অন্তর্বর্তী রায়ে মিয়ানমারের প্রতি ৪ নির্দেশ

রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে আইসিজের আদেশ

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে * গণহত্যার আলামত নষ্ট করা যাবে না * দোষী সেনাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে * চার মাসের মধ্যে আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানাতে হবে * বিচারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মিয়ানমারের আপত্তি খারিজ * যুদ্ধাপরাধ হতে পারে, তবে গণহত্যা হয়নি : সু চি

  যুগান্তর ডেস্ক ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা গণহত্যা রোধে মিয়ানমারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। বিচারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মিয়ানমারের করা আপত্তি খারিজ করে দিয়ে আইসিজে চার দফা আদেশ দেন।

এগুলো হল-রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে; দোষী সেনাসদস্যদের বিচারের আওতায় আনতে হবে; গণহত্যার আলামত নষ্ট করা যাবে না এবং চার মাসের মধ্যে আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে জানাতে হবে।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলায় বৃহস্পতিবার আইসিজে অন্তর্বর্তী রায়ে এ আদেশ দেন। গাম্বিয়া যেসব ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করেছিল, আদালত সেগুলো হুবহু অনুসরণ না করে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। খবর বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্সের।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস-আইসিজে) অন্তর্বর্তী আদেশে বলা হয়, রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার বিচার চলবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যে কোনো নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেন কোনো গণহত্যায় না জড়ায়, সে বিষয়ে হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনী যাতে উসকানি না দেয়, কিংবা নির্যাতনের চেষ্টা না করে, সেজন্য ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য মিয়ানমারের গৃহীত ব্যবস্থাগুলো চার মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

এ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ছয় মাস পর পর আদালতকে জানাতে হবে। রাখাইনে এখনও ছয় লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। আদেশে তাদের সুরক্ষা দিতে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আইসিজের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুল কোয়াই আহমেদ ইউসুফ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় এ আদেশ পড়ে শোনান। এ সময় অপর ১৪ জন স্থায়ী বিচারপতি এবং দু’জন অ্যাডহক বিচারপতি আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।

আইসিজের আদেশ দেয়ার পরপরই এক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক আদেশ। এ আদেশের মাধ্যমে মানবতার বিজয় হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের কাছে এটি একটি মাইলফলক। গাম্বিয়া, ওআইসি, রোহিঙ্গা এবং অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য এটি বড় বিজয়। এ আদেশকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন জেনেভা দফতরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি।

এদিকে আইসিজের আদেশের প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি বলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনা অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যুদ্ধাপরাধ হতে পারে। তবে গণহত্যার ঘটনা ঘটেনি।

তিনি বলেন, মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের তদন্তকারীদের ‘অপ্রমাণিত কাহিনি’র ভুক্তভোগী হচ্ছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা নির্যাতনে দোষীদের শাস্তি মিয়ানমার নিজেই দিতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে মিয়ানমারের প্রতিনিধি এবং আইনজীবীরা এ আদেশের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আদালতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও একজন অ্যাডহক বিচারপতি এ আদেশের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তবে আদালত সর্বসম্মতভাবে গণহত্যা সনদের ধারা-২ এর আওতায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সব ধরনের সুরক্ষা দেয়ার বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য মিয়ানমারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রতিক্রিয়ায় গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু বলেন, রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ অবসানে এটি একটি ছোট পদক্ষেপ; কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সুরক্ষায় বিশ্বকে এখন এগিয়ে আসতে হবে। রোহিঙ্গা প্রতিনিধি তুন খিন আদেশকে একটি মাইলফলক বলে বর্ণনা করেন। সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল আজিজ আবুহামেদ আদেশকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় একটি বড় অগ্রগতি বলে মন্তব্য করেন।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে গত বছরের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। গত বছরের ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর মামলার শুনানি হয়।

১০ ডিসেম্বর গাম্বিয়ার প্রতিনিধিদল আদালতে গণহত্যার বিষয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করে। শুনানিতে গাম্বিয়ার পক্ষে মামলার প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির বিচারমন্ত্রী আবু বাকার তাম্বাদু। ১১ ডিসেম্বর মিয়ানমারের নেতৃত্ব দেন মিয়ানমারের সরকারপ্রধান অং সান সু চি। সেখানে তিনি তার দেশের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। ১২ ডিসেম্বর মামলার শুনানি শেষ হয়।

শুনানিতে মামলাকারী গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে ছয়টি বিষয়ে আদেশ চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল- গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমার অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবে; মিলিটারি, প্যারামিলিটারি ও বেসামরিক অস্ত্রধারী ব্যক্তি যেন কোনো ধরনের গণহত্যা না চালাতে পারে, সে ব্যবস্থা নেয়া; গণহত্যা সংক্রান্ত কোনো ধরনের আলামত নষ্ট না করা এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও খারাপ করে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়া।

পঞ্চম বিষয়টি হল- আদেশের পরে আগামী চার মাসের মধ্যে উভয়পক্ষ তাদের নেয়া পদক্ষেপ আদালতকে অবহিত করবে। মিয়ানমার ও গাম্বিয়া উভয়ে ১৯৪৯ সালে গৃহীত গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। এ সনদের বাধ্যবাধকতা পূরণে মিয়ানমারকে বাধ্য করার লক্ষ্যে মামলা করে গাম্বিয়া।

অন্যদিকে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে সু চি দাবি করেছিলেন রাখাইনের পরিস্থিতি সম্পর্কে গাম্বিয়া যে চিত্র আদালতে উপস্থাপন করেছে, তা ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’। দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শোনার পর আইসিজের ১৭ সদস্যের বিচারক প্যানেল বিষয়টি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, আইসিজের আদেশ মিয়ানমারের পক্ষে উপেক্ষা করা সহজ নয়। আর নেপিদো আদেশ বাস্তবায়ন না করলেও অন্য পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ পাবে গাম্বিয়া। তারা বলছেন, সব দিক দিয়ে এটি একটি ঐতিহাসিক আদেশ। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টসের কমিশনার রিড ব্রোডি বলেন, বিশ্বের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ আদালত আমাদের সময়ে সংঘটিত সব থেকে ভয়ংকর এক গণনৃশংসতার বিরুদ্ধে আদেশ দিয়েছেন।

এ মামলার প্রকৃতি খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত দ্রুততর সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা জরুরি। এ নিয়ে আরও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিকভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, সু চিকে হেগে পাঠিয়ে মিয়ানমার আইসিজের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। আদালতের বৈধতা অস্বীকার করা এখন তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমার আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাস্তবায়ন না করলে গাম্বিয়া মামলাটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থানান্তর করতে পারবে। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবে, মিয়ানমারকে তারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধ্য করবে কি না। মিয়ানমার আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করলে দায়ী হবে।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগের ব্যাপারে তাম্বাদু বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক বাসিন্দারা সংগঠিত হামলা চালিয়েছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে; মায়ের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ছুড়ে মেরেছে, পুরুষদের ধরে ধরে মেরে ফেলেছে, মেয়েদের ধর্ষণ করেছে এবং সব ধরনের যৌন নির্যাতন করেছে।

১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডা গণহত্যার সঙ্গে তুলনা দিয়ে তিনি বলেন, রুয়ান্ডায় টুটসিদের ওপর যে রকম অপরাধ করা হয়েছিল, এটা সেরকমই করা হয়েছে। ওই গণহত্যার সব বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য এটা মিয়ানমারের সরকারের একটা চেষ্টা।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মিয়ানমার কাউকে ফেরত নেয়নি। আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা করার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে, সে ব্যাপারে বিশ্বব্যাপীকে কিছু করার জন্য তাগিদ দেয়া।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত