ভাই যখন নেই ঢাকায় থাকার মানে হয় না : আবরারের ছোট ভাই

ঢাকা কলেজ থেকে নিলেন টিসি, কুষ্টিয়ায় আবেদন

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট ও কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

নিহত আবরার ফাহাদ ও তার ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ ঢাকায় আর পড়বেন না। মঙ্গলবার ঢাকা কলেজ থেকে ফাইয়াজ ছাড়পত্র (টিসি) নিয়েছেন এবং ভর্তির জন্য কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে আবেদন করেছেন।

ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ শ্রেণিতে তিনি পড়তেন। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হতে ঢাকা বোর্ডও তাকে অনুমতি দিয়েছে। এর আগে ঢাকায় আর পড়াশোনা করবেন না বলে ফাইয়াজ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন।

নিরাপত্তার শঙ্কায় আবরারের একমাত্র ভাই ফাইয়াজ ঢাকা ছাড়ছেন। ঢাকা ছাড়ার প্রতিক্রিয়ায় ফাইয়াজ বলেছেন, ভাই-ই যখন ঢাকায় নেই, তখন ঢাকায় আমার থাকার কোনো মানে হয় না।

ফায়াজের বাবা বরকত উল্লাহ জানান, মঙ্গলবার দুপুরে ফাইয়াজ ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেয়। এ সময় তার সঙ্গে তার চাচা মনিরুল ইসলাম ও রবিউল ইসলাম, মামা মোফাজ্জেল হোসেন এবং ফুপাতো ভাই নূর আলম ছিলেন। রোববার কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হতে আবেদন করেন ফাইয়াজ। মঙ্গলবার বিশেষ ব্যবস্থায় ঢাকা কলেজ থেকে ছাড়পত্র পেতে আবেদন করলে তার ছাড়পত্র মঞ্জুর করা হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর নেহাল আহমেদ বলেন, ফাইয়াজের ঢাকা কলেজ ছাড়ার সিদ্ধান্ত একান্তই তাদের পারিবারিক ব্যাপার। আমি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিলাম। এরপরও তাদের ও প্রশাসনের ইচ্ছায় তার কলেজ বদলির ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে।

ঢাকা কলেজের উপাধ্যক্ষ এটিএম মাইনুল হোসেন জানান, এক বোর্ড থেকে আরেক বোর্ডে ছাড়পত্র নেয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রথমে তার কলেজে ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিলে সেটা বোর্ডে যায়। বোর্ড অনুমোদন দিলে কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র দেয়। ফাইয়াজের আবেদন বোর্ডে যায়। বোর্ড এরই মধ্যে অনুমোদন দিয়েছে। আমরাও ছাড়পত্র ইস্যু করেছি।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ কাজী মনজুর কাদির জানান, ফাইয়াজ রোববার এখানে ভর্তির আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে তাকে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা কলেজ থেকে ছাড়পত্রের কপি পেলেই তার ভর্তির প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হবে।

কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন- প্রশ্নের জবাবে ফাইয়াজ বলেন, ভাইকে হারিয়ে আমি একা হয়ে পড়েছি। ভাই (আবরার) আমাকে ঢাকা কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন।

ঢাকায় তিনি আমার অভিভাবক ছিলেন। সেই ভাই এখন নেই। তাই ঢাকায় থাকার আর কোনো মানে হয় না। তিনি বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক এমন ছিল যে মা-বাবার কথা তেমন মনেই হতো না। আর সেই ভাই এখন নেই। কার জন্য ঢাকায় পড়ে থাকব। বড় ভাইকে হারিয়ে মা-বাবা এমনিতেই দিশেহারা। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঢাকা আর থাকব না, কুষ্টিয়াতে পড়াশোনা করব।

আবরার হত্যাকাণ্ডের দিন ফাইয়াজ কুষ্টিয়াতে ছিলেন। এ ব্যাপারে ফাইয়াজ বলেন, ভাই ঢাকায় যাওয়ার সময় মা আমাকে ডেকেছিল। কিন্তু আমি শুয়েছিলাম।

আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে ভাই বলল, তাড়াতাড়ি ঢাকায় চলে আসবি। আমি ঘুমের ঘোরেই হ্যাঁসূচক জবাব দিয়েছিলাম। ভাইয়ের সঙ্গে এটিই ছিল আমার শেষ কথা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাইয়াজ বলেন, এখন ভাই নেই, ঢাকায় আমি কার কাছে যাব?

ফাইয়াজের বাবা রবকত উল্লাহ জানান, দুই ছেলের একজন আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তার শঙ্কা মাথায় নিয়ে জীবনযাপন আরও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। এসব বিষয় ভেবে ওদের মা ও স্বজনদের ইচ্ছায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে হল। ফাইয়াজ ছোট, তাকে দেখেশুনে আগলে রাখার জন্য বড় ভাই ছিল।

সেখানে সেই ভাই যখন চরম নৃংশসতার শিকার হল, তখন সেখানে আর কার ভরসায় ফাইয়াজকে রাখব? আমি বিশ্বাস করি, ফাইয়াজ কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকেও ভালো রেজাল্ট করবে। একই সঙ্গে মাকেও সঙ্গ দিতে পারবে। ওর মা কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকবে।