রাজস্ব আয়ের তথ্যে বড় ঘাপলা

মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান এনবিআর চেয়ারম্যান থাকার সময় ৩৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব বেশি আদায় দেখান

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এনবিআর

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য বেরিয়ে আসছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় সরকারকে খুশি করতে একের পর একে গোঁজামিলে ভরা মনগড়া রাজস্ব আদায়ের তথ্য দিয়েছেন। তার তিন অর্থবছরের মেয়াদে ৩৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় দেখানো হয়েছে।

যা পরে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিজিএ) পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের কাগজে-কলমে রাজস্ব আদায়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৃতিত্ব দাবি করেন।

কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তার পুরো মেয়াদে ৩৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। অথচ ভুল তথ্য দিয়ে তিনি সরকারের উচ্চমহলসহ সবার কাছে বাহবা কুড়িয়েছেন। যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান নজিবুর রহমান। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দায়িত্বকালে প্রতি অর্থবছরেই সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৃতিত্ব দাবি করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাস দেন।

২০১৫ সালের ২ জুলাই ভোরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনের কথা জানান তিনি। পরে ওইদিনই রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।

এটি সাময়িক হিসাব। এ সময় সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বেশি আদায় হয়েছে।

এরপর ২০১৬ সালের ২৯ জুন একই কায়দায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তথ্য ফেসবুকে জানান নজিবুর রহমান। তার ওয়ালে লেখেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এ সময় সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল দেড় লাখ কোটি টাকা। একইভাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রাজস্বের লক্ষ্য পূরণের তথ্য ফেসবুকে জানান তিনি।

অথচ সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবরক্ষণ সংস্থা সিজিএর তথ্য অনুযায়ী, নজিবুর রহমান রাজস্ব আয়ের ভুল তথ্য দিয়েছেন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৃতিত্ব দাবি করেন তিনি। কিন্তু সিজিএ’র হিসাবে, ওই বছর সরকারের কোষাগারে জমা পড়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কাগজে-কলমে ১২ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা বেশি আদায় দেখিয়েছেন তৎকালীন চেয়ারম্যান।

একইভাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেড় লাখ কোটি টাকা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে নজিবুর রহমান কাগজে-কলমে আদায় দেখান ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। আর ওই সময় সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও তিনি রাজস্ব আদায়ের ভুল তথ্য সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে উপস্থাপন করেন।

এ সময় সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে তিনি আদায় দেখান ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩ কোটি টাকা। অথচ এ সময়ে প্রকৃত রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ৩ অর্থবছরে ৩৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় দেখিয়েছেন।

জানতে চাইলে সিজিএর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, সরকারি কোষাগারে প্রতি অর্থবছরে যে টাকা জমা হয়, সেই হিসাবই সিজিএ দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিজিএ হিসাবের মধ্যে মিল তারই প্রমাণ করে। তবে এনবিআরের সঙ্গে হিসাবের গরমিল মোটা দাগে দুই কারণে দেখা যায়। প্রথমত; ৩০ জুন অর্থাৎ অর্থবছরের শেষদিন যেই চালানগুলো জমা পড়ে তা ট্রেজারিতে নগদায়ন হতে ২-৩ দিন সময় লাগে। দ্বিতীয়ত; এনবিআরের অধীনে কর অঞ্চল, কাস্টমস হাউস বা ভ্যাট কমিশনারেটগুলো রাজস্ব লক্ষ্য আদায়ের অতিরঞ্জিত তথ্যের কারণেও গরমিল হতে পারে।

সূত্রগুলো বলছে, সিজিএর সঙ্গে এনবিআরের রাজস্ব আয়ের হিসাবের গরমিলের কারণে সরকারকে নানামুখী সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষত বাজেট প্রণয়ন ও বাজেট বাস্তবায়নে। যেমন প্রতিদিনই সরকারি কোষাগার থেকে বিভিন্ন প্রকল্প বা আনুষঙ্গিক কাজে অর্থ উত্তোলন করা হয়। এর পরিমাণ যদি জমাকৃত অর্থের চেয়ে বেশি হয় তাহলে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা সমন্বয় করতে হয়।

এ ঋণের বিপরীতের সুদ পরিশোধ করতে হয়। যদি প্রকৃতপক্ষে কম রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে তাহলে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূলত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করেই সরকারের জাতীয় বাজেট প্রণীত হয়ে থাকে। বছর শেষে রাজস্ব আয়ের সঠিক হিসাব না থাকলে পরবর্তী বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বেকায়দায় পড়তে হয়। বিরূপ প্রভাব পড়ে বাজেট বাস্তবায়নের ভারসাম্য রক্ষায়। অভ্যন্তরীণ আয় কমে গেলে ব্যয় কাটছাঁট করতে হয়। এতে সরকারের ঋণনির্ভরতা বেড়ে যায় এবং উন্নয়ন প্রকল্প কাটছাঁট করতে হয়। অর্থাৎ সরকারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিক ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, রাজস্ব আয়ের হিসাবের গরমিলের কারণে আর্থিক নীতি প্রণয়ন দুরূহ হয়ে পড়ে।

সরকারের হাতে কী পরিমাণ সম্পদ আছে তার সঠিক তথ্য না পেলে ব্যয়ের পরিকল্পনা সঠিকভাবে করা সম্ভব নয়। আর ব্যয়ের পরিকল্পনা সঠিকভাবে করতে না পারলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে দিনের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়ার ভয় আছে।

ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে এনবিআরের সাবেক ও বর্তমান একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বছর শেষে নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে এনবিআর চেয়ারম্যান কাগজে-কলমে রাজস্ব আয় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাতেন।

এ কাজে তাকে সহায়তা করতেন সিআইসির তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। প্রতি বছর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ঘোষণা দেয়ার আগে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতেন নজিবুর রহমান।

দীর্ঘ রাত পর্যন্ত অফিস করে কোন কোন দফতরে রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে দেখানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি কারও কোনো যৌক্তিক মতামত গ্রাহ্য করতেন না।

তার মতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনা করতেন। তাকে খুশি করতে কয়েকটি কর অঞ্চলের কমিশনাররা অস্বাভাবিক রাজস্ব আদায়ের তথ্য এনবিআরে দেন। পরে ওইসব কর অঞ্চলের আদায় নিয়েই সিজিএ আপত্তি দিয়েছে। পরে ওই কমিশনাররা তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

এসব বিষয়ে জানতে চেয়ে মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে এসএমএস দেয়া হলেও ফোন রিসিভ করেননি এবং জবাবও দেননি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×