জৈন্তাপুরে মাহফিলে সংঘর্ষ, নিহত ১ : ৪৫ বাড়িতে আগুন

আহত অর্ধশত, চাপা উত্তেজনা, তদন্ত কমিটি

  সিলেট ব্যুরো ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটের জৈন্তাপুরে ওয়াজ মাহফিলে দুই বক্তার বিতর্ককে কেন্দ্র করে সুন্নি ও ওহাবি মতাদর্শীদের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এ সময় মাহফিল মঞ্চ ও ৪৫টি বাড়িঘরে ভাংচুর চালিয়ে তাতে আগুন দেয়া হয়েছে। সোমবার মধ্যরাতের এ ঘটনা নিয়ে মঙ্গলবারও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল সেখানে। মোতায়েন ছিল অতিরিক্ত পুলিশ। ঘটনা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন দুটি তদন্ত কমিটি করেছে। জৈন্তাপুরের ঘটনায় সোমবার গভীর রাতে এবং মঙ্গলবার সিলেট নগরীতে মিছিল সমাবেশ করেছে অনুসারীরা।

নিহতের নাম মোজাম্মেল হোসেন (২৫)। তিনি হরিপুর কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের ছাত্র। আহতদের সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

স্থানীয়রা জানান, জৈন্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এখলাছুর রহমানের নেতৃত্বে সুন্নি মতাদর্শের লোকজন আমবাড়ি এলাকায় সোমবার রাতে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করে। এতে ওহাবি মতাদর্শের লোকদেরও নিমন্ত্রণ জানানো হয়। মঞ্চে বক্তা হিসেবেও রাখা হয় ওহাবি মতাদর্শী মাওলানা হরিপুর মাদ্রাসার মুহাদ্দিস আবদুস সালামকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কুমিল্লা থেকে আসা সুন্নি মতাদর্শী বক্তা মাওলানা গাজী সুলেমান হোসেন বক্তব্য দিলে একটি বিষয় নিয়ে ১১টার দিকে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। মাওলানা আবদুস সালাম ওই বক্তব্যকে ভুল দাবি করে কোরআন-হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য মাওলানা সুলেমানকে অনুরোধ জানান। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে তর্ক বাধে। সুন্নি সমর্থকরা মাওলানা আবদুস সালামের ওপর হামলা চালাতে গেলে দুই সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান মোজাম্মেল। তখন সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করে, ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। মঞ্চে আগুন দেয়া হয়। আমবাড়ি, ঝিঙ্গাবাড়ি ও কাঁঠালবাড়ি গ্রামে ৪৫টি বাড়িতে ভাংচুর করে অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাত ২টার দিকে স্থানীয় মুসল্লিরা সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ করে। আড়াইটার দিকে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।

হরিপুর কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হিলাল আহমদ যুগান্তরকে বলেন, এলাকায় সুন্নি ও ওহাবিদের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ছিল। দুই মাওলানার মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হলে সুন্নি সমর্থকরা মাওলানা আবদুস সালামকে লক্ষ্য করে মঞ্চের নিচ থেকে চেয়ার ছুড়ে মারে। মাদ্রাসা ছাত্ররা হুজুরকে বাঁচাতে গেলে তাদেরও ব্যাপক মারধর করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থলেই এক ছাত্র শহীদ হন। তাদের হামলায় আমার ছাত্র-শিক্ষকসহ ১৬ জন আহত হয়েছেন। মাওলানা হিলাল আরও বলেন, সুন্নিরাই মঞ্চে ও এলাকার ৪০-৫০টি ঘরবাড়িতে হামলা করে আগুন দেয়।

জৈন্তাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এখলাছুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় এ নিয়ে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, অহেতুক আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, একপক্ষ ওয়াজ মাহফিলে বাইরে থেকে হুজুর আনে। এতে আরেকপক্ষ ওয়াজে এসে বাধা দেয়। এতে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি তখন ঘটনাস্থলেও ছিলাম না। উত্তেজনার খবর পেয়ে সংঘর্ষের আগেই পুলিশকে খবর দিয়েছিলাম। তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে এসে ৫০টিরও বেশি বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়। এতে এলাকাবাসীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার ও পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ পরিবারে ৩ হাজার টাকা করে এবং খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের আপাতত চাল-ডাল-তেল মরিচসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দেয়া হয়েছে। প্রতিটি পরিবারের মধ্যে দুটি করে কম্বল দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

জৈন্তাপুর থানার ওসি খান মো. মঈনুল জাকির জানান, পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদিও আতঙ্কে থমথমে এলাকাটি। ঘটনাস্থল ও আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তিনি জানান, ওয়াজ মাহফিলের জন্য পুলিশের কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। এমন কী পুলিশকে জানানোও হয়নি।

ঘটনা তদন্তে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন দুটি তদন্ত কমিটি করেছে। মঙ্গলবার সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শহিদুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। এর দুই সদস্য হলেন- অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিসেন্ট্রট (এডিএম) সন্দীপ কুমার সিংহ ও জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌরিন করিম। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। মঙ্গলবার সকালেই আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি।

সিলেটে বিক্ষোভ : খবর পেয়ে সোমবার রাত আড়াইটায় সিলেট নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করে বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা। বিক্ষোভ হয় মঙ্গলবারও।

আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা ছাত্রদের নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার দাবিতে মঙ্গলবার সিলেট নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করে জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজিরবাজার মাদ্রসারা ছাত্র-শিক্ষকরা। প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমানের আহ্বানে মিছিলটি নগরী ঘুরে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। জামিয়া মাদানিয়া কাজিরবাজার মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা শাহ মমশাদ আহমদের সভাপতিত্বে এবং ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা সামিউর রহমান মুসার পরিচালনায় এতে বক্তব্য দেন মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিরাজী, মাওলানা এমরান আলম, মাওলানা মুশফিকুর রহমান মামুন, মাওলানা মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।

বাংলাদেশ জমিয়তুল ওলামা সিলেট মহানগর শাখার এক জরুরি পরামর্শসভা মঙ্গলবার নগরীর উপশহর জামিআ লুগাতুল আরাবিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়। শাখা আহ্বায়ক শাইখ আবদুর রউফের সভাপতিত্বে সভায় ছিলেন সংগঠনের জেলা আহ্বায়ক মাওলানা আবদুস সালাম, জেলার সদস্য সচিব তাহুরুল হক, মহানগর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা রিয়াদ আহমদ, মাওলানা ফয়ছল আহমদ, মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ, মাওলানা ফয়জুল হাসান, মহানগর সদস্য সচিব মাওলানা আরিফ রব্বানী প্রমুখ। সভায় মোজাম্মেলের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

জামেয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসাতুল উলুম দারুল হাদিস হরিপুর বাজার মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হজরত শাহজালাল (রহ.) মাদ্রাসায় সংবাদ সম্মেলন করে। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাদ্রাসার শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম। এ মাদ্রাসার ১৩ ছাত্র আহত হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ওয়াজ মাহফিলের প্রধান আয়োজক আবুল বাশার মোল্লা। কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যার প্রতিবাদ জানালে আয়োজকরাই ওই হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করেছে। সম্মেলনে আরও ছিলেন মাওলানা মুহিবুল হক গাছবাড়ি, শীফকুল হক আমকুনি, চতুল ইউপির চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হোসেন চতুলী।

মঙ্গলবার বাদ আসর ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ সিলেট মহানগর শাখা নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে সোবহানীঘাট পয়েন্টে সমাবেশ করে। সিলেট মহানগর ছাত্র জমিয়তের আহ্বায়ক হাফিজ শাব্বির রাজির সভাপতিত্বে ও যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মামুনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন মাওলানা আবদুল মালিক মুবারকপুরী, মাওলানা আবদুল মালিক চৌধুরী, মাওলানা আহমদ কবির, মাওলানা আবদুল মুছব্বির প্রমুখ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×