বিএসএমএমইউ: ইউজার ফি নিলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না চিকিৎসকরা

ফেরত দিতে হবে আগে নেয়া অতিরিক্ত টাকা * আগের হিসাব সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে ইউজার ফি বণ্টন

  রাশেদ রাব্বি ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত বিভাগগুলোতে কর্মরত চিকিৎসক কর্মচারীরা বছরে একশ’ থেকে দেড়শ’ কোটি টাকা ইউজার ফি গ্রহণ করেন।

সম্প্রতি উচ্চ আদালত এই ফি গ্রহণের বিষয়ে এক আদেশ জারি করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, যারা ইউজার ফি গ্রহণ করবেন তারা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। পাশাপাশি ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ইউজার ফির ৩০ শতাংশ মুনাফা গ্রহণ না করে মোট আয়ের ৩০ শতাংশ যারা গ্রহণ করেছেন তাদের সবাইকে এই অতিরিক্ত টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে ফেরত দিতে হবে। আর আগের এ হিসাব সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে ইউজার ফি খাতে সংগৃহীত টাকা বণ্টন স্থগিত থাকবে।

হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার জন্য রোগ নির্ণয় করতে প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ভাইরোলজি, রেডিওলজি ইত্যাদি বিভাগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোতে এসব বিভাগে পরীক্ষা বাবদ রোগীরা যে ফি দেন তার একটা অংশ চিকিৎসক, টেকনোলজিস্টসহ অন্য কর্মচারীরা ভাগ করে নেন। এ প্রক্রিয়াটাকেই মূলত ইউজার ফি বলা হয়। এ ক্ষেত্রে বিএসএমএমইউর সিন্ডিকেট থেকে এসব বিভাগের কর্মীদের জন্য নিট মুনাফার ৩০ ভাগ নেয়ার অনুমতি ছিল। কিন্তু তারা মুনাফার ৩০ ভাগ না নিয়ে মোট আয়ের ৩০ ভাগ টাকা ইউজার ফি হিসেবে এতদিন গ্রহণ করে আসছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব বিভাগের কর্মরতরা ইউজার ফি গ্রহণ করেছেন উচ্চ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারা কিছুটা ক্ষুব্ধ হলেও অন্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি রোগীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত আয় এভাবে ব্যয় না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও রোগীদের স্বার্থে ব্যবহার করা হোক।

বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া যুগান্তরকে বলেন, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে আমরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। এ জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের অডিটর ও আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি বাস্তবায়ন করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে বাস্তবায়ন হলে বছরে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা হবে। যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬টি বিভাগ অত্যাধুনিক মেশিনপত্রে সজ্জিত করা যাবে। পাশাপাশি রোগীদের আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হবে।

পরামর্শকদের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ইউজার ফির নামে যারা অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেছে তাদের কাছ থেকে টাকা ওঠানো বেশ কঠিন হবে। যারা ইতিমধ্যে অবসরে গেছেন তাদের কাছ থেকে সম্ভব হবে না। যারা কর্মরত রয়েছেন তাদের বেতন থেকে টাকা কেটে নেয়া যেতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী এ বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

উচ্চ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল হান্নান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের রিট পিটিশন নং-১৫৩৬০/২০১৮-এর রায় অনুযায়ী, যেসব বিভাগের (মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি, মলিকুলার বায়োলজি অ্যান্ড বায়োকেমিস্ট্রিসহ অন্যান্য) শিক্ষক, চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট/টেকনিশিয়ান ইউজার ফি গ্রহণ করবেন তারা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না।

এ ছাড়া ২০০৭ সাল থেকে যারা (শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা, টেকনোলজিস্ট, টেকনিশিয়ান, নার্স ও কর্মচারী) ইউজার ফির নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের পরিবর্তে মোট আয়ের ৩০ শতাংশ গ্রহণ করেছেন, তাদেরকে অতিরিক্ত টাকা বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলে ফেরত দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব বিভাগ ইউজার ফি সংগ্রহ করে তাদের প্রতি আর্থিক বছরের শেষে লাভক্ষতির হিসাব ও মুনাফা নির্ধারণ এবং ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত অতিরিক্ত গৃহীত টাকা নির্ধারণ ও আদায় না হওয়া পর্যন্ত ইউজার ফি থেকে সংগৃহীত টাকা বণ্টন স্থগিত থাকবে। ওই অফিস আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব বিভাগ ইউজার ফি গ্রহণ করে সেই বিভাগের সব স্তরের চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারীকে সাত দিনের মধ্যে ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন কি না’ মর্মে স্ট্যাম্পে হলফনামা প্রদান করতে বলা হয়েছে।

অফিস আদেশ দেয়ার পর ২০ দিন অতিবাহিত হয়েছে, এ পর্যন্ত কতজন প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন কি না অবহিত করেছেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল হান্নান যুগান্তরকে বলেন, এখনও কেউ স্ট্যাম্পে হলফনামা প্রদান করেননি। তবে অনেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, এটি একটি প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি, মলিকুলার বায়োলজি অ্যান্ড বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপকরা প্রতিমাসে গড়ে ৭-৮ লাখ টাকা ইউজার ফি থেকে গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া সহযোগী অধ্যাপকরা গড়ে ৪-৫ লাখ, সহকারী অধ্যাপকরা ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ, কনসালট্যান্টরা ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা, মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা গড়ে ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ৭০ হাজার টাকা, কম্পিউটার অপারেটররা গড়ে ৩৫-৫৫ হাজার টাকা ও এমএলএসএসরা গড়ে ১৭-৩০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন।

একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে দীর্ঘদিনের এ আর্থিকবৈষম্য নিরসনে অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইতঃপূর্বে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ সেপ্টেম্বর অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রকার পারিতোষিক (কমিশন) বাতিল করে সেই অর্থ প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা করাসহ চার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ। পরে উপাচার্যের হস্তক্ষেপে তারা অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্র্যাকটিশনার ও নন-প্র্যাকটিশনার বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মচারীরা যুগান্তরকে জানান, এখানে কাজের জন্য সবাইকেই নির্ধারিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়। কিন্তু কিছু বিভাগ প্রতিষ্ঠানের উপার্জিত অর্থ নিজেরা ভাগাভাগি করে নিয়ে যায়। যা একই সঙ্গে অনৈতিক এবং বৈষম্যমূলক। তারা বলেন, বছরে এক থেকে দেড়শ’ কোটি টাকা এভাবে বিলি বণ্টন হয়ে থাকে। অথচ এই টাকা দিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের সেবা অনেক বাড়ানো সম্ভব।

পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতেও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা যেতে পারে। তারা বলেন, ইউজার ফি প্রাপ্তি চাকরির কোনো শর্ত না। তাছাড়া হাসপাতালে সব বিভাগের কর্মীরাই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে থাকেন। তাই প্রশাসনের উচিত ইউজার ফি এভাবে ভাগ-বাটোয়ারা না করে এগুলো দরিদ্র রোগীদের স্বার্থে ব্যবহার করা। বিশেষ করে এই টাকা ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি আরও কমানো সম্ভব।

এর আগে ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০তম সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের যেসব বিভাগ আয়ের ৩০ শতাংশ হারে পারিতোষিক প্রদান করছে তা বহাল থাকবে। তবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ২টি বেসিকের বেশি হবে না এবং সব বিভাগ তাদের আয়ের ১০ শতাংশ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ফান্ডে জমা করবে। এ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য সব বিভাগের কর্মরতদের মধ্যে বছরে একটি বা দুটি ইনসেনটিভ হিসেবে প্রদান করা হবে। সে ক্ষেত্রে পারিতোষিকভুক্ত বিভাগসমূহ অন্তর্ভুক্ত হবে না।

এর আগে দেশের সব সরকারি হাসপাতালের ইউজার ফি আদায় ও বণ্টনের বিষয়ে একটি রিট আবেদন করা হয়। ২০১০ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ইউজার ফি বণ্টন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। এর পর থেকে এ বাবদ নেয়া অর্থের পুরোটাই সরকারি কোষাগারে জমা হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্টদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই স্থগিতাদেশ স্থগিত করেন এবং ২০১৪ সালে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। রায়ে বলা হয়, হসপাতালের হাইরিস্ক (উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ) বিভাগের কর্মকর্তারা (চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট) ইনসেনটিভ পাবেন। তবে কি হারে পাবেন সেটা নির্ধারণে এ সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে। কিন্তু তারপর মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর থেকে এ সংক্রান্ত কোনো আইন প্রণয়ন না হওয়ায় সরকারি হাসপাতালে ইউজার ফি আদায় ও বণ্টন স্থগিত রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×