সাদেক হোসেন খোকা আর নেই

মরদেহ দেশে পৌঁছবে বৃহস্পতিবার * সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস সরকারের

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাদেক হোসেন খোকা
সাদেক হোসেন খোকা। ফাইল ছবি

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা আর নেই। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ সময় সোমবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনির ক্যান্সারে ভুগছিলেন। তার মৃত্যুর খবর শুনে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার স্মৃতিচারণ করে স্ট্যাটাস দেন।

মৃত্যুর খবর পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রবাসীরা হাসপাতালে ছুটে যান। সাদেক হোসেন খোকা স্ত্রী ইসমত হোসেন, একমাত্র মেয়ে সারিকা সাদেক এবং দুই ছেলে ইসরাক হোসেন ও ইসফাক হোসেনসহ অসংখ্য বন্ধুবান্ধব ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ মে সপরিবারে নিউইয়র্ক যান সাদেক হোসেন খোকা। তারপর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সে থাকতেন তিনি।

১৮ অক্টোবর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে ভর্তি করা হয়। ২৮ অক্টোবর আরও অবনতি ঘটলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বাদ এশা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার মসজিদে খোকার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও প্রবাসীরা অংশ নেন।

খোকার ছেলে ইসরাক হোসেন বলেন, বাবার মরদেহ ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মঙ্গলবার এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হব। বৃহস্পতিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছব।

এদিকে যুগান্তরের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি হাসানুজ্জামান সাকী জানান, নিউইয়র্কের কনসাল জেনারেল সাদিয়া ফয়জুননেসা বলেন, সোমবার আবেদন পাওয়ার পরপরই ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু করা হয়েছে।

খোকার শ্যালক শফিউল আজম খান বলেন, তার (খোকার) ইচ্ছা অনুযায়ী জুরাইন কবরস্থানে তার বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হবে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাদেক হোসেন খোকার লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

খোকার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সাদেক হোসেন খোকার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে যা যা করণীয় সরকার সবই করবে।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ খোকার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার লাশ দেশে আনতে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। তিনি তো ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গতকালই বলা হয়েছিল।

তাকে আনার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে ও হবে, সে ঘোষণা তো আগেই দেয়া হয়েছিল। পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীরও (বীর প্রতীক) খোকার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।

সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এক শোকবার্তায় তিনি খোকার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকার্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

খোকার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের। এক শোকবার্তায় তিনি খোকার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানান। শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গাও।

শোক জানিয়েছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিকল্পধারা বাংলাদেশের একাংশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল আমীন ব্যাপারী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ও মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার ও মহাসচিব জাফরউল্লাহ খান চৌধুরী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, খেলাফত মজলিসের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা ও মহাসচিব মঞ্জুর হোসেন ঈসা।

এছাড়াও যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, মহিলা দলসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতারাও খোকার মৃত্যুতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

এছাড়া সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন সম্মিলিত ক্রীড়া পরিবারের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হারুনুর রশীদ, সদস্য সচিব ফজলুর রহমান বাবুল, কর্মকর্তা দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল, বাদল রায়, আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি, অ্যাডভোকেট কাউসার, হাসানুজ্জামান খান বাবলু, শেখ মো. আসলাম, সত্যজিত দাস রুপু, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, আবদুল গফফার, জালাল আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ। এক বিবৃতিতে ক্রীড়াঙ্গনের পক্ষ থেকে তারা খোকার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন : ১৯৫২ সালের ১২ মে জন্মগ্র্রহণ করেন সাদেক হোসেন খোকা। বাবা-মায়ের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই বসবাস পুরান ঢাকার গোপীবাগে।

বাবা এমএ করীম প্রকৌশলী ছিলেন। গোপীবাগ রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল, কলতাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জয়দেবপুর রানী বিলাস মনি উচ্চ বালক বিদ্যালয়, পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে মা-বাবাকে না জানিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যান।

ছাত্রজীবনে রাজনীতির শুরু বাম রাজনীতি দিয়ে। ইউনাইটেড পিপলস লীগ (ইউপিপি-কাজী জাফর) এবং পরে ন্যাপ ভাসানীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যখন দলের হাল ধরেন খালেদা জিয়া, সেই সময়ে ১৯৮৪ সালে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

বিএনপির ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি হন। ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিবও। গোপীবাপ-কোতোয়ালির ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি জনপ্রতিনিধি হন। ১৯৯১ সালে সূত্রাপুর-কোতোয়ালি আসন থেকে খোকা প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হন।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঢাকার আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলেও একমাত্র খোকাই নির্বাচিত হন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রায় ৫ বছর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন।

তখন ঢাকার রাজপথে রক্তেরঞ্জিত খোকার ছবি এখনও অনেকের চোখেই দৃশ্যমান। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল নির্বাচনে অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। ঢাকা সিটি মেয়র হিসেবে সাদেক হোসেন খোকা দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বরণ্যে শিল্পী-সাহিত্যিকদের নামে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের নামকরণ করেন।

জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির ত্রাণবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন সাদেক হোসেন খোকা। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরেই ১৯৭২ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের দায়িত্ব নিয়ে ক্লাবকে ৩ বছরের মধ্যে তৃতীয় থেকে প্রথম বিভাগে উন্নীত করেন।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খোকা ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ও ফরাশগঞ্জ ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যানও ছিলেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের কয়েকদিন আগে সাদেক হোসেন খোকাকে গ্রেফতার করা হয়। কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেলে তাকে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান খোকা।

সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মরণব্যাধি ক্যান্সার ধরা পড়ে। দীর্ঘদিন সেখানেই তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একটি মামলা করে দুদক।

২০১৫ সালে দুর্নীতির মামলায় তাকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার একটি আদালত। সাদেক হোসেন খোকা মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ের স্মৃতিচারণমূলক কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি।

ঘটনাপ্রবাহ : সাদেক হোসেন খোকা আর নেই

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×