আবরার হত্যা

২৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল, সরাসরি জড়িত ১১ শিক্ষার্থী

‘হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকটু মনিটর করলে এ ঘটনা এড়ানো যেত’ * রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অভিযুক্তরা অছাত্রের মতো উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত ছিল * অভিযুক্ত ২১ জন কারাগারে, ৪ জন পলাতক * ৩৭ দিনে চার্জশিট সাক্ষী ৩১ জন

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবরার হত্যা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় ১১ জন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিতি এবং অন্যভাবে সম্পৃক্ততার কারণে বাকি ১৪ জনকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অভিযুক্ত সবাই বুয়েটের ছাত্র (১৯ জন সাময়িক বরখাস্ত)।

এ ছাড়া তারা বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীও। তাদের ১২ জনকে ইতিমধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বুধবার দুপুরে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ চার্জশিট জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান।

এরপর বিকালে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. কায়সারুল ইসলামের আদালতে চার্জশিটটি দাখিল করা হলে আদালত তা দেখেন।

মামলার বিচারের লক্ষ্যে শিগগির এ চার্জশিট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে। হত্যা ঘটনার ৩৭ দিনের মাথায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করল ডিবি।

ডিবি পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে- অভিযুক্তরা উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত ছিল। তারা রাজনৈতিক পরিচয়কে ‘শেল্টার’ হিসেবে ব্যবহার করে অছাত্রের মতো আচরণ করত।

বুধবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

তিনি আরও বলেন, হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকটু মনিটরিং করলে এ ঘটনা এড়ানো যেত। তদন্তে আমরা তাদের ব্যর্থতা দেখেছি।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে তাদের গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নিতে পারে, এটা পুলিশের বিষয় নয়।

আবরার হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে চারজন পলাতক আর ২১ জন কারাগারে আছেন। তাদের মধ্যে ঘটনার দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন আটজন।

বাকি ১৩ জনের ১৬১ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করে গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জসিম উদ্দীন জানান, চার্জশিটে ২১টি আলামত ও ৮টি জব্দতালিকা যুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যায় তদন্ত সংস্থা যে অভিযোগপত্র দিয়েছে, তা ‘নির্ভুল হয়েছে’ মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন শিগগির এর বিচার হবে, আমরাও এটা আশা করছি।

আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সব আইনি বাধ্যবাধকতা শেষ করে আবরার হত্যা মামলার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা হবে।

এদিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে চার্জশিট দেয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে আবরারের বাবা-মা। তারা এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুনিদের শাস্তি দেখতে চান।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ৬ অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়।

পরদিন আবরারের বাবা ১৯ শিক্ষার্থীকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করেন। তদন্তে নেমে পুলিশ এজাহারের ১৬ জনসহ ২১ জনকে গ্রেফতার করে। তিনি জানান, আবরার ফাহাদকে হত্যায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ১১ জন।

তারাই তাকে কয়েক দফায় মারধর করেন। বাকি ১৪ জন বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তিনি বলেন, চার্জশিটে ৩১ জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে।

তাদের মধ্যে বাদী পক্ষের ৬ জন ছাড়াও বুয়েটের সাতজন শিক্ষক, ১৩ জন শিক্ষার্থী এবং ৫ জন কর্মচারী রয়েছেন।

তিনি বলেন, মামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। এর মধ্যে এজাহারে ১৬ জন ও এজাহারের বাইরে ৫ জন। বাকি চারজন পলাতক।

পলাতক ৪ জনের মধ্যে তিনজন মামলার এজাহারভুক্ত। তারা হলেন : জিসান, তানীম ও মোর্শেদ। এজাহারবহির্ভূত একজন রাফি।

মনিরুল ইসলাম বলেন, বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদকে কোনো একক কারণে হত্যা করা হয়নি। আবরার শিবির করেন কি না, হত্যার পেছনে এটি একটি মাত্র (অন্যতম) কারণ।

কিন্তু যারা তাকে হত্যা করেছে, তারা এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কেউ তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে, সালাম না দিলে, তাদের সামনে হেসে দিলে ইত্যাদি কারণে নির্যাতন করত।

তিনি বলেন, একটি ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া হিসেবে উচ্ছৃঙ্খল ছেলেরা আবরারকে হত্যা করেছে। তারা জুনিয়রদের এক ধরনের আতঙ্ক ও ভয়ে রাখত।

জুনিয়ররা তাদের সালাম না দিলে, ছোটখাটো বিষয়ে দ্বিমত করলে, তাদের মতের বিরুদ্ধে গেলে বা তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে ডেকে নিয়ে মারধর করত।

যাতে একজনের নির্যাতন দেখে অন্যরা ভয় পায়। যাদের পছন্দ হতো না তাদের এনে নির্যাতন করত। তারা উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়কে তারা শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করত। তাদের মধ্যে ছাত্রসুলভ আচরণ ছিল না। কর্তৃত্ববাদী আচরণ করার জন্য তারা রাজনৈতিক ফ্লাটফরম ব্যবহার করেছে।

শিবির সন্দেহে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মনিরুল বলেন, একক কোনো কারণে না। আবরার শিবির করার সন্দেহটি একটি কারণ মাত্র।

অনেকগুলো কারণের সমষ্টিতে তাকে মারধর করা হয়। আসামিরা বলেছে, আবরারের আচরণগত সমস্যা ছিল। সে ফেসবুকে তির্যক মন্তব্য করত, যেটি তারা মনে করত তাদের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

সে তাদেরকে সালাম দিত না। এ ছাড়া ঘটনার আগে ফেসবুকে সে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিল। যেটিকে তারা অন্যভাবে নিয়েছে।

তিনি বলেন, এ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সিসিটিভির ফুটেজ এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা, আসামিদের মেসেজ আদান-প্রদান ও সাক্ষীদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেছি।

সিসিটিভির ফুটেজে ১৯ জনের চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। অভিযুক্তরা র‌্যাগিংয়ের নামে নতুনদের আতঙ্কিত রাখতে এসব কাজ করত। এসব বিষয়ে আমরা আগে কোনো অভিযোগ পাইনি।

তবে তদন্তে একজন সাক্ষী বলেছেন যে তিনি একজনকে সালাম দেননি বলে তাকে নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে। র‌্যাগিংয়ের নামে উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের অভ্যস্ততার অংশ হিসেবেই আবরার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি।

সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বুয়েট হল প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব ছোটখাটো বিষয়ে হল প্রশাসনের আরেকটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।

এই বিষয়গুলো তাদেরই মনিটরিং করার কথা। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে আমাদের তদন্তে হল প্রশাসনের ব্যর্থতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে মনিটরিং করলে এমন ঘটনা না-ও ঘটতে পারত।

মনিরুল ইসলাম বলেন, গত ৬ অক্টোবর রাতে শিবির সন্দেহে আবরার ফাহাদকে তার রুম থেকে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী।

রাত ১০টা থেকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে তাকে মারধর করা হয়। সেখান থেকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে আবার তাকে মারা হয়।

রাত ২টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসক এসে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন। দীর্ঘ সময় তাকে পেটানো হয়। তাকে হয়তো একটু আগে হাসপাতালে নিয়ে গেলে এমন নৃশংস পরিণতি হতো না।

তিনি বলেন, আগে থেকেই হল প্রভোস্ট এবং ডাক্তারকে ডেকে আনা হয়েছিল। দুইটার পর থেকেই তারা নাকি জানতে পেরেছেন বলে আমাদের তদন্তে উঠে এসেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, রাত তিনটার (৬ অক্টোবর) দিকে পুলিশকে খবর দেয়া হয়, শিবির সন্দেহে একজনকে আটক করা হয়েছে।

এ সময় পুলিশের টহল টিম হলের বাইরে অপেক্ষা করলে পরে জানানো হয় কিছু হয়নি। তিনটার আগে পুলিশ এ বিষয়ে কিছু জানতে পারেনি।

অমিত সাহার বিষয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, অমিত সাহা ঘটনাস্থলে না থাকলেও ঘটনার আগে এবং ঘটনার দিন হত্যায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে।

ঘটনার আগেও সে আবরারকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে। আগেও আরেক শিক্ষার্থীকে পিটিয়েছে অমিত সাহা। সে কারণে অমিত সাহাকে অভিযোগপত্রে একজন অন্যতম আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মনিরুল বলেন, বিশ্বজিৎ হত্যায় যারা রড দিয়ে পিটিয়েছিল, তাদের ফাঁসি হয়েছে। অভিযুক্ত কয়েকজন আবার খালাসও পেয়েছে। সেই মামলায় আমরা তেমনভাবে সিসিটিভি ফুটেজ পাইনি।

এ ধরনের ঘটনা প্রমাণের জন্য ট্রেডিশনাল তদন্ত বা চাক্ষুষ সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। আবরার হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন, তদন্ত সহায়ক দল ছিল, সিসিটিভি ফুটেজ, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপের তথ্য রয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ, পাশাপাশি ৮ জন আসামির বক্তব্যও হত্যাকাণ্ডের অনেক বিষয় প্রমাণ করে। যদিও এ ধরনের ঘটনায় চাক্ষুষ সাক্ষী থাকলেও সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসে না।

কিন্তু আমরা যেভাবে চার্জশিট প্রস্তুত করেছি, আশা করছি সবার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে। তিনি জানান, আবরারকে নির্যাতনে ব্যবহৃত পাঁচটি ক্রিকেট স্টাম্প, একটি স্কিপিং রোপ, দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিডি, পাঁচটি মোবাইল ফোন এবং একটি ল্যাপটপ এ মামলার আলামত হিসেবে রাখা হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। সেদিন ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে একটি ভিডিও দেখানো হয় পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে।

আবরার হত্যায় অভিযুক্ত যারা : আবরার হত্যায় অভিযুক্তরা হলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল (সিই বিভাগ, ১৩তম ব্যাচ), সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ (১৪তম ব্যাচ, সিই বিভাগ), সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ১৫তম ব্যাচ), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির (ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৬তম ব্যাচ), ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন (মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল (বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৬তম ব্যাচ), সদস্য মুনতাসির আল জেমি (এমআই বিভাগ), সদস্য মুজাহিদুর রহমান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), সদস্য হোসেন মোহাম্মদ তোহা (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম (সিই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), শামীম বিল্লাহ (মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মাজেদুল ইসলাম (এমএমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), আকাশ হোসেন (সিই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর (মেকানিক্যাল, ১৭তম ব্যাচ), মাহমুদুল জিসান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), মোয়াজ আবু হোরায়রা (সিএসই, ১৭ ব্যাচ), এএসএম নাজমুস সাদাত (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ)। তারা আবরারের বাবার মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি। আর এজাহারের বাইরের ৬ আসামি হলেন : বুয়েট ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না (মেকানিক্যাল, তৃতীয় বর্ষ), আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং), মিজানুর রহমান (ওয়াটার রিসোর্সেস, ১৬ ব্যাচ), শামসুল আরেফিন রাফাত (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং), উপদফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ (কেমিকৌশল) এবং মাহামুদ সেতু (কেমিকৌশল)।

পলাতক ৪ জন হলেন : এহতেশামুল রাব্বি তানিম (সিই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মাহমুদুল জিসান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ) এবং মুজতবা রাফিদ (কেমিকৌশল)।

যে আটজন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন : যে ৮ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তারা হলেন- মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, এএসএম নাজমুস সাদাত এবং খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর। আদালতের কাছে তাদের দেয়া বর্ণনায় উঠে আসে আবরারকে পেটানোর সেই ভয়ংকর বিবরণ।

আবরারকে কীভাবে ক্রিকেট স্টাম্প আর স্কিপিং রোপ দিয়ে কয়েক ঘণ্টা বেধড়ক পেটানো হয়েছিল, তার বর্ণনা ডিবি পুলিশ ও আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এ ৮ জন।

আবরারকে সেদিন রাতে ওই হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা নির্যাতনের পর দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি জায়গায় তাকে অচেতন অবস্থায় ফেলে যাওয়া হয়।

হত্যার ঘটনায় সরাসরি ১১ জন : হত্যার ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন তারা হলেন- মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, শামীম বিল্লাহ, এএসএম নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর।

অভিযুক্তদের ব্যাপারে বুয়েটের পদক্ষেপ : আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের স্থায়ী বহিষ্কারের বিষয়ে বুয়েট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেবে এমন প্রশ্নের জবাবে বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আজকে (বুধবার) চার্জশিট হয়েছে বলে আমরা খবরে দেখেছি। এরপর চার্জশিটের কপি নেয়ার জন্য যোগাযোগ করেছি।

কিন্তু আজকে এটি আমরা হাতে পাইনি। বৃহস্পতিবারও যোগাযোগ করব। আমরা আশা করছি চার্জশিটের কপিটি নিতে পারব। এরপর ডিসিপ্লিনারি বোর্ড (শৃঙ্খলা কমিটি) এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

কী ধরনের শাস্তি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চার্জশিটের বিষয়ে আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, বিভিন্ন জনের বিষয়ে বিভিন্ন মাত্রার অপরাধের কথা সেখানে বলা হয়েছে।

ইতিপূর্বে আমরা ১৯ জনকে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছি। বাকিদেরকেও অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা হবে।

যেহেতু সকলের অপরাধের মাত্রা এক নয়, সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনুযায়ী তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত সবাইকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে।

তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, যেহেতু শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল অভিযুক্তদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা, আমরা সেই প্রক্রিয়ার দিকেই যাচ্ছি। আশা করছি, তারা শিগগিরই তারা একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেবে।

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত জানাবেন আজ : আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের পর নিজেদের করণীয় নিয়ে আজ (বৃহস্পতিবার) আলোচনায় বসবেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। বৈঠকে চার্জশিট পরবর্তী নিজেদের করণীয় ঠিক করা হবে।

গত ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর থেকে বেশ কিছু দাবিতে ক্লাস পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা।

এতদিন শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরা অনেকটাই নির্ভর করেছিল হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের ওপর। কারণ শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিল চার্জশিটভুক্ত সবাইকে বুয়েট থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের।

বুধবার সন্ধ্যায় বুয়েটের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র অন্তরা তিথি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে চার্জশিট দেয়ার জন্য আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখতে চাই।

তবে এ চার্জশিটে কী রয়েছে সেটি আমরা এখনও জানি না। আমরা এ হত্যা মামলার আইনজীবীর কাছে চার্জশিটের কপি আসলে তারপর তার থেকে নিয়ে এটি পর্যালোচনা করব।

তাই এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাই না। চার্জশিট হাতে পেলে এরপর আমরা এ বিষয়ে কথা বলব। তবে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখতে চাই।

নিজেদের আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা অনেকগুলো দাবি নিয়ে আন্দোলনে রয়েছি। সেগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাসে ফিরছি না।

আমরা চাই চার্জশিটভুক্ত সব আসামির বুয়েট থেকে স্থায়ী বহিষ্কার। ইতিপূর্বে সংঘটিত তিনটি হলের র‌্যাগিংয়ের বিচার। এবং র‌্যাগিং করলে কী শাস্তি দেয়া হবে তা অর্ডিনেন্সে যুক্ত করা।

প্রসঙ্গত আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার পর ৭ অক্টোবর থেকে আন্দোলনে নেমে ১০ দফা দাবি তোলেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে বুয়েট শিক্ষক সমিতি ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও সমর্থন প্রকাশ করেন।

তাদের দাবির মুখে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ, আবরার হত্যার আসামিদের সাময়িক বহিষ্কার এবং হলগুলোতে নির্যাতন বন্ধে নানা পদক্ষেপ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

আন্দোলন শিথিল করে ১৪ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ দিয়ে মাঠের আন্দোলনে ইতি টানলেও হত্যাকারীদের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে শিক্ষার্থীরা।

গত ১৯ অক্টোবর থেকে বুয়েটের টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও আন্দোলনের কারণে তা এখনও হয়নি। পরীক্ষা শুরুর জন্য বুয়েট কর্তৃপক্ষ নিজেদের তদন্ত এবং পুলিশের অভিযোগপত্রের জন্য অপেক্ষার কথা জানিয়েছিল।

ঘটনাপ্রবাহ : বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×