মানবতার জয় হয়েছে: আইসিজের আদেশের প্রতিক্রিয়া

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) অন্তর্বর্তী আদেশে বাংলাদেশ ও মানবতার জয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। আইসিজের আদেশ দেয়ার পরপরই এক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক আদেশ।

এ আদেশের মাধ্যমে মানবতার বিজয় হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের কাছে এটি একটি মাইলফলক। গাম্বিয়া, ওআইসি, রোহিঙ্গা এবং অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য এটি বড় বিজয়। বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগে আইসিজের আদেশের পর তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন এ মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশ যথার্থ হয়েছে। রোহিঙ্গা হত্যার দায় মিয়ানমারকেই নিতে হবে। আর রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে হবে। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে আইসিজের আদেশে বাংলাদেশের বিজয় হয়েছে। ফলে গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া সহজ হবে।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আইসিজে’র আদেশকে বিশ্বের মুক্তিকামী শান্তিপ্রিয় মানুষের বিজয় উল্লেখ করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেছেন, এ আদেশে পরিলক্ষিত হয়েছে, বিশ্বের মানুষ চায় রোহিঙ্গাদের সমস্যার সমাধান হোক। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রকৃত আবাসভূমি ফিরিয়ে দিলেই

এই সমস্যার সমাধান হবে। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলএলএম ‘ল’ ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডুলা) নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানের বাইরে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। আইসিজের সিদ্ধান্তকে স্বাগত বিএনপি’র : মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় আইসিজের দেয়া সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি।

বৃহস্পতিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গাম্বিয়াকে আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তাদের উদ্যোগে আজ আন্তর্জাতিক আদালত চারটি বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপরসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সন্ধ্যা ৭টা থেকে দুই ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়।

বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব ছাড়াও ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রমুখ। স্কাইপে লন্ডন থেকে বৈঠকে যুক্ত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আন্তর্জাতিক আদালত মিয়ানমারকে বলেছেন, জেনোসাইড যেন আর না ঘটে, এজন্য তাদেরকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর যেন খারাপ না হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। গাম্বিয়া যে মামলা করেছে, এখন তার বিচারটা চলতে থাকবে। ভারত সীমান্তে গত কয়েক দিনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তা বন্ধের দাবিও জানিয়েছে স্থায়ী কমিটি।

এছাড়া সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের প্রচারে বাধা দেয়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা হচ্ছে তারা (কমিশন) বলছে যে, ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেটরা কাজ করছে। কোথাও কোনো ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছে বলে আমাদের জানা নেই।

এ রায় আমাদের জন্য অনেক বড় বিজয়: বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের এক অনুষ্ঠানে এর পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, এ রায় আমাদের জন্য অনেক বড় জয়। এই আদেশ আমাদের পক্ষে না গেলে সংকট আরও বাড়ত।

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর এখন উপযুক্ত সময়। এ রায়ে প্রমাণিত হয়েছে, রাখাইনে গণহত্যা চালানো হয়েছে। এই রায় রোহিঙ্গা জনগণের জন্যও একটি বিজয়। সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, এই সফলতা আগামী দিনে কাজ করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক নাহিদা সোবহান বলেন, এ রায় বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত রিপোর্ট দিতে হবে, যা এই সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিবাচক। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেন, এ রায় রোহিঙ্গা জনগণের জন্যও একটি বিজয়। এ রায় পরবর্তী সময়ে অন্য দেশগুলোকেও এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে ভূমিকা রাখবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসীন বলেন, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় অর্জন। মিয়ানমার গণহত্যা চালিয়েছে, সেটা প্রমাণ হয়েছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের (সিপিজে) বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইসিজের চারটি অন্তর্বর্তী আদেশ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের প্রাথমিক ধাপ।

সিপিজে মনে করে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী আদেশ প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ প্রক্রিয়া শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, বরং আক্রান্ত সব জনগোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া এ আদেশ মিয়ানমারকে প্রমাণ সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক তদন্তকারীদের প্রবেশাধিকার দিতে বাধ্য করবে- যা এ বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাহীনভাবে চলতে সাহায্য করবে।

আইসিজের আদেশে রোহিঙ্গাদের স্বস্তি : উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশে রোহিঙ্গারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এ আদেশকে তারা প্রাথমিক বিজয় হিসেবে দেখছেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় উখিয়ার ময়নারঘোনা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মাস্টার নুরুল কবির জানান, এতে রোহিঙ্গাদের আশার প্রতিফলন ঘটেছে।

কুতুপালং আন রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা ও রোহিঙ্গা রিফিউজি কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম জানান, আইসিজের আদেশের পর রোহিঙ্গারা নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার মতো খুশি হয়েছে। আইসিজের আদেশ মিয়ানমার রক্ষা করলে ২০২০ সালের মধ্যে সব রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে।

এ রায়ের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক বিজয় শুরু হয়েছে। মধুরছড়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা ইলিয়াছ জানায়, এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতন গণহত্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। মসজিদে দোয়া-মোনাজাত করে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া সরকার এবং রোহিঙ্গাদের ইস্যুতে সহযোগিতাকারীদের প্রতি শোকরিয়া জানানো হয়।

টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে টেকনাফের কয়েকটি ক্যাম্পে ঘুরে দেখা যায়- ছোট ছোট দোকানে টিভি ও রেডিওতে খবর শুনছেন রোহিঙ্গারা। নয়াপাড়া নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মো. আমিন বলেন, আইসিজে দেয়া আদেশ নিয়ে আমরা অনেক খুশি। আমরা এ আদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই।

রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) সাধারণ সম্পাদক মাস্টার সৈয়দ উল্লাহ বলেন, আদেশগুলো আমাদের পক্ষে এসেছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে অং সান সুচির যুক্তি খারিজ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে সেখানে গণহত্যা হয়েছে। কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, আইসিজের ঘোষিত রায়ের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ক্যাম্পে নজরদারি রাখা হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত