ব্যাংকের টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে, জবাবদিহিতা নেই
jugantor
ব্যাংকের টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে, জবাবদিহিতা নেই

  সংসদ রিপোর্টার  

২৩ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাকং
বাংলাদেশ ব্যাকং। ফাইল ছবি

সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও জাতীয় মহিলা পার্টির সভানেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি বলেছেন, ‘সবাই বলেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আমরাও বলি। বিশ্বাসও করি। কিন্তু যারা যখন ক্ষমতায় থাকেন তারা যদি এর মমার্থ ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেন, তাহলে সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। মনে রাখতে হবে, শুধু একা প্রধানমন্ত্রী ভালো হলে হবে না। সরকার ও প্রশাসনের পুরো টিমকে প্রধানমন্ত্রীর মতো রাতদিন পরিশ্রম করে দুঃশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ উপহার দিতে হবে। তা না হলে জনগণ কাক্সিক্ষত ফল পাবে না।’

বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দুর্নীতির কথা যখন সামনে এলো তখন ব্যাংকিং খাত নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। আমি মনে করি, আজ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি প্রতিহত করা। কেননা জনগণের ট্যাক্স ও আমানতের টাকা ব্যাংক থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। কোনো জবাবদিহিতা নেই।

তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে অবলোপন নিয়ে কেউ কোনো কথা বলছেন না। অথচ এই অবলোপনের নামে নতুন এক বাহানা তৈরি করে লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি গোপন করা হচ্ছে। এখন আবার শুনতে পাচ্ছি, প্রভাবশালী চক্রটি ব্যাংকে অবলোপনের খাতাও রাখতে চান না। প্রশ্ন হল- কারা এলসির নামে কোনো পণ্য না এনে বড় বড় অঙ্কের অর্থ পাচার করেছেন। ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে জনগণের বিপুল পরিমাণ আমানতের টাকা আত্মসাৎ করল।

সংসদে যারা উপস্থিত আছেন, আমার সঙ্গে নিশ্চয় অনেকেই একমত হবেন যে, সবার আগে এসব ব্যাংক ডাকাতদের ধরতে হবে। যারা ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুট করেছে জাতির সামনে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক। কেননা শেয়ারবাজারে প্রতারণার শিকার হয়ে আজ দেশের লাখ লাখ মানুষ পুঁজি হারিয়ে পথে বসে গেছে।’

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘যারা এমনটা করল- তারা কারা? তারা তো ভিন্ন দেশ থেকে আসেননি। তারা সমাজে চিহ্নিত। প্রশ্ন হল- তাহলে তাদের ধরছি না কেন? মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলে এখানে শেয়ারবাজার লুটপাটকারীদের রক্ষা করা উচিত হবে না। শুধু আইওয়াশ তদন্ত ও অপসারণ করলে লাভ হবে না। গডফাদারসহ পুরো সিন্ডিকেটকে ধরতে হবে। এগুলো সব ফৌজদারি অপরাধ। এদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস করতেই হবে। এছাড়া যারা দেশের টাকা লুট করে বিদেশে বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছেন তাদের কথা নাই বা বললাম।’

ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘এ খাতের অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছেন, কোনো চুনোপুঁটি ধরে লাভ হবে না। যাদের অন্যায়, দুর্নীতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের কারণে ব্যাংক সাবাড় হয়ে গেছে, সেসব রাঘববোয়ালকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত এটি নিশ্চিত করতে না পারব, ততক্ষণ আমাদের সব প্রতিশ্রুতি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু হবে না। দেখা যাবে, প্রধানমন্ত্রী বহুবার নির্দেশ দেয়ার পরও রহস্যজনক কারণে ঋণের সুদহার যেমন সিঙ্গেল ডিজিট হচ্ছে না, তেমনি বিগশট ব্যাংক ডাকাতরাও কেউ ধরা পড়বে না।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা হয়। কিন্তু তারা জনগণের সেবক হয়ে সেবাপ্রার্থীদের বাস্তবে কতটুকু সেবা দিচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের মধ্যে কারা গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সেবা দেয়ার নামে অব্যাহতভাবে জনগণকে হয়রানির দুষ্টচক্রে ঠেলে দিচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। সময় এসেছে সত্যিকারার্থে ভালো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কৃত করার সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী নেতিবাচক মানসিকতার কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এরাই এক সময় সবকিছু গ্রাস করবে। সব সেক্টরে এই শ্রেণির কর্মকর্তাদের কারণে দলীয় সরকারকে এক সময় চরম মাশুল দিতে হয়। সেজন্য সরকারের নিজের স্বার্থেই এই শ্রেণির কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা জরুরি।’

সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা রাজনীতিবিদরা দিনভর জনগণের দোহাই দিয়ে কত কথা বলি। সবাই বলি জনগণ আমাদের পক্ষে। কিন্তু জনগণ যে আসলে কার পক্ষে, সেটি যদি যাচাই করার কোনো কষ্টিপাথর থাকত তাহলে ভালোই হতো। জনগণ যারই হোক না কেন- আমরা যারা রাজনীতি করি, তারা যেন জনগণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির পথ বেছে না নিই।’

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘রাজনীতি করতে এসে যদি নিজে ধনসম্পদের মালিক হওয়াসহ রাতারাতি ধনী হওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে সেই রাজনীতি আর যাই কিছু হোক ভালো কিছু দেবে না। কারও নাম উচ্চারণ করে কাউকে অসম্মান করতে চাই না। কিন্তু বাস্তবতা হল, বর্তমান সময়ে অনেকে রাজনীতি করেন শুধু দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য। তারা রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের বড় হাতিয়ার মনে করেন। তবে এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে অন্তত আমি সালমা ইসলাম এতটুকু বলতে পারি, আমার রাজনৈতিক জীবনে এই মোহ আমাকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না। বরং নিজেদের উপার্জন করা ঘামঝরা বিপুল অর্থ জনগণের পেছনে খরচ করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, সেজন্য জনগণের অন্তরের অন্তস্তল থেকে নিখাদ ভালোবাসাও পেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘জনগণকে বোকা বানানোর জন্য আমরা বক্তৃতায় হয়তো অনেক নীতি কথা বলতে পারব। বাস্তবে সেটি করে দেখাতে না পারলে জনগণ সুযোগ পেলে আমাদের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে। এছাড়া এখন জনগণ অনেক সচেতন। নানা কারণে প্রকাশ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না পারলেও ঠিকই তারা আসল সত্যটা বোঝেন। তাই আমি মনে করি, আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা যারা সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছি, তাদের অন্তত জনগণের জন্য গ্রহণযোগ্য রাজনীতি করা উচিত। বিশেষ করে জনগণের শক্তির বাইরে রাজনীতিবিদের জন্য বাস্তবিক অর্থে ভিন্ন কিছু নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময়, অনেক কিছু বিকল্পের মতো দেখায়, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে চিরন্তন সত্য হল- গণতান্ত্রিক রাজনীতি সব সময় সাধারণ জনগণ ও সম্মানিত ভোটারদের ঘিরেই আবর্তিত হয়। এর বাইরে প্রকৃত বন্ধু বলতে আর কিছু নেই। কিন্তু অতীতে যাদের জনবিচ্ছিন্ন করা হয়েছে তাদের পরিণতি রাজনীতির ইতিহাসে লেখা আছে। তাই গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নত জাতি গঠনের বিষয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার বক্তৃতায় জনমনে প্রত্যাশা সৃষ্টি করার যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিশ্চয় সরকার বাস্তবায়ন করবে। এই মহান সংসদে এটিই আজকের প্রত্যাশা।’

শুরুতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ স্মরণ করে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী দরজায় কড়া নাড়ছে। আর মাত্র একটি বছর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান আগামী মার্চে। এই ক্ষণে স্মরণ করছি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।’

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘একই সঙ্গে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি- তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। নানামুখী ষড়যন্ত্রের মধ্যেও যিনি শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপটে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিতে পেরে প্রথমেই আমি মহান রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করছি। বিনম্র চিত্তে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ ভাষা শহীদ ও একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন দিয়েছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবদান স্মরণ করে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই, জাতীয় পার্টির প্রাণপুরুষ, আমাদের পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রেখে গেছেন তার হাজারও ভালো কাজ। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যার হাত ধরে জাতীয় পার্টি আজ সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জনসহ বহুমুখী সাফল্যের পথ পাড়ি দিতে পেরেছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করাসহ জাতীয় পার্টিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আমাদের পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের নিজেকে দলের জন্য উৎসর্গ করেছেন। যিনি দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। আমি তার প্রতিও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই, সংসদের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের চিফ প্যাট্রন বেগম রওশন এরশাদের প্রতি। তিনি মায়ের মতো মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে আমাকে রাজনীতিতে সব সময় অনুপ্রাণিত করেন।’

মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বক্তব্য সম্পর্কে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি একজন ভালো ইমেজের ব্যক্তিত্ব। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও অনেক বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। দেশ ও জাতি গঠনে অভিভাবকসুলভ বক্তব্য দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে যুব সমাজ নিয়ে তার বিরাট স্বপ্ন রয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের চলতি বছরের প্রথম অধিবেশনের ভাষণেও মহামান্য রাষ্ট্রপতি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের অবতারণা করেছেন। তিনি ভাষণের এক স্থানে বলেছেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী রূপ পেতে পারে না।’ এছাড়া তিনি গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সবার ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।’

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন আমরা তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই। আশা করব, সাধারণ জনগণ দেশে যে ধরনের সুশাসন দেখতে চায় এবং যেভাবে দেশ পরিচালনা করলে সরকারের ভাবমূর্তিও বাড়বে, সরকার নিশ্চয়ই সেভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’ কথা এবং কাজের মধ্যে মিল থাকতে হবে। তা না হলে জনগণ আমাদের বিশ্বাস করবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন, রাজনীতি হল ত্যাগের জায়গা। এখানে ভোগের কিছু নেই। আমিও মনে করি, আমরা যারা রাজনীতি করি তাদের অক্ষরে অক্ষরে এই সত্য অনুধাবন করে বাস্তবে প্রয়োগ করা উচিত। তাহলে জনগণ আমাদের বিশ্বাস করবে এবং নির্বাচনের সময় যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হবে।’

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘কোনো ভালো কাজ বা উদ্যোগ কখনও বিফলে যায় না। যেমন- কিছু বিষয়ে বর্তমান সরকারের অনেক সমালোচনা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাসিনোবিরোধী যে অভিযান পরিচালিত হয়েছে, তা সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ সমর্থন করেছে। অভিবাদন জানিয়েছে। অনেককে এও বলতে শুনেছি, আওয়ামী লীগ সরকার যতদিন ক্ষমতায় আছে তার মধ্যে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আবার কিছুদিন চলার পর এখন ঝিমিয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে উল্টোগতিতে অনেক সমালোচনাও হচ্ছে। আমরাও চাই, এটি অব্যাহত থাকুক। সমাজ ও প্রশাসনের কাউকে ছাড় না দিয়ে এই অভিযান শক্তভাবে অব্যাহত রাখলে বহুমুখী উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে আর বক্তব্য দেয়ার প্রয়োজন হবে না।’

তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের কথা যখন সামনে এলো, তখন আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসন আমলের কথা না বলে পারছি না। দেশের বড় বড় অবকাঠামোগত যত উন্নয়ন হয়েছে তার বেশির ভাগ হয়েছে জাতীয় পার্টির শাসনামলে। আমাদের প্রয়াত নেতা শুধু কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তিনি ভোরে উঠে পত্রিকা পড়েই অ্যাকশন নিতেন। খবরের কাগজের সংবাদকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ওই সময় অনিয়ম, দুর্নীতি ও জনহয়রানির খবর পত্রিকায় আসামাত্র তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেন। নিজেই গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে পড়তেন রাস্তায়। সাধারণ মানুষের খবর নেয়া ছাড়াও কোনো লাইটপোস্টে বাতি না জ্বললে সেখানে দাঁড়িয়ে বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করতেন। এছাড়া তার শাসনামলে ভয়াবহ বন্যার সময় তিনি কিভাবে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটি সবার জনা আছে।’

সাবেক প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ যতই সমালোচনা করুক। এসব ইতিহাস কেউ কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। এজন্য গ্রামের সাধারণ মানুষ ও মুরব্বিরা এখনও এরশাদকে ভালোবাসেন। আমাদের কাছে তার এসব গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা চিরদিন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার রেখে যাওয়া ১৮ দফা এবং অসংখ্য ভালো কাজের উদাহরণকে সামনে রেখে তারই সুযোগ্য ভাই আমাদের দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিভাবে দলের ভেতরে ও বাইরে রাজনীতিতে সত্যিকার গুণগত পরিবর্তন আনা যায়, সেটিই তার মূল লক্ষ্য।

তিনি আমাদের সব সময় বলেন, রাজনীতি করছি জনগণের জন্য। তাই যে রাজনীতি জনগণ পছন্দ করে না, তা আমরা করব না। বেশির ভাগ জনগণ রাজনীতিবিদদের যেভাবে দেখতে চায়, জাতীয় পার্টির প্রতিটি কর্মীকে সেই চরিত্রে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করব না। সময় এবং জনগণই ঠিক করবে আমাদের কখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। তবে রাজনীতি যেহেতু করি, সেহেতু ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন তো অবশ্যই দেখি। কেননা ক্ষমতায় যাওয়া ছাড়া জনগণকে সেবা করার বড় মাধ্যম আর নেই। আমরা আমাদের পার্টি চেয়ারম্যানের এই নির্দেশনাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করছি।’

নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা এখন ক্লান্ত প্রায়। তবু বলতে হবে। থেমে গেলে চলবে না। প্রতিবাদের ধারা অব্যাহত থাকলে এক সময় পরিবর্তন আসবেই। পত্রিকার পাতা খুললে, টিভি সংবাদে চোখ রাখলে প্রতিদিনই ভয়াবহ নানা নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে। এর মধ্যে ধর্ষণ এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। আসলে এটি আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের চরম এক রূপ। তবে শুধু সরকারের একার পক্ষে আইন দিয়ে এর সমাধান হবে না। প্রতিটি পরিবার থেকে এ বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের সন্তানদের আমরা কিভাবে গড়ে তুলছি এবং বর্তমানে প্রযুক্তির চরম উন্নতির যুগে সন্তানরা কিভাবে ভার্চুয়াল লাইফে সময় কাটাচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।’

শিল্পায়নে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘একটি কথা বলব, যতক্ষণ আমরা দেশকে শিল্পে উন্নত করতে না পারব ততক্ষণ প্রকৃত অর্থে আমরা উন্নতির কাক্সিক্ষত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারব না। সেজন্য বাস্তবিক অর্থে কী করা উচিত- সে বিষয়ে আমি কাউকে জ্ঞানও দিতে চাই না। কেননা সরকারের মন্ত্রিসভায় অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি রয়েছেন। শুধু এতটুকু বলব,

‘আমরা যদি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারি তাহলে আমদানিনির্ভর কোনো শিল্প বেশিদিন টিকবে না। সেজন্য সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণকে সামনে রেখে বাস্তবসম্মত পলিসি প্রণয়ন করতে হবে। প্রণোদনা প্রদানসহ নানারকম সাপোর্ট দিয়ে অগ্রসরগামী বিভিন্ন শিল্পকে বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দিতে হবে। কিন্তু আমরা যদি সেটি সময়মতো করতে ব্যর্থ হই, তাহলে দেশের বস্ত্র খাতসহ বহু সেক্টর অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। তখন সংকট আরও ঘনীভূত হবে।’

ব্যাংকের টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে, জবাবদিহিতা নেই

 সংসদ রিপোর্টার 
২৩ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ ব্যাকং
বাংলাদেশ ব্যাকং। ফাইল ছবি

সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও জাতীয় মহিলা পার্টির সভানেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি বলেছেন, ‘সবাই বলেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আমরাও বলি। বিশ্বাসও করি। কিন্তু যারা যখন ক্ষমতায় থাকেন তারা যদি এর মমার্থ ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেন, তাহলে সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। মনে রাখতে হবে, শুধু একা প্রধানমন্ত্রী ভালো হলে হবে না। সরকার ও প্রশাসনের পুরো টিমকে প্রধানমন্ত্রীর মতো রাতদিন পরিশ্রম করে দুঃশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ উপহার দিতে হবে। তা না হলে জনগণ কাক্সিক্ষত ফল পাবে না।’

বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দুর্নীতির কথা যখন সামনে এলো তখন ব্যাংকিং খাত নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। আমি মনে করি, আজ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি প্রতিহত করা। কেননা জনগণের ট্যাক্স ও আমানতের টাকা ব্যাংক থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। কোনো জবাবদিহিতা নেই।

তিনি আরও বলেন,বিশেষ করে অবলোপন নিয়ে কেউ কোনো কথা বলছেন না। অথচ এই অবলোপনের নামে নতুন এক বাহানা তৈরি করে লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি গোপন করা হচ্ছে। এখন আবার শুনতে পাচ্ছি, প্রভাবশালী চক্রটি ব্যাংকে অবলোপনের খাতাও রাখতে চান না। প্রশ্ন হল- কারা এলসির নামে কোনো পণ্য না এনে বড় বড় অঙ্কের অর্থ পাচার করেছেন। ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে জনগণের বিপুল পরিমাণ আমানতের টাকা আত্মসাৎ করল।

সংসদে যারা উপস্থিত আছেন, আমার সঙ্গে নিশ্চয় অনেকেই একমত হবেন যে, সবার আগে এসব ব্যাংক ডাকাতদের ধরতে হবে। যারা ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুট করেছে জাতির সামনে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক। কেননা শেয়ারবাজারে প্রতারণার শিকার হয়ে আজ দেশের লাখ লাখ মানুষ পুঁজি হারিয়ে পথে বসে গেছে।’

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘যারা এমনটা করল- তারা কারা? তারা তো ভিন্ন দেশ থেকে আসেননি। তারা সমাজে চিহ্নিত। প্রশ্ন হল- তাহলে তাদের ধরছি না কেন? মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলে এখানে শেয়ারবাজার লুটপাটকারীদের রক্ষা করা উচিত হবে না। শুধু আইওয়াশ তদন্ত ও অপসারণ করলে লাভ হবে না। গডফাদারসহ পুরো সিন্ডিকেটকে ধরতে হবে। এগুলো সব ফৌজদারি অপরাধ। এদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস করতেই হবে। এছাড়া যারা দেশের টাকা লুট করে বিদেশে বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছেন তাদের কথা নাই বা বললাম।’

ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘এ খাতের অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছেন, কোনো চুনোপুঁটি ধরে লাভ হবে না। যাদের অন্যায়, দুর্নীতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের কারণে ব্যাংক সাবাড় হয়ে গেছে, সেসব রাঘববোয়ালকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত এটি নিশ্চিত করতে না পারব, ততক্ষণ আমাদের সব প্রতিশ্রুতি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু হবে না। দেখা যাবে, প্রধানমন্ত্রী বহুবার নির্দেশ দেয়ার পরও রহস্যজনক কারণে ঋণের সুদহার যেমন সিঙ্গেল ডিজিট হচ্ছে না, তেমনি বিগশট ব্যাংক ডাকাতরাও কেউ ধরা পড়বে না।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা হয়। কিন্তু তারা জনগণের সেবক হয়ে সেবাপ্রার্থীদের বাস্তবে কতটুকু সেবা দিচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের মধ্যে কারা গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সেবা দেয়ার নামে অব্যাহতভাবে জনগণকে হয়রানির দুষ্টচক্রে ঠেলে দিচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। সময় এসেছে সত্যিকারার্থে ভালো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কৃত করার সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী নেতিবাচক মানসিকতার কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এরাই এক সময় সবকিছু গ্রাস করবে। সব সেক্টরে এই শ্রেণির কর্মকর্তাদের কারণে দলীয় সরকারকে এক সময় চরম মাশুল দিতে হয়। সেজন্য সরকারের নিজের স্বার্থেই এই শ্রেণির কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা জরুরি।’

সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা রাজনীতিবিদরা দিনভর জনগণের দোহাই দিয়ে কত কথা বলি। সবাই বলি জনগণ আমাদের পক্ষে। কিন্তু জনগণ যে আসলে কার পক্ষে, সেটি যদি যাচাই করার কোনো কষ্টিপাথর থাকত তাহলে ভালোই হতো। জনগণ যারই হোক না কেন- আমরা যারা রাজনীতি করি, তারা যেন জনগণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির পথ বেছে না নিই।’

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘রাজনীতি করতে এসে যদি নিজে ধনসম্পদের মালিক হওয়াসহ রাতারাতি ধনী হওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে সেই রাজনীতি আর যাই কিছু হোক ভালো কিছু দেবে না। কারও নাম উচ্চারণ করে কাউকে অসম্মান করতে চাই না। কিন্তু বাস্তবতা হল, বর্তমান সময়ে অনেকে রাজনীতি করেন শুধু দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য। তারা রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের বড় হাতিয়ার মনে করেন। তবে এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে অন্তত আমি সালমা ইসলাম এতটুকু বলতে পারি, আমার রাজনৈতিক জীবনে এই মোহ আমাকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না। বরং নিজেদের উপার্জন করা ঘামঝরা বিপুল অর্থ জনগণের পেছনে খরচ করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, সেজন্য জনগণের অন্তরের অন্তস্তল থেকে নিখাদ ভালোবাসাও পেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘জনগণকে বোকা বানানোর জন্য আমরা বক্তৃতায় হয়তো অনেক নীতি কথা বলতে পারব। বাস্তবে সেটি করে দেখাতে না পারলে জনগণ সুযোগ পেলে আমাদের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে। এছাড়া এখন জনগণ অনেক সচেতন। নানা কারণে প্রকাশ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না পারলেও ঠিকই তারা আসল সত্যটা বোঝেন। তাই আমি মনে করি, আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা যারা সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছি, তাদের অন্তত জনগণের জন্য গ্রহণযোগ্য রাজনীতি করা উচিত। বিশেষ করে জনগণের শক্তির বাইরে রাজনীতিবিদের জন্য বাস্তবিক অর্থে ভিন্ন কিছু নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময়, অনেক কিছু বিকল্পের মতো দেখায়, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে চিরন্তন সত্য হল- গণতান্ত্রিক রাজনীতি সব সময় সাধারণ জনগণ ও সম্মানিত ভোটারদের ঘিরেই আবর্তিত হয়। এর বাইরে প্রকৃত বন্ধু বলতে আর কিছু নেই। কিন্তু অতীতে যাদের জনবিচ্ছিন্ন করা হয়েছে তাদের পরিণতি রাজনীতির ইতিহাসে লেখা আছে। তাই গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নত জাতি গঠনের বিষয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার বক্তৃতায় জনমনে প্রত্যাশা সৃষ্টি করার যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিশ্চয় সরকার বাস্তবায়ন করবে। এই মহান সংসদে এটিই আজকের প্রত্যাশা।’

শুরুতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ স্মরণ করে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী দরজায় কড়া নাড়ছে। আর মাত্র একটি বছর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান আগামী মার্চে। এই ক্ষণে স্মরণ করছি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।’

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘একই সঙ্গে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি- তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। নানামুখী ষড়যন্ত্রের মধ্যেও যিনি শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপটে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিতে পেরে প্রথমেই আমি মহান রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করছি। বিনম্র চিত্তে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ ভাষা শহীদ ও একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন দিয়েছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবদান স্মরণ করে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই, জাতীয় পার্টির প্রাণপুরুষ, আমাদের পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রেখে গেছেন তার হাজারও ভালো কাজ। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যার হাত ধরে জাতীয় পার্টি আজ সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জনসহ বহুমুখী সাফল্যের পথ পাড়ি দিতে পেরেছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করাসহ জাতীয় পার্টিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আমাদের পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের নিজেকে দলের জন্য উৎসর্গ করেছেন। যিনি দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। আমি তার প্রতিও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই, সংসদের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের চিফ প্যাট্রন বেগম রওশন এরশাদের প্রতি। তিনি মায়ের মতো মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে আমাকে রাজনীতিতে সব সময় অনুপ্রাণিত করেন।’

মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বক্তব্য সম্পর্কে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি একজন ভালো ইমেজের ব্যক্তিত্ব। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও অনেক বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। দেশ ও জাতি গঠনে অভিভাবকসুলভ বক্তব্য দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে যুব সমাজ নিয়ে তার বিরাট স্বপ্ন রয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের চলতি বছরের প্রথম অধিবেশনের ভাষণেও মহামান্য রাষ্ট্রপতি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের অবতারণা করেছেন। তিনি ভাষণের এক স্থানে বলেছেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী রূপ পেতে পারে না।’ এছাড়া তিনি গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সবার ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।’

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন আমরা তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই। আশা করব, সাধারণ জনগণ দেশে যে ধরনের সুশাসন দেখতে চায় এবং যেভাবে দেশ পরিচালনা করলে সরকারের ভাবমূর্তিও বাড়বে, সরকার নিশ্চয়ই সেভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’ কথা এবং কাজের মধ্যে মিল থাকতে হবে। তা না হলে জনগণ আমাদের বিশ্বাস করবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন, রাজনীতি হল ত্যাগের জায়গা। এখানে ভোগের কিছু নেই। আমিও মনে করি, আমরা যারা রাজনীতি করি তাদের অক্ষরে অক্ষরে এই সত্য অনুধাবন করে বাস্তবে প্রয়োগ করা উচিত। তাহলে জনগণ আমাদের বিশ্বাস করবে এবং নির্বাচনের সময় যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হবে।’

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘কোনো ভালো কাজ বা উদ্যোগ কখনও বিফলে যায় না। যেমন- কিছু বিষয়ে বর্তমান সরকারের অনেক সমালোচনা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাসিনোবিরোধী যে অভিযান পরিচালিত হয়েছে, তা সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ সমর্থন করেছে। অভিবাদন জানিয়েছে। অনেককে এও বলতে শুনেছি, আওয়ামী লীগ সরকার যতদিন ক্ষমতায় আছে তার মধ্যে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আবার কিছুদিন চলার পর এখন ঝিমিয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে উল্টোগতিতে অনেক সমালোচনাও হচ্ছে। আমরাও চাই, এটি অব্যাহত থাকুক। সমাজ ও প্রশাসনের কাউকে ছাড় না দিয়ে এই অভিযান শক্তভাবে অব্যাহত রাখলে বহুমুখী উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে আর বক্তব্য দেয়ার প্রয়োজন হবে না।’

তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের কথা যখন সামনে এলো, তখন আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসন আমলের কথা না বলে পারছি না। দেশের বড় বড় অবকাঠামোগত যত উন্নয়ন হয়েছে তার বেশির ভাগ হয়েছে জাতীয় পার্টির শাসনামলে। আমাদের প্রয়াত নেতা শুধু কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তিনি ভোরে উঠে পত্রিকা পড়েই অ্যাকশন নিতেন। খবরের কাগজের সংবাদকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ওই সময় অনিয়ম, দুর্নীতি ও জনহয়রানির খবর পত্রিকায় আসামাত্র তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেন। নিজেই গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে পড়তেন রাস্তায়। সাধারণ মানুষের খবর নেয়া ছাড়াও কোনো লাইটপোস্টে বাতি না জ্বললে সেখানে দাঁড়িয়ে বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করতেন। এছাড়া তার শাসনামলে ভয়াবহ বন্যার সময় তিনি কিভাবে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটি সবার জনা আছে।’

সাবেক প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ যতই সমালোচনা করুক। এসব ইতিহাস কেউ কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। এজন্য গ্রামের সাধারণ মানুষ ও মুরব্বিরা এখনও এরশাদকে ভালোবাসেন। আমাদের কাছে তার এসব গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা চিরদিন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার রেখে যাওয়া ১৮ দফা এবং অসংখ্য ভালো কাজের উদাহরণকে সামনে রেখে তারই সুযোগ্য ভাই আমাদের দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিভাবে দলের ভেতরে ও বাইরে রাজনীতিতে সত্যিকার গুণগত পরিবর্তন আনা যায়, সেটিই তার মূল লক্ষ্য।

তিনি আমাদের সব সময় বলেন, রাজনীতি করছি জনগণের জন্য। তাই যে রাজনীতি জনগণ পছন্দ করে না, তা আমরা করব না। বেশির ভাগ জনগণ রাজনীতিবিদদের যেভাবে দেখতে চায়, জাতীয় পার্টির প্রতিটি কর্মীকে সেই চরিত্রে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করব না। সময় এবং জনগণই ঠিক করবে আমাদের কখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। তবে রাজনীতি যেহেতু করি, সেহেতু ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন তো অবশ্যই দেখি। কেননা ক্ষমতায় যাওয়া ছাড়া জনগণকে সেবা করার বড় মাধ্যম আর নেই। আমরা আমাদের পার্টি চেয়ারম্যানের এই নির্দেশনাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করছি।’

নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা এখন ক্লান্ত প্রায়। তবু বলতে হবে। থেমে গেলে চলবে না। প্রতিবাদের ধারা অব্যাহত থাকলে এক সময় পরিবর্তন আসবেই। পত্রিকার পাতা খুললে, টিভি সংবাদে চোখ রাখলে প্রতিদিনই ভয়াবহ নানা নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে। এর মধ্যে ধর্ষণ এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। আসলে এটি আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের চরম এক রূপ। তবে শুধু সরকারের একার পক্ষে আইন দিয়ে এর সমাধান হবে না। প্রতিটি পরিবার থেকে এ বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের সন্তানদের আমরা কিভাবে গড়ে তুলছি এবং বর্তমানে প্রযুক্তির চরম উন্নতির যুগে সন্তানরা কিভাবে ভার্চুয়াল লাইফে সময় কাটাচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।’

শিল্পায়নে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘একটি কথা বলব, যতক্ষণ আমরা দেশকে শিল্পে উন্নত করতে না পারব ততক্ষণ প্রকৃত অর্থে আমরা উন্নতির কাক্সিক্ষত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারব না। সেজন্য বাস্তবিক অর্থে কী করা উচিত- সে বিষয়ে আমি কাউকে জ্ঞানও দিতে চাই না। কেননা সরকারের মন্ত্রিসভায় অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি রয়েছেন। শুধু এতটুকু বলব,

‘আমরা যদি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারি তাহলে আমদানিনির্ভর কোনো শিল্প বেশিদিন টিকবে না। সেজন্য সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণকে সামনে রেখে বাস্তবসম্মত পলিসি প্রণয়ন করতে হবে। প্রণোদনা প্রদানসহ নানারকম সাপোর্ট দিয়ে অগ্রসরগামী বিভিন্ন শিল্পকে বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দিতে হবে। কিন্তু আমরা যদি সেটি সময়মতো করতে ব্যর্থ হই, তাহলে দেশের বস্ত্র খাতসহ বহু সেক্টর অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। তখন সংকট আরও ঘনীভূত হবে।’