হেগে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার শুরু, অন্তর্বর্তী আদেশ চায় গাম্বিয়া
jugantor
হেগে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার শুরু, অন্তর্বর্তী আদেশ চায় গাম্বিয়া
নিষ্ঠুরতার রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়ার সময় নির্লিপ্ত সু চি * আইসিজেতে আজ বক্তব্য দেবে মিয়ানমার * ন্যায়বিচারের দাবিতে পিস প্যালেসের বাইরে বিক্ষোভ * ফেসবুকে ‘ফেক রেপ’ নামে পেজ খোলে সু চির দফতর * গণহত্যার দায় স্বীকারে সু চির প্রতি নোবেলজয়ীদের আহ্বান * গণহত্যা বন্ধে বিশ্ব ব্যর্থ হওয়ায় আদালতে গাম্বিয়া

  মাসুদ করিম ও শাহনেওয়াজ খান  

১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতার ঐতিহাসিক বিচার নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজে’ (আইসিজে) এ সংক্রান্ত মামলার প্রথম দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

পিস প্যালেসে বিচারকদের সামনে বাদীপক্ষ গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ঘৃণ্যতম গণহত্যার অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি নির্লিপ্ত ছিলেন।

গাম্বিয়া অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যাসহ সব ধরনের দমন-পীড়ন বন্ধে অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে আদালতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।

শুনানি চলাকালে দেশটির পক্ষে ছয় আইনজীবী জাতিসংঘ গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন।

আন্তর্জাতিক বিচার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারকে রাজনীতিকীকরণের লক্ষ্যে মিয়ানমারের শীর্ষ বেসামরিক নেত্রী সু চি দ্য হেগে গেছেন, যা তার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।

এর আগে গণহত্যার পক্ষে সাফাই গাইতে আইসিজেতে সু চি হাজির হওয়ায় ঘৃণা প্রকাশ করেছেন শান্তিতে আট নোবেলজয়ী। এক বিবৃতিতে তারা রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি জনসম্মুখে স্বীকার করে নিতে সু চির প্রতি আহ্বান জানান।

শুনানি চলাকালে পিস প্যালেসের বাইরে শত শত রোহিঙ্গা ন্যায়বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। ওই সময়ে কক্সবাজারে ক্যাম্পেও রোহিঙ্গা ‘গাম্বিয়া, গাম্বিয়া’ স্লোগান তোলে।

অপরদিকে, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকার সমর্থকরা র‌্যালিতে নেমে সু চির পক্ষে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

দ্য হেগের স্থানীয় সময় সকালে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রোহিঙ্গা এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শুনানি শুরু হয়।

শুরুতে আইসিজের প্রেসিডেন্ট আবদুল কোয়াই আহমেদ ইউসুফ শুনানির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিচারকক্ষে উপস্থিতদের অবহিত করেন।

গাম্বিয়ার প্রস্তাবের পক্ষে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই এবং মিয়ানমারের ক্লাউস ক্রেসকে এডহক বিচারপতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এডহক বিচারপতিদের শপথের মধ্য দিয়ে শুনানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর পর আইসিজের রেজিস্ট্রার ফিলিপ গোতিয়ে অন্তর্র্বর্তী পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে গাম্বিয়া আবেদনে যা বলেছে তা পড়ে শোনান।

তিনি মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আবেদনের পক্ষে কারা কী বিষয়ে কথা বলবেন তা তুলে ধরেন।

আদালতে গাম্বিয়ার পক্ষে শুনানি করেন দেশটির আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, সারা বিশ্ব কেন এখন নীরব দর্শক?

কেন আমাদের জীবদ্দশাতে এটা আমরা ঘটতে দিচ্ছি? সবাই মনে করে এখানে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। আসলে এখানে বিচার চলছে আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার।

গণহত্যা বন্ধে বিশ্ব ব্যর্থ হওয়ায় গাম্বিয়া আদালতে আসতে বাধ্য হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আরও বলেন, আপনারা মিয়ানমারকে এই কাণ্ডজ্ঞানহীন হতাযজ্ঞ বন্ধ করতে বলুন।

এই বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা আমাদের অনবরত শোকাহত করছে। মিয়ানমারকে তার নিজের জনগণের ওপর গণহত্যা চালানো বন্ধ করতে বলুন।

গত ১১ নভেম্বর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে মামলা করে গাম্বিয়া। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের হত্যাযজ্ঞের পর এ মামলা প্রথম আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ।

এ মামলায় আজ দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি হবে। এদিন মিয়ানমারের পক্ষে সু চি বক্তব্য দেবেন। আগামীকাল দু’দেশের প্রতিনিধিরা আদালতের সামনে যুক্তি-পাল্টাযুক্তি উপস্থাপন করবেন।

অন্তর্বর্তী আদেশের অনুরোধকালে গাম্বিয়া বেশকিছু বিষয় উল্লেখ করে এসব অবিলম্বে বন্ধ করার অনুরোধ জানায়।

বিষয়গুলো হচ্ছে- বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা অন্য কোনো ধরনের যৌন সহিংসতা, বাড়ি কিংবা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া, ভূমি ও পশু ধ্বংস, খাদ্য ও জীবিকায়ন, অন্য কোনোভাবে জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন কর্মকাণ্ড।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর এসব বন্ধে আদেশ দেয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়।

এরপর রাখাইনে গণহত্যা নিয়ে কথা বলেন বিশ্বখ্যাত আইনজ্ঞ অধ্যাপক পায়াম আখাভান। তিনি বলেন, মঙ্গলবার গণহত্যা সনদের ৭০তম বার্ষিকী ছিল।

কিন্তু এই সনদের আলোকে গণহত্যা বন্ধ হয়নি। গণহত্যার সনদ কীভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেটা তুলে ধরেন তিনি। জাতিসংঘ তদন্তকারীরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোয় রাষ্ট্রীয় ভূমিকার কথা বলেন।

তদন্তে গণহারে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার প্রমাণ মিলেছে, যা সনদের লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী তাফাদজ পাসিপান্দো বলেছেন, রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণের কথা অস্বীকার করতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি বলেছেন, সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কেউ নোংরা বাঙালি মেয়েকে ছোঁবে না।

এই আইনজীবী বলেন, ফেসবুকে ‘ফেক রেপ’ নামে যে পেজ খোলা হয়েছে, সেটির নিয়ন্ত্রণও হচ্ছে স্টেট কাউন্সেলরের দফতর থেকে। তিনি আদালতের কাছে আরাকানে এখনও যে ৬ লাখ রোহিঙ্গা আছেন, তাদের দুর্ভোগ ও ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন।

রোহিঙ্গাদের কাঁটাতারের বেষ্টনীর মধ্যে শিবিরে আটকে রাখা, চলাচলের স্বাধীনতা খর্ব ও অন্যান্য বিধিনিষেধের কথা, যা জাতিসংঘ তদন্তে উঠে এসেছে, সেগুলোর বিবরণ দেন। এগুলো গণহত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে সনদের লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী অ্যান্ড্রু লোয়েনস্টেইন যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মিয়ানমারের জনমিতি গঠন (ডেমোক্রাফিক) পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেক আইনজীবী আরসালান সুলেমান আইসিজের এখতিয়ার বিষয়ে আদালতের বিধিমালার ৪১(১) উদ্ধৃত করেন। আইসিজের এই মামলা যুগান্তকারী দুটি কারণে।

প্রথমত, প্রতিবেশী না হয়েও বৈশ্বিক সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে মিয়ানমার থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরের আরেকটি উপমহাদেশ আফ্রিকার রাষ্ট্র গাম্বিয়া এই মামলার বাদী।

দ্বিতীয়ত, এই প্রথম মানবাধিকারের লড়াইয়ের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একজন রাজনীতিক গণহত্যার সাফাই দিতে হাজির হয়েছেন শান্তি প্রাসাদে।

গাম্বিয়ার পক্ষে ষষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে রাইখলার মিয়ানমারের বিভিন্ন জায়গায় সু চির সঙ্গে তিনজন জেনারেলের হাস্যোজ্জ্বল ছবি সংবলিত ফেস্টুনের ছবি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, এই প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল তাদের (সেনাবাহিনী ও সু চি) অর্জন (রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে) দেখানো। তিনি মিয়ানমারের নিজস্ব তদন্তকে  লোক দেখানো বলে উল্লেখ করে বলেন, এই তদন্তের লক্ষ্য হচ্ছে গণহত্যার ঘটনা অস্বীকার করা।

মিয়ানমারের পক্ষে সু চি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি আজ জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি গণহত্যার কথা আগের মতোই অস্বীকার করবেন।

বরাবরের মতোই তার ভাষায় রোহিঙ্গা ‘জঙ্গিদের’ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক পদক্ষেপের অধিকার রয়েছে বলে উল্লেখ করতে পারেন। সু চি মোটর শোভাযাত্রায় হেগের পিস প্যালেসে পৌঁছার পর সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি।

আদালতে গাম্বিয়ার প্রতিনিধি দল নিষ্ঠুরতার রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়ার সময় মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নির্লিপ্ত বসেছিলেন।

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের শুনানি ঘিরে সবার দৃষ্টি এখন হেগের পিস প্যালেসের দিকে। বিচারে নির্যাতনকারীদের পক্ষ নেয়ায় অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েছেন সু চি।

বিশ্বের বিবেকবান মানুষের আহ্বানকে পাশ কাটিয়ে গণহত্যার পক্ষে নিজেই শুনানিতে অংশ নেয়ায় সমালোচনার ঝড় বইছে।

২০২০ সালে মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে সেনাবাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণসহ সব ধরনের দমন-পীড়নের দায়ভারও তাকেই কাঁধে নিতে হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামাল দিতে সু চি গণহত্যা অস্বীকার করছেন। দেশের ভেতর অনেকটা শোডাউন করে হেগে গেছেন।

চাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেন হার্বের বিচারের সময়ে জুরির দায়িত্ব পালনকারী ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টের কমিশনার রিড ব্রডি আলজাজিরাকে বলেছেন, আইসিজেতে আইনি আদালতে সু চির মতো একজন রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্ব দেয়া নজিরবিহীন।

আইনগতভাবে এটা সু চির জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। কেননা তিনি মামলাটিকে রাজনীতিকরণ করছেন।

গাম্বিয়ার মামলা দায়ের : পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছোট দেশ গাম্বিয়া ১১ নভেম্বর আইসিজিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করে।

সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে রাখাইনে গণহত্যা, ধর্ষণসহ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে ওই মামলায়।

আইসিজে গাম্বিয়ার মামলার শুনানির জন্য ১০ ডিসেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর সময় নির্ধারণ করে। গত ২১ নভেম্বর সু চি ঘোষণা দেন, আন্তর্জাতিক আদালতে তিনি মিয়ানমারের আইনি দলের নেতৃত্ব দেবেন।

দেশটির পক্ষে আইনজীবী হিসেবে আছেন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে অভিজ্ঞ কানাডার স্যার উইলিয়াম এ শাহবাস। কসভোতেও গণহত্যার পক্ষে আইনি লড়াই করে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি।

মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ ও বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক বার্তা সম্পাদক ল্যারি জ্যাগান ব্যাংকক পোস্টে এক নিবন্ধে লিখেছেন, মিয়ানমারের আইনি দলের প্রধান হিসেবে যুক্ত হয়েছেন অধ্যাপক শাহবাস।

এছাড়া মিয়ানমারের অ্যাটর্নি জেনারেল তুন তুন ও, দুই জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক দুই আইনজীবী যুক্ত আছেন ওই দলে।

অপরদিকে গাম্বিয়ার পক্ষে মামলাটির প্রতিনিধিত্ব করা আবুবকর মারি তামবাদুর রুয়ান্ডা গণহত্যা মামলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের পক্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনি ফার্ম ফলি হক।

এই ফার্ম মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নিয়েছিল। আইসিজেতে শুনানিতে সরাসরি কোনো পক্ষ না হলেও গাম্বিয়াকে লজিস্টিক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ।

এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদুল হক এক প্রতিনিধি দল নিয়ে হেগে রয়েছেন। ২০ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া তিন রোহিঙ্গা, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিকেও রাখা হয়েছে।

ঢাকায় একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক যুগান্তরকে বলেছেন, সু চি নিজেই গণহত্যার পক্ষে মামলা লড়তে যাচ্ছেন শুনে প্রথমেই আমি চমকে উঠেছিলাম।

শান্তিতে নোবেল পেয়ে তিনি কীভাবে এই কাজ করেন! মিয়ানমারে নির্বাচনের আগে তার দল এনএলডিকে (ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি) জয়ী করতে এমন তৎপরতা।

তবে ভোটের আগে মামলার রায় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আইসিজে চার বছরের মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি করেছে।

২৩ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে পাঁচ থেকে নয় বছরের মধ্যে এবং ছয় শতাংশ (মাত্র পাঁচটি) মামলার নিষ্পত্তি হয় ১০ বছর অথবা তার বেশি সময় পর।

প্রকৃতপক্ষে কত তাড়াতাড়ি রায় হবে সেটা নির্ভর করে মামলায় উভয়পক্ষের সক্রিয় সহযোগিতার ওপর।

রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর মামলায় গাম্বিয়া ও মিয়ানমার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে সক্রিয় থাকায় তার রায় পেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হবে না বলে আশা করা যায়।

রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার ব্যাপারে আইসিজে কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দেয় কিনা সে বিষয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের আগ্রহ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইসিজের বিচারকরা চাইলে আগামী মাসেই অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারেন।

এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়া, নাগরিকত্ব দেয়া, বৈষম্যমূলক আইন সংশোধন, মানবাধিকারকর্মীদের প্রবেশ নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ যে কোনো আদেশ দিতে পারেন।

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজ : আইসিজেতে ১৫ জন বিচারক রয়েছেন, যারা সাধারণ পরিষদ এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্বাধীন ভোটের মাধ্যমে নয় বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত।

পাঁচটি পদ প্রতি তিনবছর অন্তর অন্তর নবায়ন করা হয়। আদালতের প্রতিটি সদস্যকে ভিন্ন ভিন্ন দেশের হতে হবে। তারা তাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তারা প্রত্যেকে স্বাধীন বিচারক।

বিচারকদের পাঁচটি আসনে রয়েছেন পশ্চিম ইউরোপ এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের বিচারকগণ; আফ্রিকা থেকে তিনজন বিচারক; এশিয়া থেকে তিনজন; পূর্ব ইউরোপ থেকে দু’জন এবং লাতিন আমেরিকা থেকে দু’জন বিচারক রয়েছেন লিখিত বক্তব্য ও মৌখিক শুনানিতে প্রশ্ন করবেন।

শুনানি শেষে ছয় মাসের মধ্যে বিচারকগণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রায় নির্ধারণ করবেন এবং প্রকাশ্যে তা ঘোষণা করবেন। আইসিজে রায় দেয়ার পর তার কোনো আপিলের সুযোগ নেই।

ফলে এই রায় চূড়ান্ত। আইসিজের আদেশ মানতে সব পক্ষই বাধ্য। পাশাপাশি আদালতের সব আদেশের কপি পাঠানো হবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।

জড়িত কোনো রাষ্ট্র যদি আদেশ পালন না করে তবে অপর পক্ষের রাষ্ট্রটি চাইলে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে প্রতিকার চাইতে পারে। জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে মিয়ানমারকে। পাশাপাশি রায় না মানলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

মিয়ানমারের চার সেনা কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা : রোহিঙ্গাসহ সংখ্যালঘুদের নিপীড়নের দায়ে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ চার সামরিক কর্মকর্তার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

রয়টার্স বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট মঙ্গলবার তাদের কালো তালিকাভুক্ত করে। তারা হলেন- মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং, সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ভাইস সিনিয়র জেনারেল সোয়ে উইন, ৯৯ লাইট ইনফানট্রি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থান ও এবং ৩৩ লাইট ইনফানট্রি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অং অং। এর আগেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

 

হেগে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার শুরু, অন্তর্বর্তী আদেশ চায় গাম্বিয়া

নিষ্ঠুরতার রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়ার সময় নির্লিপ্ত সু চি * আইসিজেতে আজ বক্তব্য দেবে মিয়ানমার * ন্যায়বিচারের দাবিতে পিস প্যালেসের বাইরে বিক্ষোভ * ফেসবুকে ‘ফেক রেপ’ নামে পেজ খোলে সু চির দফতর * গণহত্যার দায় স্বীকারে সু চির প্রতি নোবেলজয়ীদের আহ্বান * গণহত্যা বন্ধে বিশ্ব ব্যর্থ হওয়ায় আদালতে গাম্বিয়া
 মাসুদ করিম ও শাহনেওয়াজ খান 
১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতার ঐতিহাসিক বিচার নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজে’ (আইসিজে) এ সংক্রান্ত মামলার প্রথম দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

পিস প্যালেসে বিচারকদের সামনে বাদীপক্ষ গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ঘৃণ্যতম গণহত্যার অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি নির্লিপ্ত ছিলেন।

গাম্বিয়া অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যাসহ সব ধরনের দমন-পীড়ন বন্ধে অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে আদালতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।

শুনানি চলাকালে দেশটির পক্ষে ছয় আইনজীবী জাতিসংঘ গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন।

আন্তর্জাতিক বিচার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারকে রাজনীতিকীকরণের লক্ষ্যে মিয়ানমারের শীর্ষ বেসামরিক নেত্রী সু চি দ্য হেগে গেছেন, যা তার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।

এর আগে গণহত্যার পক্ষে সাফাই গাইতে আইসিজেতে সু চি হাজির হওয়ায় ঘৃণা প্রকাশ করেছেন শান্তিতে আট নোবেলজয়ী। এক বিবৃতিতে তারা রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি জনসম্মুখে স্বীকার করে নিতে সু চির প্রতি আহ্বান জানান।

শুনানি চলাকালে পিস প্যালেসের বাইরে শত শত রোহিঙ্গা ন্যায়বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। ওই সময়ে কক্সবাজারে ক্যাম্পেও রোহিঙ্গা ‘গাম্বিয়া, গাম্বিয়া’ স্লোগান তোলে।

অপরদিকে, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকার সমর্থকরা র‌্যালিতে নেমে সু চির পক্ষে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

দ্য হেগের স্থানীয় সময় সকালে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রোহিঙ্গা এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শুনানি শুরু হয়।

শুরুতে আইসিজের প্রেসিডেন্ট আবদুল কোয়াই আহমেদ ইউসুফ শুনানির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিচারকক্ষে উপস্থিতদের অবহিত করেন।

গাম্বিয়ার প্রস্তাবের পক্ষে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই এবং মিয়ানমারের ক্লাউস ক্রেসকে এডহক বিচারপতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এডহক বিচারপতিদের শপথের মধ্য দিয়ে শুনানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর পর আইসিজের রেজিস্ট্রার ফিলিপ গোতিয়ে অন্তর্র্বর্তী পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে গাম্বিয়া আবেদনে যা বলেছে তা পড়ে শোনান।

তিনি মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আবেদনের পক্ষে কারা কী বিষয়ে কথা বলবেন তা তুলে ধরেন।

আদালতে গাম্বিয়ার পক্ষে শুনানি করেন দেশটির আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, সারা বিশ্ব কেন এখন নীরব দর্শক?

কেন আমাদের জীবদ্দশাতে এটা আমরা ঘটতে দিচ্ছি? সবাই মনে করে এখানে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। আসলে এখানে বিচার চলছে আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার।

গণহত্যা বন্ধে বিশ্ব ব্যর্থ হওয়ায় গাম্বিয়া আদালতে আসতে বাধ্য হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আরও বলেন, আপনারা মিয়ানমারকে এই কাণ্ডজ্ঞানহীন হতাযজ্ঞ বন্ধ করতে বলুন।

এই বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা আমাদের অনবরত শোকাহত করছে। মিয়ানমারকে তার নিজের জনগণের ওপর গণহত্যা চালানো বন্ধ করতে বলুন।

গত ১১ নভেম্বর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে মামলা করে গাম্বিয়া। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের হত্যাযজ্ঞের পর এ মামলা প্রথম আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ।

এ মামলায় আজ দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি হবে। এদিন মিয়ানমারের পক্ষে সু চি বক্তব্য দেবেন। আগামীকাল দু’দেশের প্রতিনিধিরা আদালতের সামনে যুক্তি-পাল্টাযুক্তি উপস্থাপন করবেন।

অন্তর্বর্তী আদেশের অনুরোধকালে গাম্বিয়া বেশকিছু বিষয় উল্লেখ করে এসব অবিলম্বে বন্ধ করার অনুরোধ জানায়।

বিষয়গুলো হচ্ছে- বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা অন্য কোনো ধরনের যৌন সহিংসতা, বাড়ি কিংবা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া, ভূমি ও পশু ধ্বংস, খাদ্য ও জীবিকায়ন, অন্য কোনোভাবে জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন কর্মকাণ্ড।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর এসব বন্ধে আদেশ দেয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়।

এরপর রাখাইনে গণহত্যা নিয়ে কথা বলেন বিশ্বখ্যাত আইনজ্ঞ অধ্যাপক পায়াম আখাভান। তিনি বলেন, মঙ্গলবার গণহত্যা সনদের ৭০তম বার্ষিকী ছিল।

কিন্তু এই সনদের আলোকে গণহত্যা বন্ধ হয়নি। গণহত্যার সনদ কীভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেটা তুলে ধরেন তিনি। জাতিসংঘ তদন্তকারীরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোয় রাষ্ট্রীয় ভূমিকার কথা বলেন।

তদন্তে গণহারে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার প্রমাণ মিলেছে, যা সনদের লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী তাফাদজ পাসিপান্দো বলেছেন, রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণের কথা অস্বীকার করতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি বলেছেন, সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কেউ নোংরা বাঙালি মেয়েকে ছোঁবে না।

এই আইনজীবী বলেন, ফেসবুকে ‘ফেক রেপ’ নামে যে পেজ খোলা হয়েছে, সেটির নিয়ন্ত্রণও হচ্ছে স্টেট কাউন্সেলরের দফতর থেকে। তিনি আদালতের কাছে আরাকানে এখনও যে ৬ লাখ রোহিঙ্গা আছেন, তাদের দুর্ভোগ ও ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন।

রোহিঙ্গাদের কাঁটাতারের বেষ্টনীর মধ্যে শিবিরে আটকে রাখা, চলাচলের স্বাধীনতা খর্ব ও অন্যান্য বিধিনিষেধের কথা, যা জাতিসংঘ তদন্তে উঠে এসেছে, সেগুলোর বিবরণ দেন। এগুলো গণহত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে সনদের লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী অ্যান্ড্রু লোয়েনস্টেইন যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মিয়ানমারের জনমিতি গঠন (ডেমোক্রাফিক) পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেক আইনজীবী আরসালান সুলেমান আইসিজের এখতিয়ার বিষয়ে আদালতের বিধিমালার ৪১(১) উদ্ধৃত করেন। আইসিজের এই মামলা যুগান্তকারী দুটি কারণে।

প্রথমত, প্রতিবেশী না হয়েও বৈশ্বিক সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে মিয়ানমার থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরের আরেকটি উপমহাদেশ আফ্রিকার রাষ্ট্র গাম্বিয়া এই মামলার বাদী।

দ্বিতীয়ত, এই প্রথম মানবাধিকারের লড়াইয়ের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একজন রাজনীতিক গণহত্যার সাফাই দিতে হাজির হয়েছেন শান্তি প্রাসাদে।

গাম্বিয়ার পক্ষে ষষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে রাইখলার মিয়ানমারের বিভিন্ন জায়গায় সু চির সঙ্গে তিনজন জেনারেলের হাস্যোজ্জ্বল ছবি সংবলিত ফেস্টুনের ছবি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, এই প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল তাদের (সেনাবাহিনী ও সু চি) অর্জন (রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে) দেখানো। তিনি মিয়ানমারের নিজস্ব তদন্তকে লোক দেখানো বলে উল্লেখ করে বলেন, এই তদন্তের লক্ষ্য হচ্ছে গণহত্যার ঘটনা অস্বীকার করা।

মিয়ানমারের পক্ষে সু চি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি আজ জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি গণহত্যার কথা আগের মতোই অস্বীকার করবেন।

বরাবরের মতোই তার ভাষায় রোহিঙ্গা ‘জঙ্গিদের’ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক পদক্ষেপের অধিকার রয়েছে বলে উল্লেখ করতে পারেন। সু চি মোটর শোভাযাত্রায় হেগের পিস প্যালেসে পৌঁছার পর সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি।

আদালতে গাম্বিয়ার প্রতিনিধি দল নিষ্ঠুরতার রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়ার সময় মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নির্লিপ্ত বসেছিলেন।

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের শুনানি ঘিরে সবার দৃষ্টি এখন হেগের পিস প্যালেসের দিকে। বিচারে নির্যাতনকারীদের পক্ষ নেয়ায় অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েছেন সু চি।

বিশ্বের বিবেকবান মানুষের আহ্বানকে পাশ কাটিয়ে গণহত্যার পক্ষে নিজেই শুনানিতে অংশ নেয়ায় সমালোচনার ঝড় বইছে।

২০২০ সালে মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে সেনাবাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণসহ সব ধরনের দমন-পীড়নের দায়ভারও তাকেই কাঁধে নিতে হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামাল দিতে সু চি গণহত্যা অস্বীকার করছেন। দেশের ভেতর অনেকটা শোডাউন করে হেগে গেছেন।

চাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেন হার্বের বিচারের সময়ে জুরির দায়িত্ব পালনকারী ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টের কমিশনার রিড ব্রডি আলজাজিরাকে বলেছেন, আইসিজেতে আইনি আদালতে সু চির মতো একজন রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্ব দেয়া নজিরবিহীন।

আইনগতভাবে এটা সু চির জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। কেননা তিনি মামলাটিকে রাজনীতিকরণ করছেন।

গাম্বিয়ার মামলা দায়ের : পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছোট দেশ গাম্বিয়া ১১ নভেম্বর আইসিজিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করে।

সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে রাখাইনে গণহত্যা, ধর্ষণসহ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে ওই মামলায়।

আইসিজে গাম্বিয়ার মামলার শুনানির জন্য ১০ ডিসেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর সময় নির্ধারণ করে। গত ২১ নভেম্বর সু চি ঘোষণা দেন, আন্তর্জাতিক আদালতে তিনি মিয়ানমারের আইনি দলের নেতৃত্ব দেবেন।

দেশটির পক্ষে আইনজীবী হিসেবে আছেন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে অভিজ্ঞ কানাডার স্যার উইলিয়াম এ শাহবাস। কসভোতেও গণহত্যার পক্ষে আইনি লড়াই করে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি।

মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ ও বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক বার্তা সম্পাদক ল্যারি জ্যাগান ব্যাংকক পোস্টে এক নিবন্ধে লিখেছেন, মিয়ানমারের আইনি দলের প্রধান হিসেবে যুক্ত হয়েছেন অধ্যাপক শাহবাস।

এছাড়া মিয়ানমারের অ্যাটর্নি জেনারেল তুন তুন ও, দুই জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক দুই আইনজীবী যুক্ত আছেন ওই দলে।

অপরদিকে গাম্বিয়ার পক্ষে মামলাটির প্রতিনিধিত্ব করা আবুবকর মারি তামবাদুর রুয়ান্ডা গণহত্যা মামলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের পক্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনি ফার্ম ফলি হক।

এই ফার্ম মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নিয়েছিল। আইসিজেতে শুনানিতে সরাসরি কোনো পক্ষ না হলেও গাম্বিয়াকে লজিস্টিক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ।

এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদুল হক এক প্রতিনিধি দল নিয়ে হেগে রয়েছেন। ২০ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া তিন রোহিঙ্গা, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিকেও রাখা হয়েছে।

ঢাকায় একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক যুগান্তরকে বলেছেন, সু চি নিজেই গণহত্যার পক্ষে মামলা লড়তে যাচ্ছেন শুনে প্রথমেই আমি চমকে উঠেছিলাম।

শান্তিতে নোবেল পেয়ে তিনি কীভাবে এই কাজ করেন! মিয়ানমারে নির্বাচনের আগে তার দল এনএলডিকে (ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি) জয়ী করতে এমন তৎপরতা।

তবে ভোটের আগে মামলার রায় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আইসিজে চার বছরের মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি করেছে।

২৩ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে পাঁচ থেকে নয় বছরের মধ্যে এবং ছয় শতাংশ (মাত্র পাঁচটি) মামলার নিষ্পত্তি হয় ১০ বছর অথবা তার বেশি সময় পর।

প্রকৃতপক্ষে কত তাড়াতাড়ি রায় হবে সেটা নির্ভর করে মামলায় উভয়পক্ষের সক্রিয় সহযোগিতার ওপর।

রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর মামলায় গাম্বিয়া ও মিয়ানমার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে সক্রিয় থাকায় তার রায় পেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হবে না বলে আশা করা যায়।

রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার ব্যাপারে আইসিজে কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দেয় কিনা সে বিষয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের আগ্রহ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইসিজের বিচারকরা চাইলে আগামী মাসেই অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারেন।

এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়া, নাগরিকত্ব দেয়া, বৈষম্যমূলক আইন সংশোধন, মানবাধিকারকর্মীদের প্রবেশ নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ যে কোনো আদেশ দিতে পারেন।

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজ : আইসিজেতে ১৫ জন বিচারক রয়েছেন, যারা সাধারণ পরিষদ এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্বাধীন ভোটের মাধ্যমে নয় বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত।

পাঁচটি পদ প্রতি তিনবছর অন্তর অন্তর নবায়ন করা হয়। আদালতের প্রতিটি সদস্যকে ভিন্ন ভিন্ন দেশের হতে হবে। তারা তাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তারা প্রত্যেকে স্বাধীন বিচারক।

বিচারকদের পাঁচটি আসনে রয়েছেন পশ্চিম ইউরোপ এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের বিচারকগণ; আফ্রিকা থেকে তিনজন বিচারক; এশিয়া থেকে তিনজন; পূর্ব ইউরোপ থেকে দু’জন এবং লাতিন আমেরিকা থেকে দু’জন বিচারক রয়েছেন লিখিত বক্তব্য ও মৌখিক শুনানিতে প্রশ্ন করবেন।

শুনানি শেষে ছয় মাসের মধ্যে বিচারকগণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রায় নির্ধারণ করবেন এবং প্রকাশ্যে তা ঘোষণা করবেন। আইসিজে রায় দেয়ার পর তার কোনো আপিলের সুযোগ নেই।

ফলে এই রায় চূড়ান্ত। আইসিজের আদেশ মানতে সব পক্ষই বাধ্য। পাশাপাশি আদালতের সব আদেশের কপি পাঠানো হবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।

জড়িত কোনো রাষ্ট্র যদি আদেশ পালন না করে তবে অপর পক্ষের রাষ্ট্রটি চাইলে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে প্রতিকার চাইতে পারে। জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে মিয়ানমারকে। পাশাপাশি রায় না মানলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

মিয়ানমারের চার সেনা কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা : রোহিঙ্গাসহ সংখ্যালঘুদের নিপীড়নের দায়ে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ চার সামরিক কর্মকর্তার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

রয়টার্স বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট মঙ্গলবার তাদের কালো তালিকাভুক্ত করে। তারা হলেন- মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং, সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ভাইস সিনিয়র জেনারেল সোয়ে উইন, ৯৯ লাইট ইনফানট্রি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থান ও এবং ৩৩ লাইট ইনফানট্রি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অং অং। এর আগেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।