নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন : ভারতে বিক্ষোভ অব্যাহত বাস-ট্রেনে ভাংচুর আগুন

পশ্চিমবঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগ তছনছ * আইন প্রত্যাখ্যান ৫ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর * যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কানাডা ও ফ্রান্সের ভ্রমণ সতর্কতা

  যুগান্তর ডেস্ক ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভাংচুর

ভারতে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শনিবারও পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়সহ দেশটির উত্তর-পূর্বের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিক্ষোভ হয়েছে। বিশেষ করে এদিন পশ্চিমবঙ্গে আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছে। রাজ্যের জেলায় জেলায় রেল-সড়ক অবরোধ, ট্রেন-যানবাহনে ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা তছনছ হয়ে পড়ে।

বেশ কয়েকটি রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। মমতা ব্যানার্জি এর আগে গণআন্দোলনের ডাক দিলেও রাজ্যের এমন পরিস্থিতিতে এদিন বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন তিনি। মমতা বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

বিতর্কিত ওই আইনটি প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন ৫ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এদিকে ভারতে সৃষ্ট অস্থিরতায় দেশটির উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্স। খবর পিটিআই, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আনন্দবাজারসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের।

শনিবার সকাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে দফায় দফায় বিক্ষোভ এবং রেল-সড়কপথ অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। বিভিন্ন স্থানে তারা বাস, ট্রেন ও স্টেশনে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এতে বেশিরভাগ এলাকায় ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি বাস ভাংচুর ও পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সকালে ডোমজুডের সলপ মোড়ে ছয় নম্বর জাতীয় সড়ক ও কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় বেশ কয়েকটি সরকারি বাসে ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ করলে বিক্ষোভকারীরা তাদের পাথর নিক্ষেপ করেন। শিয়ালদহ ডিভিশনের বারাসত-হাসনাবাদ শাখায় বিক্ষোভের জেরে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় সকাল ৭টা থেকে। হাসনাবাদ শাখার সোঁদালিয়া-লেবুতলা স্টেশনের মাঝেও অবরোধ করা হয়। লক্ষ্মীকান্তপুর-নামখানা শাখায় রেলের ওভারহেড তারে কলাপাতা ফেলে প্রতিরোধ করেন বিক্ষোভকারীরা। এরপর ওই শাখায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মালদহ ডিভিশনের আজিমগঞ্জ শাখাতেও বিক্ষোভের জেরে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন স্টেশনে অনেক ট্রেন আটকে পড়ায় বিপত্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

এছাড়া জঙ্গিপুর ও মহিপালসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকেও ট্রেন ছাড়েনি। বাসুদেবপুরে হল্ট স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। সাঁকরাইলে অবরোধের জেরে হাওড়ার দক্ষিণ-পূর্ব শাখায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। এর আগে শুক্রবার উলুবেড়িয়া স্টেশনে ব্যাপক ভাংচুর চালান বিক্ষোভকারীরা। লণ্ডভণ্ড করে দেয়া হয়ে গোটা স্টেশন চত্বর। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বীরভূমেও। মুরাইয়ে রেল অবরোধের জেরে ডাউন শতাব্দী এক্সপ্রেস বাঁশলই স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল।

এদিকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদের কথা বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় গত দু’দিনে বিক্ষোভ চরম পর্যায়ে পৌঁছে। এমন পরিস্থিতিতে এবার বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, গণতান্ত্রিক পথে আন্দোলন করুন। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। পথ অবরোধ, রেল অবরোধ করবেন না। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বরদাশত করা হবে না। যারা গণ্ডগোল করছেন, রাস্তায় নেমে আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন, তাদের কাউকে ছেড়ে দেয়া হবে না। বাসে আগুন লাগিয়ে, ট্রেনে পাথর ছুড়ে, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করলে, আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরাসহ আরও কয়েকটি রাজ্যে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবারও আসাম ও মেঘালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ছিল। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতেই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আসামের কর্মকর্তারা বলেছেন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার এবং ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলোর সাহায্যে গুজব এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে এমন তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়ানো হতে পারে। ওই দুই রাজ্যের মানুষ আবার কবে নাগাদ ইন্টারনেট সংযোগ আবার ফিরে পেতে পারেন, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। এর আগে ভারতশাসিত কাশ্মীরে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটি। ৪ মাস পর এখনও ইন্টারনেট সংযোগের বাইরে রয়েছেন ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা।

এদিন আসামের গোহাটিতে ৭ ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করেছে সেখানকার প্রশাসন। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এ শিথিল করা হয়। এর ফলে মানুষ পথে নেমে এসেছেন। দোকান আর পেট্রলপাম্পে দেখা গেছে বিশাল লাইন। গোলমাল হতে পারে এ আশঙ্কায় অনেকেই কিনেছেন চাল, ডাল, তেল, নুনসহ বিভিন্ন পণ্য।

এদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জি শুক্রবার ওই আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সরকারের প্রশাসনিক সাবেক দু’জন কর্মকর্তা। তারা হলেন- সোম সুন্দর বড়–য়া ও অমিতাভ পান্ডে। এদিকে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ৫ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এ ৫টি রাজ্য হল- পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়।

১৯৫৫ সালের ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনে এ সংশোধনের ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, জৈন, পারসি ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন।

যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-কানাডার ভ্রমণ সতর্কতা : নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতায় ভারতের উত্তরপূর্ব রাজ্যগুলোতে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্স। প্রয়োজন ছাড়া ওইসব এলাকায় না যেতে নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছে দেশ চারটি।

ভারতে অবস্থানরত নাগরিকদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং গণমাধ্যমের খবর অনুসরণেরও পরামর্শ দিয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতায় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের আসাম ভ্রমণে স্থগিতাদেশ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কানাডা এবং ফ্রান্সও উত্তর-পূর্ব ভারতে ভ্রমণে নাগরিকদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×