সাত ক্যাসিনো কারবারির অবৈধ অর্জন: ৪২৬ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক

সম্রাটসহ আরও অন্তত ১০ জনের সম্পদ ক্রোক প্রক্রিয়াধীন * ১৭৮ জনের তালিকা নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান চলছে

  হাসিব বিন শহিদ ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

অবৈধ ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত সাত কারবারির ৪২৬ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ কেএম ইমরুল কায়েশ এ আদেশ দেন।

এর আগে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত অন্তত ২০ জনের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জনের মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে (ঢাকা-১) এসব মামলা হয়।

এদের মধ্যে জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, কাজী আনিছুর রহমান, এনামুল হক এনু, রুপন ভূঁইয়া ও সেলিম প্রধানের সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজের আদেশ দেয়া হয়। এদের সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের জন্য দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে আবেদন করেন।

আইনজীবীরা বলছেন, এ আদেশের মাধ্যমে তদন্ত চলাকালে আসামিদের সম্পদ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরে যে শঙ্কা ছিল, তা বন্ধ হয়ে গেল। এছাড়া তদন্ত পর্যায়ে যদি আসামিদের আরও অবৈধ সম্পদের খোঁজ মেলে, তখন আদালতের অনুমতি নিয়ে তা ক্রোক ও ফ্রিজ করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, অবৈধ সম্পদধারীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। এছাড়া মামলার তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তারা সম্পদ ক্রোকের আবেদনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তবে দুদক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মো. মফিজুর রহমান ভূঞা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ।

যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘তদন্তাধীন মামলার বিষয়ে মন্তব্য না করাই উত্তম।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট দুদকের একাধিক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ক্যাসিনোকাণ্ডে দুই দফায় ১৭৮ জনের তালিকা ধরে অনুসন্ধান চলছে। এর মধ্যে রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়েছে। ওইসব মামলায় আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়।

আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ইতিমধ্যে জি কে শামীমসহ কয়েকজনের সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন। এছাড়া অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট ও তার সহযোগী এনামুল হক আরমানসহ অন্তত ১০ জনের সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের বিষয় প্রক্রিয়াধীন।

জি কে শামীমের ৩৬৫ কোটি টাকার সম্পদ : প্রভাবশালী ঠিকাদার জি কে শামীমের ৪০ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোকের আদেশ ছাড়াও আদালত তার বিভিন্ন ব্যাংকে জমা প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন।

আদালত জি কে শামীমের স্থাবর সম্পদের মধ্যে ১২টি বাড়ি ও জমি ক্রোকের আদেশ দেন। বাড়িগুলো হচ্ছে- ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীর মেরাদিয়া মৌজার ৫৭৭ অযুতাংশ জমি ও স্থাপনা (দলিলমূল্য সাড়ে ৩ লাখ টাকা), সবুজবাগ থানার রাজারবাগ মৌজার ৬১৮ অযুতাংশ জমিসহ ডেভেলপার হিসাবে চুক্তিমূলে ১৪ কাঠা জমির ওপর সুউচ্চ ভবন (মূল্য ১০ কোটি টাকা), দক্ষিণ বাসাবোতে ৫৩২ অযুতাংশ জমি ও স্থাপনা (মূল্য ৫ কোটি টাকা), খিলগাঁওয়ে ৬৬০ অযুতাংশ জমিতে বাড়ি (মূল্য ৫৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা), উত্তর মাদারটেকে ৫৭৭ অযুতাংশ জমি ও স্থাপনা (মূল্য ১ কোটি ৯ লাখ টাকা), বাড্ডা থানার আফতাবনগর হাউজিং প্রকল্পে ৭৭৪ অযুতাংশ জমি ও স্থাপনা (মূল্য ১ কোটি ৫৭ লাখ ৫৭ হাজার ২০০ টাকা), একই স্থানে আরেকটি ৫৭৭ অযুতাংশ জমি (মূল্য ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা), বাড্ডা মৌজায় ৭৭৮ অযুতাংশের জমি (মূল্য ২৩ লাখ টাকা), সবুজবাগ থানার দক্ষিণগাঁও মৌজায় ১ হাজার অযুতাংশ জমি (মূল্য ৩০ লাখ টাকা), মোহাম্মদপুর থানার রামচন্দ্রপুর মৌজায় ৮০৮ অযুতাংশ জমি (মূল্য ১ কোটি টাকা), গুলশানের নিকেতনে ৫ কাঠা জমির ওপর ট্রিপ্লেক্স বাড়ি (মূল্য ১০ কোটি টাকা) এবং একই এলাকায় ৫ কাঠা জমির ওপর ৪ তলা বাড়ি (মূল্য ১০ কোটি টাকা)।

এছাড়া তার ১৯ ব্যাংকের ১৫২টি হিসাবে ৩২৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৮ হাজার ৭৩৫ টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। অবৈধভাবে ২৯৭ কোটি ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২১ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন।

খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ৩৩ কোটি টাকার সম্পদ : ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ৩ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি ক্রোক এবং বিভিন্ন ব্যাংকে সাড়ে ৩১ কোটি টাকা ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালত তার গুলশান-২ এর ৫৯ নম্বর সড়কে ৪ নম্বর বাড়ির ৩৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটটি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন। এছাড়া ১৭টি ব্যাংক হিসাবে তার জমা ৩১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৫ টাকা ফ্রিজের আদেশ দেয়া হয়েছে। ২১ অক্টোবর অবৈধভাবে ৫ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম।

লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার ৩ কোটি টাকা : বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার ব্যাংকে জমা ৩ কোটি টাকা ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আদালত তার বিভিন্ন ব্যাংকের ১৭টি হিসাবে জমা ২ কোটি ৯৬ লাখ ২৮ হাজার ৯৮৪ টাকা ফ্রিজের এ আদেশ দেন।

অবৈধভাবে ৪ কোটি ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ৬৪৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২৭ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম।

কাজী আনিছুর রহমানের ৬ কোটি টাকা : যুবলীগের বহিষ্কৃত দফতর সম্পাদক কাজী আনিছুর রহমানের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা ৬ কোটি টাকা ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালত তার ৩৩টি ব্যাংক হিসাবে জমা ৬ কোটি ২১ লাখ ২ হাজার ৮১৮ টাকা ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন। অবৈধভাবে ১২ কোটি ৮০ লাখ ৬০ হাজার ৯২০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২৯ অক্টোবর দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে মামলা করেন।

এনামুল হক এনুর ১০ কোটি টাকা ফ্রিজ : গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনুর বিভিন্ন ব্যাংকে জমা ১০ কোটি টাকা ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালত আসামির ৩১টি ব্যাংক হিসাবে থাকা ১০ কোটিা ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬৫ টাকা ফ্রিজের আদেশ দেন। অবৈধভাবে ২১ কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ।

রুপন ভূঁইয়ার প্রায় ৯ কোটি টাকা : গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক রুপন ভূঁইয়ার বিভিন্ন ব্যাংকে জমা প্রায় ৯ কোটি টাকা ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালত আসামির ৩৫টি ব্যাংক হিসাবে জমা ৮ কোটি ৭৩ লাখ ৯৭ হাজার ১০১ টাকা ফ্রিজের আদেশ দেন। অবৈধভাবে ১৪ কোটি ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৮৮২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নেয়ামুল আহসান গাজী।

সেলিম প্রধানের ২৯ লাখ টাকা : বাংলাদেশে অনলাইন ক্যাসিনোর মূল হোতা মো. সেলিম প্রধানের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা প্রায় ২৯ লাখ টাকা ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালত আসামির বিভিন্ন ব্যাংকের ২৬টি হিসাবে জমা ২৮ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮৫ টাকা ফ্রিজের এ আদেশ দেন। অবৈধভাবে ১২ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ৭৫৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২৭ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান।

ঘটনাপ্রবাহ : ক্যাসিনোয় অভিযান

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত