ষড়যন্ত্রকারী চক্রের অপতৎপরতা অব্যাহত: আবরার ফুটওভারব্রিজ নির্মাণে চরম গাফিলতি

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্য, ৮ মাসেও শেষ হয়নি নির্মাণ কাজ * ব্রিজের উপর-নিচ দুই পথই খোলা, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে পথচারী পারাপার, যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটওভারব্রিজ
ফুটওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও রোড ডিভাইডারের রেলিং খুলে দেয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন পথচারীরা। প্রগতি সরণির বসুন্ধরা গেটের সামনে থেকে শনিবার তোলা ছবি। যুগান্তর

রাজধানীর কুড়িল প্রগতি সরণির বসুন্ধরা গেটে ‘আবরার আহমেদ চৌধুরী ফুটওভারব্রিজ’ নির্মাণে চরম গাফিলতি ও ষড়যন্ত্র ভর করেছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেয়ার পর ৮ মাসেও শেষ হয়নি এর নির্মাণ কাজ।

উপরন্তু, আংশিক নির্মাণ করে উন্মুখ রাখা হয়েছে উপর ও নিচের দুই পথই। এরফলে যানবাহন যেমন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না, তেমনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথচারীরা আগের মতো বিক্ষিপ্তভাবে ব্যস্ততম সড়কটির ডিভাইডার (সড়ক বিভাজন) পার হচ্ছেন। পারাপার হতে গিয়ে প্রতিদিনই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে, আছে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফের যদি মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারের মতো নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে তার দায় কে নেবে? বরং এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। প্রশ্নবিদ্ধ হবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি। তাই যাদের চরম গাফিলতি ও অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফুটওভারব্রিজটি চালু করা সম্ভব হল না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। কেননা কাজের প্রতি সিরিয়াস থাকলে ১ মাসের মধ্যে এটি নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, শুধু সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুর রহমানের চরম শৈথিল্যের কারণে নির্মাণকাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। পুরো কাজ শেষ না করে এরই মধ্যে একমুখী সিঁড়ির মাধ্যমে জোড়াতালি দিয়ে চালু করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ফুটওভারব্রিজটি। এতে করে বেশি পথচারী উঠলে ব্রিজটি কাঁপতে থাকে। শুধু তাই নয়, আরিফুর রহমানের নির্দেশে ফুটওভারব্রিজটির পাশেই খুলে দেয়া হয়েছে পূর্বের জেব্রা ক্রসিং। এতে করে যে যার ইচ্ছেমতো উপর-নিচ দিয়ে পার হচ্ছেন।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ত সড়কটিতে যানবাহন তার স্বাভাবিক গতির খেই হারিয়ে ফেলছে। বিক্ষিপ্তভাবে পথচারীরাও পার হচ্ছেন অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে। কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ যেন অসহায়। সরেজমিন দেখলে মনে হবে যে কোনো সময় সেখানে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এ অবস্থায় জেব্রাক্রসিং লেন বন্ধ করা জরুরি হলেও বিষয়টি নিয়ে যেন কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।

ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করাসহ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান ওই চক্রের অন্যতম সদস্য। তাই ফ্লাইওভার নির্মাণে অযথা সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। বিষয়টিকে তিনি এক ধরনের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।

বসুন্ধরা গেট এলাকার জেব্রা ক্রসিংয়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন।

এ ঘটনার প্রতিবাদে এক রকম জনবিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনাস্থলে কয়েকদিন অবরোধ চলাসহ রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথ এক রকম অচল করে দেন। ১২ দফা দাবি নিয়ে তারা যূথবদ্ধ হয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বসুন্ধরা গেটে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি সামাল দেয়ার নানা উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে দাবি পূরণে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে তারা আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন।

সংকট নিরসণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীদের দাবি বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ২০ মার্চ আবরারের নামে বসুন্ধরা গেটে ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর করেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম।

এ সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াও উপস্থিত ছিলেন। ফুটওভারব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে মেয়র বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক আমাদের সবার দাবি। প্রধানমন্ত্রী এটির ব্যাপারে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আবরার আহমেদ চৌধুরী ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ শেষ হবে।’

ফ্লাইওভার নির্মাণসংক্রান্ত সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়া হয় ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুর রহমানকে। কিন্তু পদে পদে তার দায়িত্বে আবহেলার কারণে দীর্ঘদিনেও এর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।

শনিবার দুপুরে সরেজমিন কুড়িল প্রগতি সরণির বসুন্ধরা গেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফুটওভারব্রিজের পাশে জেব্রাক্রসিংসংলগ্ন সড়ক বিভাজনের স্টিলের বেড়া খুলে রাখা হয়েছে। কিছু অংশ বাঁশ দিয়ে আটকানো রয়েছে। পথচারীরা ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায়।

হাত উঁচিয়ে চলন্ত গাড়ি থামিয়ে হুড়মুড় গতিতে পারাপার হচ্ছেন রোড ডিভাইডার। ফলে যে উদ্দেশে এখানে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা ভেস্তে যেতে বসেছে। বিষয়টি নিয়ে যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা চরম ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। তাছাড়া প্রতি মুহূর্তে রয়েছে দুর্ঘটনার প্রবল আশঙ্কা।

কিন্তু কিছু ঘটে গেলে এর দায় কে নেবে? ঝরে যাবে আবার কোনো মূল্যবান জীবন। ঘাম ঝরা জীবন শেষ হবে রক্তে ভিজে। কিন্তু এমন মর্মান্তিক খবর আর শুনতে চান না কেউই। এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এদিকে দুপুর দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত ওই এলাকায় অবস্থান করলেও সেখানে কোনো ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি। চোখে পড়ে মূল সড়কের ওপর দিয়ে যে যার মতো রাস্তা পার হচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন নামের এক ফার্নিচার ব্যবসায়ী বলেন, ‘ফুটওভারব্রিজের সিঁড়ি একদিক দিয়ে। উভয় পাশ দিয়ে সিঁড়ি থাকলে আমাদের চলাচলে সুবিধা হতো। তাছাড়া নিচ দিয়ে যেহেতু রাস্তা খোলা আছে, তাহলে কষ্ট করে উপরে উঠব কেন?’ এসকে সিকিউরিটি সার্ভিসের নিরাপত্তাকর্মী মোতালেব বলেন, ‘যখন নিচ দিয়ে রাস্তা বন্ধ থাকে, তখন আমরা উপর দিয়ে যাই। নিচের রাস্তা খোলা থাকায় অনেকেইে সেখান দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দেখাদেখি আমিও যাচ্ছি।’ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সুমি জানান, ‘হাতে সময় কম। তাই শর্টকাট পথ ব্যবহার করছি।’

দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিল্লাল নামের এক পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়, তিনি নিজেই রোড ডিভাইডারের বাঁশের ওপর দিয়ে পার হচ্ছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বসুন্ধরা ট্রাফিক পুলিশ বক্সে কাজ করছি। পুলিশ বক্সে যাওয়ার সুবিধার্থে এদিক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছি।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এখানে লোকজনের অনেক চাপ। এত মানুষের চাপ ফুটওভারব্রিজ নিতে পারে না। তাই কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেব্রাক্রসিংয়ের রাস্তা খুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু একেবারে খুলে দিলে লোকজনের ভিড় বেড়ে যায়। তখন যান চলাচল চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। তাই রাস্তা খুলে দেয়া হলেও কিছুটা বাঁশ দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে।’

বুসন্ধরা পুলিশ বক্সে (ট্রাফিক) গিয়ে কথা হয় ট্রাফিক সার্জেন্ট জালাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ফুটওভারব্রিজ তৈরি হলেও সেটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। চলতি মাসের শুরুতে উদ্বোধন হওয়ার কথা থাকলেও কাজ শেষ হয়নি। সেখানে চলন্ত সিঁড়ি লাগানোর কথা থাকলেও তা এখনও হয়নি। মানুষজন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় অর্ধনির্মিত ফুটওভারব্রিজ দিয়ে চলাচল করছিল। অধিক মানুষের চাপে ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিজের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে রোড ডিভাইডার খুলে দেয়া হয়েছে।’

স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পরিদর্শক বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘জেব্রাক্রসিংটি মূলত খুলেছে সিটি কর্পোরেশন। ফুটওভারব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি সংযুক্ত কারার আগ পর্যন্ত এটি খেলা থাকবে। এ কারণে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হচ্ছে।’

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘ফুটওভারব্রিজের জন্য ইউরোপ থেকে চলন্ত সিঁড়ি আনা হচ্ছে। চলন্ত সিঁড়ির শিপমেন্ট (জাহাজীকরণ) হবে ২২ নভেম্বর। সেটি দেশে এসে পৌঁছলে ব্রিজের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এরপর ফুটওভারব্রিজের পাশের জেব্রাক্রসিং বন্ধ করে দেয়া হবে।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×