খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন আপিল বিভাগেও খারিজ

বিএনপি চেয়ারপারসনের সম্মতিতে মেডিকেল বোর্ড উন্নত চিকিৎসার পদক্ষেপ নেবে * খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিশেষ কোনো অবনতি হয়নি -অ্যাটর্নি জেনারেল * আদেশের পর বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি মিছিল * খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ, পূর্ণাঙ্গ আদেশ পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ -জয়নুল আবেদীন

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন আপিল বিভাগেও খারিজ

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন হয়নি আপিল বিভাগেও। বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ৬ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ জামিন আবেদনটি খারিজ করে দেন।

আদালত আদেশে বলেন, খালেদা জিয়ার সম্মতি থাকলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বোর্ড অ্যাডভান্সড ট্রিটমেন্টের (উন্নত চিকিৎসা) ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

এদিন আদালতের বাইরে বিএনপিপন্থী ও সরকার সমর্থক আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ আর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আবেদনটির শুনানি হয়। আদেশের পর বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় বিভিন্ন স্লোগান দেন। তখন আদালত এলাকায় আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদেরও ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ নামে স্লোগান দিতে দেখা যায়।

আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিশেষ কোনো অবনতি হয়নি। তিনি আগে যেমন ছিলেন, এখনও তেমনই আছেন। তাই আদালত তার জামিন আবেদন খারিজ করেছেন।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, জামিন চেয়ে আমরা আইনি লড়াই চালিয়েছি। সাত বছরের সাজায় জামিন না দেয়া নজিরবিহীন। এটি সুপ্রিমকোর্টের জন্য একটি কলঙ্কজনক ঘটনা হয়ে থাকবে।

খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেছেন, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। তারপরও আদালত তাদের জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। জামিন খারিজের পূর্ণাঙ্গ আদেশ পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্ট গত ৩১ জুলাই খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনটি খারিজ করে দিলে গত ১৪ নভেম্বর আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা। ৫ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার সর্বশেষ মেডিকেল রিপোর্ট তলব করেন আদালত।

এদিন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা এজলাসে তুমুল হট্টগোল করেন। এরপর আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে আটটি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। দুর্নীতির দুই মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত এপ্রিল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মোট ৩৬ মামলার মধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা ছাড়া অন্য মামলাগুলোতে জামিনে আছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

আপিল বিভাগের তালিকাভুক্ত না হলে আইনজীবীদের আদালত কক্ষে বৃহস্পতিবার ঢুকতে বাধা দেয়া হয়। সকালে আদালত বসার পর প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, আপনারা আমাদের শেষ ভরসাস্থল।

বাইরে আমার শত শত আইনজীবী দাঁড়িয়ে আছে, কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। অথচ ডিএজি, এএজি প্রায় সব ঢুকে বসে আছে। প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, আপিল বিভাগে এনরোলমেন্ট ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেয়া হবে না। আমি একা এই সিদ্ধান্ত নেইনি, সবাই মিলে নিয়েছি। খন্দকার মাহবুব তখন বলেন, আমি সে কথা বলছি না। ডিএজি, এএজি সবাই ঢুকেছে।

এই ডিসক্রিমিনেশন কইরেন না। আমার জুনিয়রকে পর্যন্ত ঢুকতে দেয়া হয়নি। আমি একজন বয়স্ক মানুষ। বুড়ো বয়সে আমাকে ফাইল নিয়ে আসতে হয়েছে। প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, আপনার জুনিয়র অবশ্যই ঢুকবে। খন্দকার মাহবুব বলেন, ঢুকতে দিচ্ছে না তো।

আমরা আশ্বস্ত করছি কোনো বিশৃঙ্খলা হবে না। যারা সিনিয়র আছি বিষয়টা দেখব। গত সপ্তাহের শুনানির কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, আপনারা তো করেননি, দেখেননি। আইনজীবী বলেন, শত শত পুলিশ রাইফেল নিয়ে দাঁড়ায়ে আছে। আর আমার শত শত আইনজীবীও দাঁড়িয়ে আছে।

এতে বিশৃঙ্খলা হতে পারে। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দাঁড়িয়ে বলেন, উনাদের কতজন লাগবে বলে দেন। উভয়পক্ষের ২০ জন অথবা ৩০ জন করে থাকতে পারে। বিএনপি চেয়ারপারসনের আরেক আইনজীবী জয়নুল আবেদীন তখন বলেন, যারা আপিল বিভাগে তালিকাভুক্ত, তাদের মধ্য থেকে ৩০ জন করে থাকতে পারে।

পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও জয়নুল আবেদীনের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি দুই পক্ষের ৩০ জন করে আইনজীবী থাকার অনুমতি দেন। ঠিক হয়, খালেদা জিয়ার মামলার শুনানি শুরুর আগে ৫ মিনিট সময় দেয়া হবে। তখন সবাই বেরিয়ে গিয়ে আবার ঢুকবে।

উভয় পক্ষের ৩০ জন করে আদালত কক্ষে থাকতে পারবে। কিন্তু সকাল ১০টার কিছু সময় পর আপিল বিভাগে খালেদার মামলার শুনানি শুরু হলে দেখা যায় কোনো পক্ষই বেঁধে দেয়া সংখ্যা মানেনি। এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি দুই পক্ষের উদ্দেশে বলেন, আপনারা কেউ কথা শোনেননি।

পরে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আগের ও বর্তমান দুটি মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন। আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সেই প্রতিবেদনের সারমর্ম উপস্থাপন করেন। মাহবুবে আলম আদালতকে বলেন, খালেদা জিয়ার যেসব রোগ এখানে উল্লেখ আছে, তা দীর্ঘমেয়াদি রোগ।

এর ফিরিস্তি আদালতকে পড়ে শোনান তিনি। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, খালেদা জিয়া ডায়াবেটিসে ভুগছেন ২০ বছর ধরে। উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন ১০ বছর ধরে। আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন ৩০ বছর ধরে। মেডিকেল প্রতিবেদন বলছে, খালেদা জিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।

তার ডায়াবেটিসে ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর তার যেসব রোগ, সেগুলোর চিকিৎসা বাংলাদেশে সম্ভব। রিপোর্টে বলা হয়েছে, চিকিৎসকরা তার যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারছেন না। তিনি অনুমতি দিচ্ছেন না।

এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন শুনানিতে বলেন, আপিল বিভাগ ১০ বছর সাজার আসামিকেও জামিন দিয়েছে। পাকিস্তানের মতো বর্বর দেশেও নওয়াজ শরিফকে মেডিকেল গ্রাউন্ডে জামিন দিয়েছে, লন্ডনে পঠিয়েছে। মানবিক বিবেচনায় আমরা তার (খালেদা জিয়ার) জামিন চাইছি।

বেলা ১১টার দিকে আদালত বিরতিতে যায়। সাড়ে ১১টায় আবার শুনানি শুরু হলে জয়নুল আবেদীন বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই আদালতের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। আমরা মানবিক কারণে খালেদা জিয়ার জামিন চাইছি। খালেদা জিয়া একজন সুস্থ মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমরা দেখলাম, তার অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, আমি ডাক্তার না। তবু যেটুকু বুঝি, এই মেডিকেল প্রতিবেদন বলছে, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা দরকার। মানবিক কারণে আমরা খালেদা জিয়ার জামিন চাচ্ছি। তার অবস্থা এমন যে, তিনি পঙ্গু অবস্থায় চলে গেছেন। হয়তো ছয় মাস পর তার অবস্থা আরও খারাপ হবে। আর কোথাও গিয়ে লাভ নেই।

এজন্য আমরা বারবারই আদালতের কাছে আসছি, বলছি, মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়া হোক। খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতকে বলেন, আমাদের দেশের বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে, রাজনীতি করলে জেলে যেতে হবে।

রাজনীতি আর জেল পাশাপাশি। জেলে থাকলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। আর ক্ষমতায় থাকলে তার থেকে আর ভালো কেউ নেই। অসুস্থ ও বয়স্ক নারী খালেদা জিয়া। তাকে জামিন দেয়ার আবেদন জানান আদালতের কাছে।

জামিন আবেদনের বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, দুই মামলায় তিনি (খালেদা জিয়া) ১৭ বছরের সাজা ভোগ করছেন। এটাকে ‘শর্ট সেনটেন্স’ বলা যায় না। তাছাড়া দুই মামলাতেই আপিল শুনানির জন্য রেডি। এই অবস্থায় জামিন হওয়া উচিত নয়। দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সর্বশেষ মেডিকেল রিপোর্ট থেকে উদ্ধৃত করে শুনানিতে বলেন, চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার সম্মতি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চিকিৎসকরা তার যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারছেন না। আমরা তার জামিন আবেদন নাকচ করার আর্জি জানাচ্ছি।

বেলা ১টায় শুনানি শেষে মিনিট দশেক বিরতি দিয়ে সিদ্ধান্ত জানায় আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের জামিন খারিজের আদেশই তাতে বহাল থাকে।

খালেদা জিয়ার পক্ষে জয়নুল আবেদীন, খন্দকার মাহবুব হোসেন ছাড়াও ছিলেন, জমির উদ্দিন সরকার, এজে মোহাম্মদ আলী, ফজলুর রহমান, নিতাই রায় চৌধুরী, মাহবুব উদ্দিন খোকন, বদরুদ্দোজা বাদল, ফারুক হোসেন ও একেএম এহসানুর রহমান প্রমুখ। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে খুরশীদ আলম খান এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। উপস্থিত ছিলেন ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, এম আমিন উদ্দিন, ফজলে নূর তাপস প্রমুখ।

আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন নিম্ন আদালত। রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া হাইকোর্টে আপিল করেছেন।

সে আপিলে তিনি জামিন চেয়েছিলেন। হাইকোর্ট বিভাগ সে জামিন আবেদন নাকচ করেছেন। এ আদেশের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার পক্ষে একটি লিভ টু আপিল করা হয়েছিল। সেখানে তার জামিন চাওয়া হয়েছিল। আদালত আজকে শুনানি করে জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। খালেদা জিয়া যদি রাজি থাকেন, তাহলে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকরা যেন তাকে উন্নত চিকিৎসা দেন, সে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মেডিকেল রিপোর্টে কি বলা আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার দুটো হাঁটুই রিপ্লেস করা হয়েছে। একটা ১৯৯৭ সালে, আরেকটা ২০০২ সালে। এটা ভালো হওয়ার অবস্থায় নেই। স্বাভাবিকভাবে এতদিন পর রিপ্লেসমেন্টের কার্যকারিতা থাকে না। সেক্ষেত্রে এটার অ্যাডভান্স (উন্নত) চিকিৎসা নিতে হয়। কতগুলো বিশেষ ধরনের ইনজেকশন আছে, সেসব ইনজেকশন দিতে হবে। কিন্তু তার অনুমতি না পেলে তা দেয়া সম্ভব নয়।

খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। সকাল থেকেই যারা আদালতে ঢুকেছেন, তাদের প্রত্যেককে তল্লাশি করা হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টে প্রবেশ করার সব কটি গেটে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : কারাগারে খালেদা জিয়া

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×