পুলিশের ভুলে কারাভোগ

নাটোরের বাবলু শেখ আরেক ‘জাহালম’

  যুগান্তর রিপোর্ট, নাটোর ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাটোরের বাবলু শেখ আরেক ‘জাহালম’

অন্যের সাজা ভোগ করা নাটোরের বাবলু শেখের কাহিনী আরেক ‘জাহালম’! পুলিশের ভুল প্রতিবেদন এবং আইনজীবীর গাফিলতির কারণে মাসের পর মাস বাবলু শেখ হাজত খেটেছেন।

মুক্তির আশায় ১৭ বছর তিনি আদালতে ঘুরেছেন। সিংড়া উপজেলায় এক মারামারির ঘটনায় শ্রী বাবু নামে এক আসামির পরিবর্তে ভুল করে বাবলু শেখকে (৫৫) পুলিশ গ্রেফতার করলে তার দুর্ভোগের শুরু। তবে বৃহস্পতিবার বাবলু শেখকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

রায়ের পর্যবেক্ষণে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সিদ্দিক বলেন, বাবলু শেখ বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ ও ‘জাহালম’-এর প্রতিচ্ছবি। বংশ পরম্পরায় বাবলু শেখ একজন মুসলমান হলেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা তাকে শ্রী বাবু হিসেবে গ্রেফতার করে দায়িত্বে চরম অবহেলা করেছেন। গ্রেফতারের পর থানায় নিয়ে সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসামিকে পরীক্ষা না করে চালান বইয়ে স্বাক্ষর করে অন্যায় করেছেন।

বিচারক বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বাবলু শেখ ইচ্ছা করলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য এ রায়ের কপি নিয়ে উচ্চ আদালতেও যেতে পারেন। দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দেন। এ সময় আদালতে ভুক্তভোগী বাবলু শেখ, তার স্ত্রী-সন্তানরা ছাড়াও উৎসুক এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সিদ্দিক আরও বলেন, অভিযোগপত্র দেয়ার সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোমিনুল ইসলাম ও এসআই হেলেনা পারভিন ভুল আসামি গ্রেফতারের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেননি।

পরবর্তী সময়ে বিষয়টি জানলেও নিযুক্ত আইনজীবীরা আদালতে প্রতিকার চেয়ে তথ্য-প্রমাণসহ দরখাস্ত করেননি। তারা ভুল নামেই বাবলু শেখের জামিন করিয়েছেন। শুনানির সময় আইনজীবীদের পক্ষ থেকে তথ্য-প্রমাণ দাখিল করার কথা বলা হলেও কাগজপত্র নথিতে পাওয়া যায়নি।

আসামিকে পরীক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে বিচারিক আদালতের রায় দেয়ার সমালোচনাও করেন বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সিদ্দিক। পর্যালোচনা শেষে আদালত এ মামলা থেকে বাবলু শেখকে অব্যাহতি দেন।

একই সঙ্গে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা, থানার ওসি ও গ্রেফতারে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রায়ের কপি নাটোরের পুলিশ সুপার (এসপি), ডিআইজি রাজশাহী রেঞ্জ ও আইজিপি বরাবর পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।

এ ঘটনায় বিচারক আইনজীবী ও আদালতকে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন। বিচারিক আদালতের দেয়া রায় বহাল রেখে মূল আসামি শ্রী বাবুর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করার নির্দেশ দেন আদালত। মামলার গাফিলতির জন্য তৎকালীন আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা আইনজীবী সমিতি ও বার কাউন্সিলকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর বাবলু শেখ সাংবাদিকদের বলেন, তিনি একজন দিনমজুর। অথচ তাকে ভুলের খেসারত ১৭ বছর টানতে হয়েছে। কয়েক মাস এ মামলায় সাজাও খেটেছেন তিনি। এ ধরনের ঘটনা যেন আর কারও জীবনে না ঘটে সে প্রত্যাশা করেন তিনি। বাবলু শেখের জীবনের এতগুলো বছর ফিরিয়ে দিতে না পারলেও তার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন। নাটোরের এসপি লিটন কুমার সাহা বলেন, রায়ের কপি তিনি হাতে পাননি। রায়ের কপি হাতে পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

বাবলু শেখের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম উদ্দীন জানান, ২২ সেপ্টেম্বর বাবলু শেখের মামলার রায়ের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু সেদিন নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাইফুর রহমান সিদ্দিকী মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানান, বাবলু শেখের বিষয়টি আলোচিত ঘটনা হওয়ায় তা অধিক পর্যালোচনা করা হবে। ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যবেক্ষণসহ রায়ের দিন ধার্য করেন তিনি।

কিন্তু ওই তারিখে নাটোর জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য মোজাম্মেল হকের মৃত্যুতে আদালতের সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। বাবলু শেখের মামলার রায়ের দিনক্ষণ পিছিয়ে যায়। এরপর আদালত ১৭ অক্টোবর রায়ের দিন ধার্য করেন।

জানা গেছে, ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল সদর উপজেলার গাঙ্গইল গ্রামের কাজী আবদুল মালেকের সঙ্গে শ্রী বাবুসহ ছয়জনের মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বাদী হয়ে মালেক ছয়জনের বিরুদ্ধে নাটোর থানায় মামলা করেন।

এ মামলায় ৩ নম্বর আসামি ছিলেন শ্রী বাবু। তৎকালীন সদর থানার উপ-পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম এবং হেলেনা পারভীন শ্রী বাবুকে অভিযুক্ত করে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ২০০২ সালের ৭ নভেম্বর শ্রী বাবুর পরিবর্তে সিংড়া উপজেলার আঁচলকোট গ্রামের বাবলু শেখকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। ভুলের বিষয়টি আদালতকে অবহিত না করে ছয় দিন পর ১৩ নভেম্বর আসামির আইনজীবী শ্রী বাবু পরিচয়ে বাবলু শেখের জামিন করান। পরে ওই পরিচয়েই বাবলু শেখের বিরুদ্ধে আদালত অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।

যুক্তিতর্ক শেষে ২০১৬ সালের ২৩ জুন মুখ্য বিচারিক হাকিম মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী আসামি বাবুকে দু’বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

ওই দিন কাঠগড়া থেকে বাবলু শেখকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ওই রায়ের বিরুদ্ধে বাবলু শেখ আপিল করেন। আদালত তাকে শুনানি না হওয়া পর্যন্ত জামিন দেন। মামলাটি শুনানির জন্য অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এলে আদালত শুনানি শেষে রায় দেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×