প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান: সিপিবির সমাবেশে সেদিন যা ঘটেছিল

দ্রুত সাজা কার্যকরের দাবি

  যুগান্তর রিপোর্ট ২১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসামি
আসামি। ছবি: যুগান্তর

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি রাজধানীর পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্র্টির (সিপিবি) মহাসমাবেশে নারকীয় বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে খুলনার সিপিপি নেতা হিমাংশু মণ্ডলসহ অনেকেই মারা যান। কিন্তু হিমাংশু তার অন্তিম সময়েও শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের মুক্তির প্রতীক লাল পতাকা হাতে উঁচু করে ধরে রেখেছিলেন।

সেই পতাকা আজও বহন করে চলেছে নাম জানা না জানা অসংখ্য নেতাকর্মী। ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আজও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেক নেতা। তারা যুগান্তরের কাছে বর্ণনা করেন কী ঘটেছিল সেদিন। ১৯ বছর আগে নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি) সদস্যরা পল্টনে সিপিবির সমাবেশে এ হামলা চালায়।

এতে ঘটনাস্থলেই চারজন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান। এদের মধ্যে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা হিমাংশু মণ্ডল, রূপসা উপজেলার সিপিবি নেতা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা আবদুল মজিদ, ঢাকার ডেমরা থানার লতিফ বাওয়ানি জুট মিলের শ্রমিক নেতা আবুল হাসেম ও মাদারীপুরের মোক্তার হোসেন ঘটনাস্থলেই মারা যান।

আর বোমা হামলায় খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা বিপ্রদাস রায় আহত হয়ে ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে মারা যান। এছাড়া বোমা হামলায় আহত হন বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। এদের মধ্যে অমর মণ্ডল, লক্ষণ মণ্ডল, মো. জাহাঙ্গীর, আবদুস সাত্তার, মিজানুর রহমান, এমএ করিমসহ অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে বেঁচে আছেন। সোমবার এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এতে ১০ জনের ফাঁসি এবং ২ জনকে খালাস দেয়া হয়।

সিপিবির সেই মহাসমাবেশে উপস্থিত ছিলেন এমন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সেদিনের লোমহর্ষক ঘটনা যুগান্তরের কাছে তুলে ধরেন।

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার দিন ছিল মহাসমাবেশ। লাখো মানুষের উপস্থিতি ছিল সেখানে। দুপুরের পর পর বিকালের দিকে। তখন আমার বক্তব্য দেয়া বাকি ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে গোটা সমাবেশ কেঁপে উঠল।

নেতাকর্মীরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করলেন। বোমা হামলা নেতাকর্মীদের নিথর দেহ পড়ে ছিল এদিক-ওদিক। আমরা বিক্ষোভ শুরু করলাম। প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দিলাম।

সোমবার রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে শিক্ষানবিস আইনজীবী কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হীরক পাশার সঙ্গে কথা হয়। যুগান্তরকে বলেন, ওইদিন বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। আতঙ্কিত মানুষ তখন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছিল। এর মধ্যে পুলিশ পল্টন ময়দানের দুই পাশের পথ বন্ধ করে দেয়।

পুলিশের সঙ্গে তখন সিপিবিকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সেদিন সমাবেশের মধ্যে যে লোক বোমা রেখে গিয়েছিল, সে ছিল ‘পাতলা গড়নের, লম্বা, দাড়িওয়ালা’। বয়স ত্রিশের নিচে। সে কালো একটা পলিথিনে মোড়ানো ব্যাগ রেখে চলে গিয়েছিল। আমি পাশেই ছিলাম।

তবে নেতাদের ছবি তোলার কথা খুলনার পুলককে বলতে ওখান থেকে উঠে যাই। এরপর ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ডের মধ্যে খুলনার দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল মজিদ ব্যাগটি কার জিজ্ঞাসা করে সেটা হাতে নেন। তখনই বোমাটি বিস্ফোরিত হয়।

সেদিন সমাবেশে ছিলেন আইনজীবী জিয়াদ আল মালুম। বর্তমানে তিনি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা চাই বিস্ফোরকের যে মামলাটি বিচারে রয়েছে, সেটির বিচার যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়।

সেই মামলার রায়ের জন্য আমাদের যেন দেড় যুগ অপেক্ষা করতে না হয়। পল্টনের সেই সমাবেশে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি একেএম সোহেল আহমেদ এ মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। রায়ের পর তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৯ বছর পর হলেও বিচার যে শেষ হয়েছে, তাতেই আমরা সন্তুষ্ট।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেদিন বিকাল ৫টার দিকে সিপিবির মহাসমাবেশে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো আলোর ঝলকানি দেখা যায়। মনে হল পল্টন ময়দানটাকে কে যেন একটা ঝাঁকি দিল। মনে হল বড় ধরনের ভূমিকম্প। এতে আমরা কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি হয়েছিলাম। প্রথমে ভেবে ছিলাম কেউ হয়তো পটকা ফুটিয়েছে।

একটু পরেই মনে হল পটকার শব্দ কী করে এত তীব্র হবে, মাটি কেঁপে উঠবে, আগুনের উল্কা দেখা যাবে? এরপর একটু এগোতেই দু’জনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখি। এ মধ্যে একজন হিমাংশু মণ্ডল। এরপর মরদেহ নিয়ে মিছিল হয়। স্টেডিয়ামের ভাসানী গেটের দিকে মিছিল গেলে পুলিশ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরদিন ২১ জানুয়ারি আধাবেলা দেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়।

অপর একজন বলেন, সমাবেশ চলাকালে মোর্শেদ আলীর (তৎকালীন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং কৃষক সমিতির সভাপতি) বক্তব্য দেয়ার সময় বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এর কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন মোটর শ্রমিক তৎকালীন সিপিবি সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান সম্পর্কে বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য সংবলিত কিছু লিফলেট বিতরণ করছিল।

তখন আমি এবং তৎকালীন খুলনা ছাত্র ইউনিয়নের রাসেল নামে একজন লিফলেট বিতরণকারীকে আটক করি। বোমা যেখানে বিস্ফোরণ ঘটে তার থেকে একটু দূরেই আমি ছিলাম। বিস্ফোরণের সময় আমি মাটিতে পড়ে যাই, বোমার আঘাতে আমার কানের পর্দা ফেটে যায়। মাটি থেকে উঠেই দেখি চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। এরপর দেখি কয়েকটি মরদেহ পড়ে আছে।

বর্তমানে সিপিবির সম্পাদক ও তৎকালীন সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বোমা হামলার প্রসঙ্গে বলেন, সেদিন সিপিবির সমাবেশের বিশেষত্ব ছিল সমাবেশে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, ক্ষেতমজুরসহ সমাজের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এবং কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াও সমস্ত বামপন্থী দলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন সরদার ফজলুল করিম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হাসান ইমাম প্রমুখ।

সেদিন সিপিবির লাখো মানুষের সমাবেশ দেশে বামপন্থীদের উত্থানের একটা বার্তা দেখা যাচ্ছিল। আমার ধারণা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বামপন্থীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের জন্য বোমা হামলা চালায়। যেন বামপন্থীদের উত্থান না ঘটতে না পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা মঞ্চে ছিলাম। মঞ্চ থেকে একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই।

প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি যে এমন একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেছে। আমরা তখনও মঞ্চ থেকে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে সমাবেশের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেই। কিছুক্ষণ পর দেখি রক্ত আর রক্ত। আমাদের চারজন নেতা সেখানেই মারা যান। এরপর সমাবেশের চারদিকে হুড়োহুড়ি লেগে যায়।

আহতদের কীভাবে হাসপাতালে পাঠানো যায় সেই ব্যবস্থা করা হয়। এ ঘটনায় আমাদের খুলনার সিপিপি নেতা হিমাংশু মণ্ডল বোমার আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় তিনি শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের মুক্তির প্রতীক লাল পতাকা হাতে উঁচু করে ধরে রেখেছিলেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×