১১ দফা দাবিতে ক্রিকেটারদের ধর্মঘট

হুমকির মুখে ভারত সফর * সমস্যা সমাধানে যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নেবে বিসিবি

  স্পোর্টস রিপোর্টার ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্রিকেটারদের ধর্মঘট
ক্রিকেটারদের ধর্মঘট। ছবি: যুগান্তর

বিভিন্ন সময়ে নিজেদের নানা নায্য দাবি-দাওয়ার কথা বোর্ডকে জানিয়েছেন ক্রিকেটাররা। কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি বিসিবি। ফলে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমা হয়েছিল। সোমবার বেলা ৩টায় সংবাদ সম্মেলন ডেকে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটালেন সাকিব আল হাসানরা।

ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাড়ানো, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা, খেলার মান বাড়ানো, ক্রিকেটারদের প্রতি বিসিবির দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোসহ ১১ দফা দাবিতে ধর্মঘট ডাকলেন দেশের ক্রিকেটাররা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের ক্রিকেটে অংশগ্রহণ করবেন না তারা।

সোমবার মিরপুর একাডেমি মাঠে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন সাকিব-তামিমরা। এ সময় প্রায় ৬০ জন ক্রিকেটার উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ১০ জন ১১ দফা দাবি পাঠ করেন।

তবে ক্রিকেটারদের এই ধর্মঘটের মধ্যে পড়ছে না বয়সভিত্তিক দল ও নারী দলের কার্যক্রম। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজা।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। আচমকা ধর্মঘটে হুমকির মুখে পড়ে গেল আগামী মাসে জাতীয় দলের ভারত সফর।

এদিকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সদ্য নির্বাচিত সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী বলেছেন, সিরিজ বিঘ্নিত হবে না। এ ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা আন্দোলনমুখী হওয়ায় সিরিজ হুমকির মুখে পড়ল কি না- এই প্রশ্নের উত্তরে কাল কলকাতায় সৌরভ বলেন, ‘এটা ওদের (বাংলাদেশের) অভ্যন্তরীণ বিষয়। ওরা ঝামেলা মিটিয়ে ঠিকই ভারত সফরে আসবে।’

ভারতীয় বোর্ড প্রধান হিসেবে আপনি কি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে কথা বলেছেন? সৌরভের উত্তর, ‘এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বিসিবির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি আমার এখতিয়ারে নেই।’

আগামী মাসে ভারত সফরে তিনটি টি ২০ এবং দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলার কথা বাংলাদেশ দলের। ৩ নভেম্বর দিল্লিতে প্রথম টি ২০।

ক্রিকেটাররা ধর্মঘট ডাকার পর বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নেবে বিসিবি। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেটারদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি। অবশ্যই খেলোয়াড়রা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা বোর্ডের অংশ। তাদের দাবিগুলো লিখিতভাবে পেলে বোর্ডে আলোচনা করব। পরবর্তী সময়ে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘খেলোয়াড়দের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া বিভিন্ন সময়ে এসেছে এবং আমাদের চেষ্টা থাকে যতটুকু সম্ভব তা সুরাহা করার। আজকের (সোমবার) বিষয়টা আমাদের নজরে এসেছে। অবশ্যই আমরা বিষয়টি বোর্ডে আলোচনা করব।’

ক্রিকেটাররা অবশ্য কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তারা বোর্ড পরিচালকদের ফোনই ধরছেন না। সন্ধ্যার পর বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান আকরাম খান ক্রিকেটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তার ফোন কেউ ধরেননি।

ক্রিকেটাররা এভাবে ধর্মঘট ডাকতে পারেন, আগেরদিনই এর আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। কাল ক্রিকেটাররা এক সাংবাদিককে ফোন করে বলেন সবাইকে একাডেমি মাঠে হাজির হতে। খবর পেয়ে বিসিবির পরিচালকরা সাকিবদের সঙ্গে যোগাযোগ করে থামানোর চেষ্টা করেন।

কিন্তু কারও কথা শোনেননি ক্রিকেটাররা। প্রথমে তারা বিসিবির মূল গেট দিয়ে না এসে ইনডোরে একত্র হন। সেখানেই করণীয় বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করে নেন ক্রিকেটাররা। ক্রিকেটারদের মুখপাত্র হিসেবে ছিলেন টেস্ট ও টি ২০ অধিনায়ক সাকিব।

তার হাতে থাকা একটি কাগজে দাবিগুলো লেখা ছিল। সেগুলোই সবাই পাঠ করেন। প্রথম দাবি নিয়ে সিনিয়র ক্রিকেটার নাঈম ইসলাম বলেন, ‘প্রথমত বলতে চাই সম্মানের ব্যাপার। ক্রিকেটার হিসেবে যে সম্মান আমাদের প্রাপ্য, আমরা তা পাই না। আর আমাদের যে প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন আছে, কোয়াব, তারা ক্রিকেটারদের পক্ষে কথা বলবে, সেটির কোনো কিছু আমরা তাদের কার্যক্রমে পাইনি। আমাদের দাবি, কোয়াবের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, যারাই আছেন, তাদের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। যেহেতু এটা প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন, আমরা ক্রিকেটাররাই নির্বাচনের মাধ্যমে পছন্দ করব, কারা এখানে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হবেন।’

দ্বিতীয় দাবি নিয়ে মাহমুদউল্লাহ বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ যেভাবে হচ্ছে তাতে সব ক্রিকেটারই অসন্তুষ্ট। পারিশ্রমিকের একটি মানদণ্ড বেঁধে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্রিকেটারদের অনেক সীমাবদ্ধতা দেয়া হচ্ছে। আমরা প্রিমিয়ার লিগে আগের মতো করে ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি করতে চাই।’

এরপর তৃতীয় দাবি নিয়ে হাজির হন মুশফিকুর রহিম। তিনি বলেন, ‘আমাদের তৃতীয় দাবি বিপিএল সংক্রান্ত। এবার বিপিএল অন্যভাবে হচ্ছে, যেটিকে আমরা সম্মান করি। আগের যে নিয়মে বিপিএল হচ্ছিল, সেটি যেন পরের বছর থেকে চলে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে স্থানীয় ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিকের সামঞ্জস্য যেন থাকে।’

চতুর্থ ও পঞ্চম দাবি নিয়ে সাকিব বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আমাদের ম্যাচ ফি অন্তত এক লাখ টাকা হওয়া উচিত। আমরা এই দাবি অবশ্যই জানাচ্ছি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের বেতন অনেক কম। সেটি অন্তত ৫০ শতাংশ বাড়াতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটারদের অনুশীলন সুবিধা বাড়াতে হবে। জিম-মাঠ সবকিছু বাড়াতে হবে। ১২ মাসের জন্য কোচ-ফিজিও-ট্রেনার নিয়োগ দিতে হবে এবং তারাই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের একটি পদ্ধতির মধ্যে নিয়ে আসবে। এছাড়া আমাদের ক্রিকেটের উন্নতির জন্য সংস্কৃতি বদলানো জরুরি। যেমন বল। যেটা আমাদের অনেক বড় সমস্যা। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আমরা মানসম্মত বল পাই না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আসার পর অন্য বলে আবার মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। দৈনিক ভাতা মাত্র ১৫০০ টাকা। যে ফিটনেস দাবি করছে, তাতে অনেক স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। ভালো হোটেলে থাকতে হবে। যেখানে খাবার ও যে কোনো জিনিসের দাম বেশি, সেটা বিবেচনা করে যে পরিমাণ ভাতা ঠিক করলে ভালো হয়, সেটি যেন করা হয়। ভ্রমণভাতা শুধু ২৫০০ টাকা। আমাদের বিমানে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। টিম হোটেলে জিম ও সুইমিংপুল অবশ্যই দরকার। আরেকটি হল টিম বাস। মাঠে যে ধরনের বাসে আমরা যাওয়া-আসা করি, তা খুবই হতাশাজনক। অন্তত এসি বাস বা যে বাসে ক্রিকেটাররা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে এমন বাস দিতে হবে।’

ষষ্ঠ দাবি নিয়ে এনামুল হক জুনিয়র বলেন, ‘জাতীয় দলের চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার অন্তত ৩০ জন করা উচিত। করতে হবে এবং বেতন বাড়াতে হবে।’

অষ্টম দাবি নিয়ে এনামুল হক বিজয় বলেন, ‘আমরা দুটি চারদিনের ম্যাচের টুর্নামেন্ট খেলি- জাতীয় লিগ ও বিসিএল। কিন্তু একদিনের ম্যাচের টুর্নামেন্ট শুধু একটি। শুধু ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। আরেকটি টুর্নামেন্ট বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি বিপিএলের আগে আরেকটি টি ২০ টুর্নামেন্ট হওয়া উচিত।’

এরপর নবম দাবি নিয়ে নুরুল হাসান সোহান বলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার থাকতে হবে।’

শেষ দুটি দাবি পেশ করেন জুনায়েদ সিদ্দিকী ও ফরহাদ রেজা। জুনায়েদ বলেন, ‘বিপিএল ও প্রিমিয়ার লিগের পাওনা টাকা যেন আমরা সময়মতো পাই, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

ফরহাদ রেজা বলেন, ‘জাতীয় দলের বাইরে থাকা ক্রিকেটাররা দুটির বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ পেলে দিতে হবে।’

খেলোয়াড়রা যেভাবে একত্র হয়ে ধর্মঘট ডেকেছেন, সেভাবে একত্র হয়ে কেন বিসিবির কাছে যাননি? সংবাদ সম্মেলন শেষে এমন প্রশ্নের জবাবে তামিম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো আগে বিভিন্ন সময়ে আমাদের দাবি জানিয়েছি।

সেগুলো কি পাস হয়েছে? তাহলে কোন ভরসায় আমরা আবার দাবি জানাতে যাব?’ জাতীয় ক্রিকেট লিগে প্রথম স্তরের একজন খেলোয়াড় ৩৫ হাজার ও দ্বিতীয় স্তরের ক্রিকেটাররা ২৫ হাজার টাকা ম্যাচ ফি পান।

ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি বাড়ানো নিয়ে বৃহস্পতিবার বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, ‘তারা যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা পায়। বাড়াতে থাকলে তো চাহিদা কমবে না। আরও বাড়ানোর কথা উঠবে।’

বিসিবি এখন ভাবছে, ক্রিকেটাররা এত সাহস কীভাবে পেলেন? বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেত পেয়েই ক্রিকেটাররা এভাবে ধর্মঘটের ডাক দেয়ার সাহস পেয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্রিকেটার বলেন, ‘আর কত ভয় পেয়ে থাকব। এভাবে চলতে থাকলে কখনই সমাধান হবে না। এই দাবির পর বিসিবি যদি আমাকে জাতীয় দলে সুযোগ না দেয়, তাহলে খেলব না। কিন্তু এই ভয়ে তো আর চুপ থাকা যাবে না। বিসিবির এত টাকা আয়; কিন্তু আমাদের দিতে কষ্ট হয়।’

২৫ অক্টোবর ভারত সফরের জন্য প্রস্তুতি ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগের দিন জাতীয় ক্রিকেট লিগের তৃতীয় রাউন্ড শুরু হবে। কিন্তু সবকিছুই এখন অনিশ্চিত।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×