একনেক বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনা

ঋণের সুদ ৯ শতাংশ না করায় প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ

দ্রুত কার্যকর করতে অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ * সুদহার কমানোর পক্ষে-বিপক্ষে দুই মন্ত্রীর যুক্তিতর্ক * এককভাবে বড় ঠিকাদারদের কাজ নয়

  হামিদ-উজ-জামান ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী

কঠোর নির্দেশনার পরও ব্যাংক ঋণের সুদ ৯ শতাংশ না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটি দ্রুত কার্যকর করতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় এ নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে সুদের হার কমানোর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্কে জড়িয়ে পড়েন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে সুদহার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে (এক অঙ্ক)’ নামিয়ে আনার যে নির্দেশনা রয়েছে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে একনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের একাধিক সূত্র যুগান্তরকে আরও জানায়, এককভাবে শুধু বড় ঠিকাদাররা যাতে কাজ না পায় সে জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল (পিপিআর) সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

যুবলীগ নেতা জি কে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর তার হাতে থাকা সরকারি অনেক প্রকল্পের কাজ আটকে গেছে। এমন প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ছোট এবং নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ পাওয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে তিনি বলেন, কাজের গুণগত মান ঠিক রাখতে হবে।

সূত্র আরও জানায়, একনেকে একটি প্রকল্প অনুমোদনের সময় সেটি গ্রহণে কতটুকু লাভ হবে- সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে যে টাকাটা ব্যয় করি, সেটি পরবর্তীকালে কী ধরনের লাভ হবে (বেনিফিট কস্ট রেশিও), তা হিসাব করার সময় ১২ শতাংশ সুদ হিসেবে ধরে থাকি।

কিন্তু আপনার নির্দেশনামতো যদি ৯ শতাংশ ব্যাংক ঋণের সুদের হার কার্যকর হতো, তাহলে আমরাও ৯ শতাংশ ধরে হিসাব করলে অনেক বেশি লাভ দেখানো সম্ভব ছিল। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ৯ শতাংশ সুদ কার্যকর না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

ওই সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ৯ শতাংশ সুদহার দ্রুত কার্যকর হওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমর্থন জানান। এতে কিছুটা আপত্তি তোলেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর আমরা কীভাবে করব?

কেননা এটি করতে গেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হয়। এর সঙ্গে বাড়তি খরচ রয়েছে ৩ শতাংশ। কিন্তু ৬ শতাংশ সুদে আমানত পাওয়া যায় না। এ সময় তার কথায় ‘ভেটো’ দিয়ে অর্থমন্ত্রী জানতে চান তিন শতাংশ কিসের খরচ?

এ সময় দু’জন যুক্তিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। তখন প্রধানমন্ত্রী ৯ শতাংশ সুদ দ্রুত কার্যকর করতে এ সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামতো গত বছরের ১ জুলাই থেকে সব ব্যাংকের ঋণে সুদ ৯ শতাংশ কার্যকর করার কথা ছিল। কিন্তু না হওয়ায় ওই বছরের ৯ আগস্ট ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী।

সেখানে এই সুদহার কার্যকরের বিষয়ে তাগিদ দেয়া হলেও পরবর্তীকালে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এর আগে গত বছরের জুলাই থেকে আমানতে সর্বোচ্চ ৬ এবং ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ কার্যকরের ঘোষণা দেন ব্যাংক মালিকরা।

এর পূর্বশর্ত হিসেবে তারা ৫টি সুবিধা আদায় করে নেন। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের কর কমানো, নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) কমানো, সরকারি আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, রেপো রেট কমানো এবং ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়সীমা দফায় দফায় বাড়ানো।

এ ছাড়া টানা ৯ বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকা ও এক পরিবারের ৪ জনকে ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগও করে দেয় সরকার। সব সুবিধা ইতিমধ্যে ভোগ করা শুরু করলেও নয়-ছয় সুদহার কার্যকর করেনি অধিকাংশ ব্যাংক।

আগে থেকে কয়েকটি খাতে কম সুদ ছিল সেগুলোকেই কার্যকর বলে উপস্থাপন করেছে কয়েকটি ব্যাংক।

তবে একনেক বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে ব্যাংক সুদহার সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানাননি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।

তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু নির্দেশনার কথা তুলে ধরেন। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দ্রুত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল (পিপিআর) সংশোধনের জন্য আইএমইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন, বিদ্যমান পিপিআর অনুযায়ী এখনকার যে নিয়ম এতে বড় ঠিকাদাররাই শুধু কাজ পাচ্ছেন। এখন দেখতে হবে ছোট এবং নতুন ঠিকাদাররাও যেন কাজ পায়। দরপত্রে ছোট ঠিকাদাররা অংশ নিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে।

তবে কাজের মান ঠিক রাখতে হবে। এ ছাড়া দ্রুত প্রকল্প শেষ করতেও নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, প্রায়ই আগ্রহ নিয়ে প্রকল্প পাস করা হয়, দালানকোঠা নির্মাণ করা হয়। তারপর আর বাকি কাজ হয় না।

জনবল নেই, অথবা যন্ত্রপাতি নেই- এসব অজুহাত দিয়ে কাজ শেষ করা হয় না। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, যে আগ্রহ নিয়ে আপনারা প্রকল্পের কাজ শুরু করেন, একই আগ্রহ নিয়ে আপনারা দয়া করে বাকি কাজগুলো শেষ করবেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী আরও জানান, দেশের ছোট নদীগুলোতে অহেতুক সেতু নির্মাণ না করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, এমনিতেই নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর যদি অহেতুক সেতু নির্মাণ করা হয়, তাহলে আরও সমস্যা হবে। তাই সেতু নির্মাণে সাবধান হতে হবে।

এছাড়া যশোর-খুলনা সড়কের কাজ দীর্ঘদিনেও শেষ না হওয়ায় বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এখন থেকে নতুন রাস্তা করার চেয়ে বিদ্যমান রাস্তাগুলো, বিশেষ করে, আন্তঃজেলা সড়কগুলো আন্তর্জাতিক মানের বা চার লেন এবং প্রশস্ত করা হবে। এটি সরকারের নীতি।

কেননা রাস্তা অনেক হয়েছে। এগুলোকে এখন সংস্কার, প্রশস্তকরণ বা চার লেনে উন্নীতকরণ জরুরি। তবে একেবারেই যে নতুন সড়ক হবে না তা নয়, এ ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×