মমতার সঙ্গে বৈঠকের পর শেখ হাসিনা : অটুট থাকবে দু’দেশের সম্পর্ক

ঘণ্টা বাজিয়ে গোলাপি বলের টেস্ট উদ্বোধন

  কৃষ্ণকুমার দাস, কলকাতা থেকে ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কলকাতা ইডেন গার্ডেন মাঠে ঘণ্টা বাজিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক দিবারাত্রির টেস্ট ম্যাচ উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
কলকাতা ইডেন গার্ডেন মাঠে ঘণ্টা বাজিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক দিবারাত্রির টেস্ট ম্যাচ উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ-ভারতের প্রথম দিন-রাতের ম্যাচ ঘণ্টা বাজিয়ে উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কলকাতার ইডেন গার্ডেন স্টেডিয়ামে শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে এ ঐতিহাসিক টেস্টের সূচনা করেন তারা।

পরে সন্ধ্যায় দুই নেত্রী একান্তে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। তখন এক কোটি বাংলাদেশিকে ভারতবাসী আশ্রয় দিয়েছিল। তাই প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রতি আমাদের বিশেষ কৃতজ্ঞতা রয়েছে। আমরা পাশাপাশি থাকি, দু’দেশের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব রয়েছে। এ সম্পর্ক আরও অটুট ও নিবিড় হবে বলে আমার বিশ্বাস।’

মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘কথা হয়েছে ঘরোয়া পরিবেশে। দুই দেশের নানা বিষয় নিয়ে সৌজন্যমূলক আলোচনা হয়েছে। ওনাকে ফের কলকাতায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি।’

খেলার মাঠেই মমতার সঙ্গে দু’দফায় দেখা ও কথা হয়েছিল শেখ হাসিনার। পরে সন্ধ্যায় মোট ৫৪ মিনিট বৈঠক হয়।

এর ২৯ মিনিট রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ছিলেন দুই নেত্রী। এর আগে ২৫ মিনিটের যে বৈঠক হয় সেখানে উপস্থিত ছিলেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন, প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাস এবং পশ্চিমবঙ্গের পুরমন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন। তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি পারস্পরিক স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তিনি (মমতা) বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বাইসাইকেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গে সাইকেল রফতানির এ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে।’ মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে দুটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা যৌথভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাইসাইকেলের কারখানা স্থাপন করতে পারেন। তার সরকার এ ব্যাপারে জমি বরাদ্দ দেবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের কারখানা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে স্থাপন করতে পারে। এতে পরিবহন খরচ অনেকটাই কমে যাবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্পকারখানার ওপর সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। মমতা ব্যানার্জি প্রধানমন্ত্রীকে তাদের সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি সম্পর্কে জানান।

তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। মমতাকে প্রধানমন্ত্রী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির বিষয়ে জানান। তিনি দেশে শিক্ষা খাতের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে এলে দুই নেত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয় তিস্তার পানিবণ্টন, পাসপোর্ট সরলীকরণ, সীমান্ত বাণিজ্য বা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কিনা। বিশেষ করে প্রায় সব সাংবাদিকেরই প্রশ্ন ছিল- ‘তিস্তা নিয়ে কী কথা হয়েছে?’।

এ প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন দুই নেত্রীই। তবে ক্রিকেট নিয়ে সহাস্য ছিলেন শেখ হাসিনা।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বাঙালি সভাপতির প্রশংসা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘সৌরভের আমন্ত্রণে কলকাতায় এসেছি। কিন্তু ক্রিকেট খেলায় আজ আমাদের টিম মাঠে খুব একটা ভালো করতে পারেনি। আমরা আগামী দিনে আরও ভালো খেলার চেষ্টা করব।’

একটি সূত্রের দাবি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মমতাকে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। আগামী বছর এ কর্মসূচি শুরু হবে।

গোলাপি টেস্ট : শেখ হাসিনা ও মমতা যখন ঘণ্টা বাজিয়ে ঐতিহাসিক টেস্টের উদ্বোধন করেন তখন পাশে ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানও এ সময় সেখানে ছিলেন।

এছাড়াও ছিলেন- সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ও বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের খেলোয়াড়রাও। শচীন টেন্ডুলকার, কপিল দেব, ভিভিএস লক্ষ্মণের মতো ক্রিকেটাররাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

পরে সৌরভ বলেন, ‘উপমহাদেশের এই ঐতিহাসিক ম্যাচ দুই বাংলার দুই শীর্ষ নেত্রীর হাত দিয়ে সূচনা হওয়াটা একটা মাইলস্টোন।

এ মুহূর্তটা আমাদের সবার কাছে খুবই গর্বের।’ আর শেখ হাসিনা-মমতাকে মাঠে পেয়ে খুশি ছিলেন শচীনের মতো তারকাও।

৮৫ বছরের পুরনো ইডেন গার্ডেনে শেখ হাসিনা প্রবেশ করেন দুপুর সাড়ে ১২টায়। সেখানে তাকে বরণ করে নেন মমতা ও সৌরভ। মাঠে ঢুকেই শেখ হাসিনা প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের উদ্দেশে হাত নাড়েন।

তখনই করতালি দিয়ে সবাই বঙ্গবন্ধুকন্যাকে স্বাগত জানান। এ ম্যাচ ও পরিবেশ নিয়ে আবেগাপ্লুত ছিলেন তিনি।

বিশেষ করে উপমহাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তার হাত দিয়ে এমন ঐতিহাসিক ম্যাচ শুরু হওয়ায় তিনি ছিলেন খোশমেজাজে। তবে পরে মুমিনুলরা ভালো খেলতে না পারার হতাশা তিনি লুকাতে পারেননি।

দুটি আলাদা সিংহাসনে বসানো হয় দুই নেত্রীকে। পাশের চেয়ারে বসেন কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার ও বিসিসিআই সচিব জয় শা।

দুই নেত্রীর সম্মতি নিয়েই সোনার কয়েনের টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মুমিনুল হক।

খেলা শুরুর আগে মাঠে গিয়েই দু’দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে পরিচিত হন শেখ হাসিনা ও মমতা। পরে ক্লাব হাউসের ভিআইপি বক্সে বসে খেলা দেখেন প্রধানমন্ত্রী।

তার পাশে বসেছিলেন শচীন টেন্ডুলকার ও সৌরভ গাঙ্গুলী। এরপর ইডেনের ক্লাব হাউসেই মধ্যাহ্নভোজ সারেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। তখন মমতার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথাও হয়।

গোলাপি ম্যাচে দ্বিতীয়বার রাত ৮টা নাগাদ মাঠে আসেন হাসিনা ও মমতা। ততক্ষণে মাঠ মাতিয়ে দিয়েছেন দুই দেশের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়করা। আলাদা গাড়িতে মাঠে ঘুরেছেন শচীন, আজাহার, কপিলরা।

পাশের গাড়িতে ছিলেন ব্যাডমিন্টন তারকা পিভি সিন্ধু, গোপীচাঁদ, বক্সিং বিশ্বজয়ী মেরি কম। প্রথমে শেখ হাসিনাকে বিশেষ উপহার তুলে দেন স্বয়ং সৌরভ গাঙ্গুলী। মমতা দেন বঙ্গবন্ধুর একটি প্রতিকৃতি।

সবচেয়ে বড় কথা শচীন, কপিল, লক্ষ্মণ, হরভজন, সিন্ধু, সানিয়া মির্জা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক রফিক, নোবেল, আকরামদের সংবর্ধনা দেন স্বয়ং শেখ হাসিনা।

মমতাও বেশ কিছু উপহার তুলে দেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়কদের। এদিন মাঠে সংগীত পরিবেশন করেন রুনা লায়লা।

ঘড়িতে তখন ভারতীয় সময় ৯টার ঘর পেরিয়েছে। শেখ হাসিনা যখন গাড়িতে উঠতে যাবেন, মমতা এগিয়ে এসে বললেন আবার আসবেন। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যার উত্তর- নিশ্চয়ই। তুমিও এসো।

মমতার আবেগদীপ্ত উত্তর- আপনি যখনই ডাকবেন, তখনই চলে যাব। ততক্ষণে শেখ হাসিনার গাড়ির কাছে পৌঁছে গেছেন সৌরভ এবং শচীন।

সৌরভকে কাছে টেনে, মাথায় হাত বুলিয়ে মায়ের মতো আশীর্বাদ করলেন শেখ হাসিনা। আমন্ত্রণ জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি।

কিন্তু এবার সবাইকে চমকে দিয়ে শেখ হাসিনার পায়ে হাত দিয়ে সালাম জানালেন কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার।

আবেগাপ্লুত হাসিনা তাকেও কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এমন মমতাভরা আচরণে সবাই তখন মুগ্ধ।

বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে কলকাতার স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

ফিরহাদ হাকিম, সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, রিভা গাঙ্গুলী দাস ও সৌরভ গাঙ্গুলী বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। পরে প্রধানমন্ত্রীকে মোটর শোভাযাত্রাসহ কলকাতার হোটেল তাজ বেঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী রাত ১০টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। ফ্লাইটটি রাত ১২টায় ঢাকায় হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×