্যাটাগরির) তুলা বিষমুক্ত করতে হবে। এ ধরনের তুলা যে জাহাজে করে আসবে, সেই জাহাজে অন্য তুলা থাকলে তা-ও বিষমুক্ত করতে হবে। তবে কোনো চালান ভেঙে ভেঙে বিষমুক্ত করা যাবে না। এভাবে ছাড়পত্রও দেয়া যাবে না। একসঙ্গে পুরো চালান বিষমুক্ত করে তবেই ছাড়পত্র দিতে হবে। কেবল তুলার ক্ষেত্রে নয়; আমদানিকৃত কৃষিজাত অন্য পণ্যের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। এ বিধান প্রতিপালন করছেন তারা। এটি করতে গিয়ে আমদানিকারকদের যে বছরের পর বছর ভুগতে হচ্ছে, সময়মতো কনটেইনার ছাড় করতে না পেরে ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে, সেটি সত্য। কিন্তু আমাদের করার কিছু নেই। এ সমস্যা সমাধানে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।’

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক এবং পোর্ট ও শিপিং স্ট্যান্ডিং কমিটির বর্তমান আহ্বায়ক মাহফুজুল হক শাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘কেবল তুলা আমদানির ক্ষেত্রেই যে আমদানিকারকরা এ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বা ডেমারেজ গুনছেন, তা নয়; অন্যান্য আমদানি পণ্যের চালানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ একই চালানের সব পণ্যের অ্যাসেসমেন্ট একসঙ্গে করতে হবে বলে কাস্টমস অ্যাক্টে বলা আছে। অথচ কখনও অফডকের সীমাবদ্ধতার কারণে আবার কখনও চট্টগ্রাম বন্দরের সীমাবদ্ধতার কারণে সময়মতো কনটেইনার পাওয়া যায় না। যে কারণে অ্যাসেসমেন্ট বিলম্ব হয়। বিলম্ব হয় পণ্যের ডেলিভারি। যার খেসারত দিতে হয় আমদানিকারকদের। অথচ এক্ষেত্রে আমদানিকারকের কোনো দোষ নেই। এ বিলম্বের দায় বন্দর, অফডক ও কাস্টমসকেই নিতে হবে। বছরের পর বছর এভাবে চলতে পারে না।’

মাহফুজুল হক শাহ আরও বলেন, ‘দেশীয় ও রফতানি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল তুলা। তুলা আমদানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম ও রফতানি পোশাক শিল্পে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। রফতানি আয়ের ৮২ ভাগ আসে এ খাত থেকে। পোশাক শিল্পের কাঁচামাল তুলা ছাড়ের ক্ষেত্রে এমন হয়রানি ও জটিলতা কেবল একজন আমদানিকারককেই হুমকির মুখে ফেলছে না, জাতীয় অর্থনীতির প্রবাহকেও বাধাগ্রস্ত করছে। আমরা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করছি।’ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সৃষ্ট এ সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও অফডকে কনটেইনার জটও এর অন্যতম প্রধান কারণ।’

বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোট অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার সময়মতো ডিপোতে পৌঁছাতে না পারার জন্য দায়ী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ইকুইপমেন্ট সংকট কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক সময় আমদানি পণ্যভর্তি একই চালানের সব কনটেইনার খুঁজে পাওয়া যায় না। আইসিডিতেও পৌঁছে না। এ কারণে অ্যাসেসমেন্ট বিলম্ব হয়। ডিপোগুলো পণ্যছাড় করতে পারে না। এরপরও বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে ৫ থেকে সর্বোচ্চ দশ দিন ফ্রি টাইম দেয়া হয়। ডেমারেজ চার্জ নেয়া হয় না। এরপরও যদি কনটেইনার পড়ে থাকে, তবে ডেমারেজ চার্জ নিতেই হবে। না হয় অফডকগুলোকে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter