সড়ক আইন কার্যকরে শ্রমিকদের বাধা

কুষ্টিয়া, দিনাজপুর ও বগুড়ায় হঠাৎ করে গাড়ি বন্ধে দুর্ভোগে যাত্রীরা * ২১ ও ২২ নভেম্বর শ্রমিক ফেডারেশনের বর্ধিত সভা * বিআরটিএ অফিসের সামনে আজ অবস্থান নেবে একটি সংগঠন

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক আইন

সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরে পথে পথে বাধা সৃষ্টি করছে বিভিন্ন জেলার পরিবহন শ্রমিকরা। সংশোধনের আগেই নতুন আইন বাস্তবায়নের প্রতিবাদে শ্রমিকরা শনিবার দিনাজপুর, বগুড়া ও কুষ্টিয়ায় হঠাৎ করেই গাড়ি বন্ধ করে দেন তারা। এতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

এছাড়া আজ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে একটি পরিবহন সংগঠন। অপরদিকে আইন সংশোধন নিয়ে করণীয় নির্ধারণ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ২১ ও ২২ নভেম্বর বর্ধিত সভা ডেকেছে। ওই সভায় নতুন কর্মসূচি আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

এদিকে তফসিলভুক্ত না হওয়ায় সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরে মোবাইল কোর্ট চালাতে পারছে না বিআরটিএ। সংস্থাটি আশা করছে, দু-এক দিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের পর মোবাইল কোর্ট শুরু করা যাবে। এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রোববার বা সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মোবাইল কোর্ট তফসিলভুক্ত করে গেজেট জারি হতে পারে। বিধিমালার বিষয়ে তিনি বলেন, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এটি নিয়ে কাজ করছে। আশা করছি, বিধিমালার গেজেট প্রকাশ হতে বেশি সময় লাগবে না।

একাধিক পরিবহন শ্রমিক নেতা বলেন, দুর্ঘটনার মামলা জামিনযোগ্যসহ সড়ক আইনের কয়েকটি ধারায় সংশোধন চান শ্রমিকরা। তাদের দাবি, আইন সংশোধনের পরই এটি কার্যকর করা হোক। এটা না করা পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় গাড়ি বন্ধসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন হবে। তারা বলেন, সরকারের বিভিন্ন দফতরে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও আইনটি সংশোধন ছাড়াই বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হয়। এতে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে কয়েকটি জেলায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সামনেও একই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এনিয়ে ২১ ও ২২ নভেম্বর শ্রমিক ফেডারেশন বর্ধিত সভা ডেকেছে। ওই সভার এজেন্ডাগুলোর মধ্যে এক নম্বরে আছে সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী যুগান্তরকে বলেন, শ্রমিকরা ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দণ্ডের ভয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিচ্ছে। আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই তারা এসব করছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বর্ধিত সভা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্মেলন সামনে রেখে বর্ধিত সভার আয়োজন করা হচ্ছে। ওই সভায় সড়ক আইন নিয়ে করণীয় বিষয়ে আলোচনা হবে।

এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম জেলা সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন দুলাল বলেন, সড়ক আইনের কয়েকটি ধারায় সংশোধনী চেয়েছি। ওই সংশোধনী ছাড়া আইনটি যাতে কার্যকর করা না হয় সেজন্য বিআরটিএর সামনে অবস্থান ধর্মঘট করব। পরে স্মারকলিপি পেশ করব।

বগুড়া থেকে হঠাৎ কয়েকটি রুটে বাস বন্ধ : বগুড়া ব্যুরো জানায়, বগুড়ায় পরিবহন শ্রমিকরা শনিবার সকাল থেকে হঠাৎ করেই বেশ কয়েকটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে বগুড়া থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নগরবাড়িসহ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শত শত যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন। বাইরের জেলা থেকে আসা বাসগুলো বগুড়ায় যাত্রী তোলার চেষ্টা করলে স্থানীয় শ্রমিকরা বাধা দেন। দুপুরে পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও পুলিশের জরুরি বৈঠকের পর বাস চলাচল প্রায় স্বাভাবিক হয়। তবে বাসের সংখ্যা কম ছিল। মালিক-শ্রমিক নেতারা বলছেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের প্রতিবাদে ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া বাস শ্রমিকরা শাস্তির ভয়ে বাস বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

এদিকে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুপুরে শহরে স্টেশন রোডে বগুড়া জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে মালিক ও শ্রমিক নেতা এবং পুলিশ জরুরি সভায় বসেন। সেখানে সদর থানার ওসি এসএম বদিউজ্জামান, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) রেজাউল করিম রেজা, বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপের সভাপতি শাহ আখতারুজ্জামান ডিউক, সহ-সভাপতি তৌফিক হাসান ময়না, জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল লতিফ মণ্ডল, সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দিন শেখ হেলাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দিন শেখ হেলাল জানান, তারা কাউকে গাড়ি বন্ধ রাখতে বলেননি।

তিনি অচলাবস্থা নিরসনে শ্রমিকদের দ্রুত বাস চলাচলের নির্দেশ দেন। এছাড়া কোনো শ্রমিক সমস্যায় পড়লে তিনি মোকাবেলার আশ্বাস দেন। বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপ নেতা তৌফিক হাসান ময়না জানান, তারাও বাস চলাচল বন্ধ করতে বলেননি। কিন্তু সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করার কথা থাকায় ফিটনেসবিহীন বাসের শ্রমিকরা ভয়ে বাস বন্ধ করে দেন। ফলে কয়েকটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ ছিল।

কুষ্টিয়ায় ঘোষণা ছাড়াই বাস বন্ধ : কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ায়ও কোনো ঘোষণা ছাড়াই বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন শ্রমিকরা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। শনিবার সকাল থেকে কুষ্টিয়ার আন্তঃজেলা চারটি রুটে বাস চালানো থেকে বিরত থাকেন শ্রমিকরা।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের প্রতিবাদে তারা বাস চালাচ্ছেন না। কবে কখন বাস চালাবেন সেটাও ঠিকভাবে বলতে পারছেন না। হঠাৎ করে বাস বন্ধের ফলে কুষ্টিয়া থেকে ভেড়ামারা-প্রাগপুর, কুষ্টিয়া-মেহেরপুর, কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক জেলা সড়ক ও মহাসড়কে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকালে বাসস্ট্যান্ডে এসে যাত্রীরা বিষয়টি জানতে পেরে বিপাকে পড়েন। বাস না পেয়ে অনেকেই বিকল্প যানবাহনে করে তাদের গন্তব্যে রওনা দেন।

জেলার বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাহাবুবুল হক জানান, জেলায় যত বাস আছে তার ৫০ ভাগ গাড়ির সঠিক কাগজপত্র নেই। সব বাসেরই সমস্যা আছে। এছাড়া ৫০ ভাগ চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা সুপারভাইজারের শতভাগ লাইসেন্স করা নেই। নতুন আইনে বড় অংকের জরিমানার বিধান হওয়ায় চালক ও সুপারভাইজাররা সড়কে বাস নামাচ্ছেন না। মাহাবুবুল আলম আরও বলেন, বিষয়টি কেন্দ্রীয় ভাবে হয়ে আসছে। কেন্দ্র মোতাবেক সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত বলেন, বাস বন্ধ রাখার বিষয়টি জানা আছে। এ ব্যাপারে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে আইনের বাইরে কোনো কিছুই করা হবে না।

দিনাজপুরের হিলি-বগুড়া রুটে বাস বন্ধ : দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, আগাম ঘোষণা ছাড়াই দিনাজপুরের হিলি-বগুড়া রুটে হঠাৎ করেই যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন চালকরা। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প উপায়ে যাত্রীরা গন্তব্যস্থলে যান। তবে হিলি-দিনাজপুর ও হিলি-জয়পুরহাট রুটের বাস চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

আন্দোলনকারী বাস চালকরা বলেন, নতুন পরিবহন আইনে কোনো কারনে দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে নতুন আইনে চালকদের মৃত্যুদণ্ড এবং আহত হলে ৫ লাখ টাকা দিতে হবে। আমাদের এত টাকা দেয়ার সামর্থ্য নেই এবং বাস চালিয়ে আমরা জেলখানায় যেতে চাই না। এ কারণেই নতুন পরিবহন আইন সংস্কারের দাবি জানান তারা। নইলে তারা বাস চালাবেন না বলে জানান বাসচালক ইমরান হোসেন।

এদিকে দিনাজপুর মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের হাকিমপুর উপজেলা স্ট্যান্ড কমিটির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান মিলন বলেন, এটি সংগঠনের কোনো কর্মসূচি নয়। চালকরা নিজেরাই গাড়ি চালানো থেকে বিরত রয়েছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×