দুই সিটিতে বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী: বহিষ্কারে যাচ্ছে আ’লীগ, সমঝোতায় বিএনপি
jugantor
দুই সিটিতে বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী: বহিষ্কারে যাচ্ছে আ’লীগ, সমঝোতায় বিএনপি
ক্ষমতাসীনদের শতাধিক ও বিএনপির ৩২ বিদ্রোহী মাঠে

  হাবিবুর রহমান খান ও হাসিবুল ইসলাম  

১৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে কঠোর অবস্থানে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মেনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকলে সরাসরি বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

বুধবার আওয়ামী লীগের দক্ষিণ সিটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বিদ্রোহীদের দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়া হয়। উত্তরেও একই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছে বিএনপি। এখনই বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না দলটির হাইকমান্ড। সমঝোতায় না এলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিএনপির কয়েক প্রার্থী ভোটের মাঠে থাকতে পারেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দুই সিটির অধিকাংশ ওয়ার্ডে দল সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দলে শতাধিক এবং বিএনপিতে অন্তত ৩২ জন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।

বিদ্রোহীরা পুরোদমে গণসংযোগ শুরু করছেন। মুখোমুখি অবস্থান করায় অনেক ওয়ার্ডে ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা। বিদ্রোহীদের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে সামনে ভয়াবহ সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন নেতাকর্মীরা। দলের জয় নিশ্চিতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতায় এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দুই দলের নীতিনির্ধারকরা। গত দুই দিনে তারা দফায় দফায় বৈঠকও করেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বুধবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিদ্রোহীদের নিয়ে বসে তাদের দু’দিনের সময় দিয়েছিলাম। এই সময়ের মধ্যে তাদের দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে শুরু করতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে স্ব স্ব সংগঠন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও উত্তর সিটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাছাই কমিটির সমন্বয়কারী মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তাদের নির্বাচনে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। দল সমর্থিত প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যেতে অনুরোধ করছি। অনেকে আমাদের অনুরোধে সাড়াও দিয়েছেন। বাকিরা ভোটের আগে সরে যাবেন বলে আশা করি। তবে এখন পর্যন্ত বিদ্রোহীদের ব্যাপারে বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত হয়নি।

আ’লীগের বিদ্রোহীরা অনড়

ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বশে আনতে পারছে না আওয়ামী লীগ। ফলে তাদের বিষয়ে এখন কঠোর অবস্থানে দলটি। বুঝিয়ে এবং সতর্ক করার পরও যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছেন তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা।

তাদের মতে, দল করতে হলে দলের সিদ্ধান্ত মানতে হবে। এর বাইরে যারা যাবেন তাদের দলীয় পদ ছাড়তে হবে। তবে কেন্দ্রের এমন ঘোষণায় খুব বেশি সাড়া দেয়নি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। উল্টো ওয়ার্ডে নিজেদের ‘জনপ্রিয়’ দাবি করে দলীয় সমর্থন পরিবর্তন বা উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।

বুধবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা দক্ষিণের বিদ্রোহী কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠকে বসে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে এতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা মহানগর ও অধীনস্থ বিভিন্ন থানার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে বিদ্রোহী প্রার্থীরা তাদের ওয়ার্ডে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন সঠিক হয়নি দাবি করে নিজেদের জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে একাধিক থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে না দাঁড়ালে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেসব নেতা মদদ দিচ্ছেন, তাদেরও দল থেকে বহিষ্কারের দাবি ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আমির হোসেন আমু বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে তাদের আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে ঘোষণা দেন। বৈঠকের পর গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও এমন তথ্য জানানো হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী প্রমুখ।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পরিচালনা কমিটি-২০২০ এর সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির।

এর আগে মঙ্গলবার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বৈঠক করা হয়। ৫৪ ওয়ার্ডের ৩৫টিতে ৩৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও বৈঠকে মাত্র ৯ জন বিদ্রোহী কাউন্সিলর ও ৫ জন সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী বিদ্রোহী প্রার্থী হাজির হয়েছিলেন।

উপস্থিত বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি বজলুর রহমান বজলু ও সাধারণ সম্পাদক এসএ মান্নান কচি।

বৈঠকে তাদের ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে এই সময়ের মধ্যে বিদ্রোহীদের নিজ প্রচারে নিষ্ক্রিয় হয়ে দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করতে বলা হয়েছে। এই নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে আওয়ামী লীগের আলটিমেটামের পরও নির্বাচনী মাঠে রয়েই গেছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বুধবারও সারাদিন নিজ নিজ ওয়ার্ডে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন তারা।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩নং ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সহসভাপতি কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক যুগান্তরকে বলেন, আমি মাহবুবউল আলম হানিফের সঙ্গে দেখা করেছি। ওনাকে বলেছি- আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন এই ওয়ার্ড উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। আমি এই বিষয়টি তাকে জানিয়েছি।

৫নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা। আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিলেও এখনও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় তিনি।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, গতবারও আমাকে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। তখন আমাদের বলা হয়েছিল, আগামীতে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হবে। পরে আমি সাধারণ মানুষের চাপ থাকার পরও দলের সিদ্ধান্ত মেনে বসেছিলাম। কিন্তু এবার আমার এলাকার মানুষই আমাকে জোর করে নির্বাচন করাচ্ছে। আমি কেন্দ্রীয় নেতাদের বলেছি- এই ওয়ার্ড উন্মুক্ত করে দেন। আমরা নির্বাচন করি। তখন প্রমাণ হবে কে বেশি জনপ্রিয়।

৬নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি। তিনিও বুধবার নিজের প্রচার চালিয়েছেন।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, তার জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততা নেই। এই ওয়ার্ডে প্রার্থী পরিবর্তন করে শেষ পর্যন্ত তাকেই দল থেকে সমর্থন দেয়া হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। এদিকে দক্ষিণে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪২টিতে ৭২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী সাগর আহমদ শাহীন যুগান্তরকে বলেন, দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা আমার সঙ্গে রয়েছেন। নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চারজন। তারা কেউ বুধবারের ডাকা মিটিংয়ে উপস্থিত হননি।

জানতে চাইলে বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল উদ্দিন কাবুল যুগান্তরকে বলেন, দলের দুর্দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা অগ্রভাগে ছিলাম। জেল-জুলুম হুলিয়া আমরা সহ্য করেছি। তারপরও দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমার এলাকার আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটাররা আমার সঙ্গে রয়েছে। তাদের কাছে দায়বদ্ধতা থাকায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।

সমঝোতায় বিএনপি

বুঝিয়ে-শুনিয়ে বিদ্রোহীদের নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছে বিএনপি। এখন পর্যন্ত বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্তে যায়নি দলটি। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারলেও কয়েকটি ওয়ার্ডে বিদ্রোহীরা মাঠে থাকতে পারেন।

প্রতীক পেয়ে এসব প্রার্থীরা ইতিমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন। দল থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারি দেয়া হলেও তা আমলেই নিচ্ছেন না তারা। প্রয়োজনে দল করবেন না বলে উল্টো হুশিয়ারি দিচ্ছেন কেউ কেউ।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল যুগান্তরকে বলেন, দক্ষিণ সিটির কয়েকটি ওয়ার্ডে আমাদের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছি। আশা করি, আমরা সফল হব। এক প্রশ্নের জবাবে দক্ষিণের সিটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এ সদস্য বলেন, দল থেকে বহিষ্কারের মতো কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেয়া হয়নি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তরের ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে ১৭টিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে ৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হাজী আবু তৈয়বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আছেন জামাল হোসেন বাপ্পী। ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বুলবুল মল্লিক, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে হাবিবুর রহমান ও মোহাম্মদ রিপন বিদ্রোহী প্রার্থী। তারা এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

জানতে চাইলে ৩নং ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী জামাল হোসেন বাপ্পী যুগান্তরকে বলেন, আমি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকব। স্থানীয় নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে রয়েছেন। দল যাকে সমর্থন দিয়েছে, তার সঙ্গে নেতাকর্মীদের কোনো সম্পর্ক নেই। দল যদি আমাকে বহিষ্কারও করে, তবুও নির্বাচন থেকে পিছু হটব না।

একইভাবে ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দলসমর্থিত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দুলুর বিরুদ্ধে গোলাম রাব্বানী, ১৬ নম্বরে সৈয়দ ইকরাম বাবুল, ২৩ নম্বরে কামাল আহমেদ দুলু, ২৫ নম্বরে এসএম হাসেম, ২৭নং ওয়ার্ডে জাভেদ আলী, ৩০ নম্বরে আবুল হাসেম, ৩১ নম্বরে হাসিনা মোর্শেদ কাকলী ও ফরিদউদ্দিন ফরহাদ, ৩৮ নম্বরে আলী হোসেন, ৪০ নম্বরে আতাউর রহমান, ৪৩ নম্বরে রেজাউল করিম ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে হেলাল তালুকদার, ৫৪নং ওয়ার্ডে হারুনুর রশিদ খোকন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন।

জানতে চাইলে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দুলু বলেন, প্রত্যাহারের শেষদিনেও তার ওয়ার্ডে বিএনপির একজন নেতা প্রার্থী হিসেবে রয়ে গেছেন। তবে তার সঙ্গে আমার ইতিমধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তিনি কোনো প্রচার চালাবেন না। ফলে তার কোনো সমস্যাও হবে না।

এদিকে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৭৫টি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ১৫টিতে রয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী। এর মধ্যে ১নং ওয়ার্ডে নজরুল ইসলাম জুয়েল, ১০ নম্বরে আনোয়ার হোসেন লিপু, ১৩ নম্বরে নজরুল ইসলাম জুয়েল, ১৫ নম্বরে আবু নাছের লিটন, ৩৭ নম্বরে সুমন ভূঁইয়া, ৩৯ নম্বরে মোজাম্মেল হক মুক্তা, ৪৬ নম্বরে মো. সোহেল ও ঢালী মামুনুর রশীদ, ৫০ নম্বরে আনোয়ার হোসেন স্বাধীন, ৫১ নম্বরে কবির আহম্মেদ, ৫২ নম্বরে বাদল রানা, ৫৫ নম্বরে শহিদুল হক, ৫৯ নম্বরে খোরশেদ আলম খোকন, ৬১ নম্বরে শাহ আলম, ৬৬ নম্বরে সাবেক কাউন্সিলর নুরুদ্দিন মিয়া বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন।

জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৪৬নং ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী ঢালী মামুনুর রশিদ যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করেও কোনো মূল্যায়ন পাইনি। আমি পুরোদমে কাজ করছি। এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। যত বাধাই আসুক আমি শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকব। ভবিষ্যতে এ দল করব কি না জানি না। তাই আমার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা নিয়ে ভাবছি না।

এদিকে একাধিক প্রার্থী থাকায় দুই সিটির তিনটি ওয়ার্ড উম্মুক্ত রেখেছে বিএনপি। ডিএনসিসির ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ওসমান গণি শাহজাহান ও মাসুদ খান রাজেশ। এছাড়া দক্ষিণের ১৯ ও ২০নং ওয়ার্ডও উম্মুক্ত রাখা হয়েছে।

১৯ নম্বরে প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন আবদুল মোতাবেল রুবেল, নাদিম চৌধুরী ও আশরাফউদ্দিন এবং ২০নং ওয়ার্ডে রফিকুল ইসলাম, এমএ হান্নান ও জাহিদ হোসেন। এদিকে ডিএসসিসির দুটি ওয়ার্ডে কোনো কাউন্সিলর প্রার্থী নেই বিএনপির।

এর মধ্যে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে হাজী আলতাফ হোসেনকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হয়। কিন্তু পরে আলতাফ হোসেনই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। ফলে ওয়ার্ডটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

এছাড়া ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি থেকে সমর্থন দেয়া হয়েছিল মোস্তাফিজুর রহমান ফয়েজকে। পরে তার মনোনয়ন বাতিল হয়। পরে আপিলের শুনানিতে অংশ নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাওয়ার পথে তাকে অপহরণ করা হয়। এই ওয়ার্ডেও অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

দুই সিটিতে বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী: বহিষ্কারে যাচ্ছে আ’লীগ, সমঝোতায় বিএনপি

ক্ষমতাসীনদের শতাধিক ও বিএনপির ৩২ বিদ্রোহী মাঠে
 হাবিবুর রহমান খান ও হাসিবুল ইসলাম 
১৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে কঠোর অবস্থানে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মেনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকলে সরাসরি বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

বুধবার আওয়ামী লীগের দক্ষিণ সিটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বিদ্রোহীদের দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়া হয়। উত্তরেও একই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছে বিএনপি। এখনই বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না দলটির হাইকমান্ড। সমঝোতায় না এলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিএনপির কয়েক প্রার্থী ভোটের মাঠে থাকতে পারেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দুই সিটির অধিকাংশ ওয়ার্ডে দল সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দলে শতাধিক এবং বিএনপিতে অন্তত ৩২ জন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।

বিদ্রোহীরা পুরোদমে গণসংযোগ শুরু করছেন। মুখোমুখি অবস্থান করায় অনেক ওয়ার্ডে ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা। বিদ্রোহীদের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে সামনে ভয়াবহ সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন নেতাকর্মীরা। দলের জয় নিশ্চিতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতায় এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দুই দলের নীতিনির্ধারকরা। গত দুই দিনে তারা দফায় দফায় বৈঠকও করেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বুধবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিদ্রোহীদের নিয়ে বসে তাদের দু’দিনের সময় দিয়েছিলাম। এই সময়ের মধ্যে তাদের দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে শুরু করতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে স্ব স্ব সংগঠন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও উত্তর সিটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাছাই কমিটির সমন্বয়কারী মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তাদের নির্বাচনে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। দল সমর্থিত প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যেতে অনুরোধ করছি। অনেকে আমাদের অনুরোধে সাড়াও দিয়েছেন। বাকিরা ভোটের আগে সরে যাবেন বলে আশা করি। তবে এখন পর্যন্ত বিদ্রোহীদের ব্যাপারে বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত হয়নি।

আ’লীগের বিদ্রোহীরা অনড়

ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বশে আনতে পারছে না আওয়ামী লীগ। ফলে তাদের বিষয়ে এখন কঠোর অবস্থানে দলটি। বুঝিয়ে এবং সতর্ক করার পরও যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছেন তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা।

তাদের মতে, দল করতে হলে দলের সিদ্ধান্ত মানতে হবে। এর বাইরে যারা যাবেন তাদের দলীয় পদ ছাড়তে হবে। তবে কেন্দ্রের এমন ঘোষণায় খুব বেশি সাড়া দেয়নি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। উল্টো ওয়ার্ডে নিজেদের ‘জনপ্রিয়’ দাবি করে দলীয় সমর্থন পরিবর্তন বা উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।

বুধবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা দক্ষিণের বিদ্রোহী কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠকে বসে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে এতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা মহানগর ও অধীনস্থ বিভিন্ন থানার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে বিদ্রোহী প্রার্থীরা তাদের ওয়ার্ডে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন সঠিক হয়নি দাবি করে নিজেদের জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে একাধিক থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে না দাঁড়ালে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেসব নেতা মদদ দিচ্ছেন, তাদেরও দল থেকে বহিষ্কারের দাবি ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আমির হোসেন আমু বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে তাদের আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে ঘোষণা দেন। বৈঠকের পর গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও এমন তথ্য জানানো হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী প্রমুখ।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পরিচালনা কমিটি-২০২০ এর সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির।

এর আগে মঙ্গলবার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বৈঠক করা হয়। ৫৪ ওয়ার্ডের ৩৫টিতে ৩৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও বৈঠকে মাত্র ৯ জন বিদ্রোহী কাউন্সিলর ও ৫ জন সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী বিদ্রোহী প্রার্থী হাজির হয়েছিলেন।

উপস্থিত বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি বজলুর রহমান বজলু ও সাধারণ সম্পাদক এসএ মান্নান কচি।

বৈঠকে তাদের ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে এই সময়ের মধ্যে বিদ্রোহীদের নিজ প্রচারে নিষ্ক্রিয় হয়ে দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করতে বলা হয়েছে। এই নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে আওয়ামী লীগের আলটিমেটামের পরও নির্বাচনী মাঠে রয়েই গেছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বুধবারও সারাদিন নিজ নিজ ওয়ার্ডে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন তারা।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩নং ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সহসভাপতি কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক যুগান্তরকে বলেন, আমি মাহবুবউল আলম হানিফের সঙ্গে দেখা করেছি। ওনাকে বলেছি- আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন এই ওয়ার্ড উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। আমি এই বিষয়টি তাকে জানিয়েছি।

৫নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা। আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিলেও এখনও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় তিনি।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, গতবারও আমাকে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। তখন আমাদের বলা হয়েছিল, আগামীতে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হবে। পরে আমি সাধারণ মানুষের চাপ থাকার পরও দলের সিদ্ধান্ত মেনে বসেছিলাম। কিন্তু এবার আমার এলাকার মানুষই আমাকে জোর করে নির্বাচন করাচ্ছে। আমি কেন্দ্রীয় নেতাদের বলেছি- এই ওয়ার্ড উন্মুক্ত করে দেন। আমরা নির্বাচন করি। তখন প্রমাণ হবে কে বেশি জনপ্রিয়।

৬নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি। তিনিও বুধবার নিজের প্রচার চালিয়েছেন।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, তার জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততা নেই। এই ওয়ার্ডে প্রার্থী পরিবর্তন করে শেষ পর্যন্ত তাকেই দল থেকে সমর্থন দেয়া হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। এদিকে দক্ষিণে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪২টিতে ৭২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী সাগর আহমদ শাহীন যুগান্তরকে বলেন, দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা আমার সঙ্গে রয়েছেন। নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চারজন। তারা কেউ বুধবারের ডাকা মিটিংয়ে উপস্থিত হননি।

জানতে চাইলে বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল উদ্দিন কাবুল যুগান্তরকে বলেন, দলের দুর্দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা অগ্রভাগে ছিলাম। জেল-জুলুম হুলিয়া আমরা সহ্য করেছি। তারপরও দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমার এলাকার আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটাররা আমার সঙ্গে রয়েছে। তাদের কাছে দায়বদ্ধতা থাকায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।

সমঝোতায় বিএনপি

 বুঝিয়ে-শুনিয়ে বিদ্রোহীদের নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছে বিএনপি। এখন পর্যন্ত বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্তে যায়নি দলটি। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারলেও কয়েকটি ওয়ার্ডে বিদ্রোহীরা মাঠে থাকতে পারেন।

প্রতীক পেয়ে এসব প্রার্থীরা ইতিমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন। দল থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারি দেয়া হলেও তা আমলেই নিচ্ছেন না তারা। প্রয়োজনে দল করবেন না বলে উল্টো হুশিয়ারি দিচ্ছেন কেউ কেউ।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল যুগান্তরকে বলেন, দক্ষিণ সিটির কয়েকটি ওয়ার্ডে আমাদের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছি। আশা করি, আমরা সফল হব। এক প্রশ্নের জবাবে দক্ষিণের সিটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এ সদস্য বলেন, দল থেকে বহিষ্কারের মতো কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেয়া হয়নি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তরের ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে ১৭টিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে ৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হাজী আবু তৈয়বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আছেন জামাল হোসেন বাপ্পী। ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বুলবুল মল্লিক, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে হাবিবুর রহমান ও মোহাম্মদ রিপন বিদ্রোহী প্রার্থী। তারা এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

জানতে চাইলে ৩নং ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী জামাল হোসেন বাপ্পী যুগান্তরকে বলেন, আমি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকব। স্থানীয় নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে রয়েছেন। দল যাকে সমর্থন দিয়েছে, তার সঙ্গে নেতাকর্মীদের কোনো সম্পর্ক নেই। দল যদি আমাকে বহিষ্কারও করে, তবুও নির্বাচন থেকে পিছু হটব না।

একইভাবে ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দলসমর্থিত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দুলুর বিরুদ্ধে গোলাম রাব্বানী, ১৬ নম্বরে সৈয়দ ইকরাম বাবুল, ২৩ নম্বরে কামাল আহমেদ দুলু, ২৫ নম্বরে এসএম হাসেম, ২৭নং ওয়ার্ডে জাভেদ আলী, ৩০ নম্বরে আবুল হাসেম, ৩১ নম্বরে হাসিনা মোর্শেদ কাকলী ও ফরিদউদ্দিন ফরহাদ, ৩৮ নম্বরে আলী হোসেন, ৪০ নম্বরে আতাউর রহমান, ৪৩ নম্বরে রেজাউল করিম ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে হেলাল তালুকদার, ৫৪নং ওয়ার্ডে হারুনুর রশিদ খোকন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন।

জানতে চাইলে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দুলু বলেন, প্রত্যাহারের শেষদিনেও তার ওয়ার্ডে বিএনপির একজন নেতা প্রার্থী হিসেবে রয়ে গেছেন। তবে তার সঙ্গে আমার ইতিমধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তিনি কোনো প্রচার চালাবেন না। ফলে তার কোনো সমস্যাও হবে না।

এদিকে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৭৫টি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ১৫টিতে রয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী। এর মধ্যে ১নং ওয়ার্ডে নজরুল ইসলাম জুয়েল, ১০ নম্বরে আনোয়ার হোসেন লিপু, ১৩ নম্বরে নজরুল ইসলাম জুয়েল, ১৫ নম্বরে আবু নাছের লিটন, ৩৭ নম্বরে সুমন ভূঁইয়া, ৩৯ নম্বরে মোজাম্মেল হক মুক্তা, ৪৬ নম্বরে মো. সোহেল ও ঢালী মামুনুর রশীদ, ৫০ নম্বরে আনোয়ার হোসেন স্বাধীন, ৫১ নম্বরে কবির আহম্মেদ, ৫২ নম্বরে বাদল রানা, ৫৫ নম্বরে শহিদুল হক, ৫৯ নম্বরে খোরশেদ আলম খোকন, ৬১ নম্বরে শাহ আলম, ৬৬ নম্বরে সাবেক কাউন্সিলর নুরুদ্দিন মিয়া বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন।

জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৪৬নং ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী ঢালী মামুনুর রশিদ যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করেও কোনো মূল্যায়ন পাইনি। আমি পুরোদমে কাজ করছি। এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। যত বাধাই আসুক আমি শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকব। ভবিষ্যতে এ দল করব কি না জানি না। তাই আমার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা নিয়ে ভাবছি না।

এদিকে একাধিক প্রার্থী থাকায় দুই সিটির তিনটি ওয়ার্ড উম্মুক্ত রেখেছে বিএনপি। ডিএনসিসির ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ওসমান গণি শাহজাহান ও মাসুদ খান রাজেশ। এছাড়া দক্ষিণের ১৯ ও ২০নং ওয়ার্ডও উম্মুক্ত রাখা হয়েছে।

১৯ নম্বরে প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন আবদুল মোতাবেল রুবেল, নাদিম চৌধুরী ও আশরাফউদ্দিন এবং ২০নং ওয়ার্ডে রফিকুল ইসলাম, এমএ হান্নান ও জাহিদ হোসেন। এদিকে ডিএসসিসির দুটি ওয়ার্ডে কোনো কাউন্সিলর প্রার্থী নেই বিএনপির।

এর মধ্যে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে হাজী আলতাফ হোসেনকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হয়। কিন্তু পরে আলতাফ হোসেনই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। ফলে ওয়ার্ডটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

এছাড়া ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি থেকে সমর্থন দেয়া হয়েছিল মোস্তাফিজুর রহমান ফয়েজকে। পরে তার মনোনয়ন বাতিল হয়। পরে আপিলের শুনানিতে অংশ নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাওয়ার পথে তাকে অপহরণ করা হয়। এই ওয়ার্ডেও অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন-২০২০

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০