দুই সিটিতে কাউন্সিলর প্রার্থী, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের ইন্ধনে প্রভাবশালীরা
jugantor
দুই সিটিতে কাউন্সিলর প্রার্থী, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের ইন্ধনে প্রভাবশালীরা
ক্ষোভ ও হতাশায় প্রচার কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছেন দলসমর্থিত অনেক প্রার্থী

  রেজাউল করিম প্লাবন  

২৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের শতাধিক বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী। তাদের ইন্ধন দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা। অনেক ওয়ার্ডে নানান চাপে দলসমর্থিত প্রার্থীরা বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে কোণঠাসা। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সমাধান না পেয়ে চাপা ক্ষোভ ও হতাশায় নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে এবং দলসমর্থিত একাধিক প্রার্থীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।

বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসিয়ে দিতে নানা পদক্ষেপ নেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিদ্রোহী প্রার্থী দমন ও ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী প্রচারে গঠন করা হয় দুই সিটির জন্য দুটি সমন্বয় কমিটি। বিদ্রোহীদের নিয়ে কমিটির শীর্ষ নেতাদের একাধিক বৈঠক ও কঠোর হুশিয়ারি দেয়ার পরও আসেনি তেমন কোনো কার্যকর ফল। দলসমর্থিত প্রার্থীদের অভিযোগ- নিজেদের রাজনৈতিক বলয় জিঁইয়ে রাখতে দলসমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে একরকম যুদ্ধই ঘোষণা করেছেন ঢাকার কিছু এমপি ও প্রভাবশালী নেতা। তারা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের চোখ রাঙিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অধিকাংশ নেতা এমপি ও প্রভাবশালীদের ভয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার সাহস পাচ্ছেন না। উল্টো কোনো কোনো ওয়ার্ডে প্রভাবশালীদের নির্দেশে বিদ্রোহীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরের ৫৪ ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৫টিতে ৩৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। আর দক্ষিণে রয়েছে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪২টিতে ৭২ জন।

‘বিদ্রোহী প্রার্থীরা এখন থেকে দলের কেউ না’- দাবি করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, যারা দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচন করছেন তারা আর দলের পরিচয় দিতে পারবেন না। আর তাদের যারা ইন্ধনদাতা তাদের আমরা চিহ্নিত করেছি। আওয়ামী লীগের পরবর্তী কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ নিয়ে জোরালো আলোচনা হবে। আশা করি তাদের বিষয়ে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইতিমধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেসব নেতা মদদ দিচ্ছেন, তাদেরও দল থেকে বহিষ্কারের দাবি উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে আমির হোসেন আমু বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে তাদের এবং ইন্ধনদাতাদের আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি আমির হোসেন আমু স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে এমন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকেই। এ নিয়ে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘১১ বছর ধরে আমরা ক্ষমতায় আছি, এত বড় দলে বিদ্রোহী প্রার্থীর মতো বিষয়গুলো থাকে। আমরা নির্বাচন করছি, এসব ছোটখাটো সমস্যাকে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি, নির্বাচনেও বিজয়ী হচ্ছি এবং বিরোধী দলের চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করছি।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, বিদ্রোহী প্রার্থী দমনে এত পদক্ষেপের পরও তারা মাঠে থাকায় দলের হাইকমান্ড থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ইন্ধন দেয়ার তথ্যও সেখানে অভিযোগ আকারে জমা পড়েছে। অনেক ওয়ার্ডে বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়ার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আকাশ কুমার ভৌমিক। এ ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন খোরশেদ আলম বাবু মাস্টার ও আওলাদ হোসেন। আকাশ কুমার ভৌমিক যুগান্তরকে বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী আওলাদ হোসেনকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম ও খোরশেদ আলমকে ড. আওলাদ হোসেন ইন্ধন দিচ্ছেন। ড. আওলাদের নির্দেশে বিদ্রোহী প্রার্থী খোরশেদের পক্ষে নির্বাচনী কাজ করছেন কদমতলী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন।

আকাশ কুমার ভৌমিক আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সানজিদা খানম, ড. আওলাদ হোসেন ও মোবারক হোসেনকে অবহিত করেও কাজ হয়নি। আমি তাদের কাছে গিয়েছি, আমার পক্ষে কাজ করার অনুরোধ করেছি। তারা কাজ তো করছেনই না উপরন্তু অন্য নেতাকর্মীদের বিদ্রোহীর পক্ষে কাজ করতে ইন্ধন দিচ্ছেন। বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে অবহিত করেও কোনো লাভ হয়নি।

অভিযোগ অস্বীকার করে ড. আওলাদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমি দলীয় প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করছি। শনিবার অ্যাডভোকেট সানজিদা খানমকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

সিটির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মো. সেলিমের মেজো ছেলে ইরফান সেলিম। এই ওয়ার্ডে দলসমর্থিত প্রার্থী তারই ভাগিনা বর্তমান কাউন্সিলর মো. হাসান। সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, এ ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হাসানের নির্বাচনী প্রচার অনেকটাই ঢিলেঢালা। স্থানীয় নেতাকর্মীরা হাজী সেলিমের নির্দেশে তার ছেলের প্রচার কাজ করছেন। সংঘর্ষের আশঙ্কায় গণসংযোগে ভয় পাচ্ছেন মো. হাসান।

এ প্রসঙ্গে মো. হাসান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। প্রচারে বাধা দেয়া হচ্ছে। আমি হতাশ। আমার প্রচার কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম হয়েছে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১২ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী মামুন রশিদ শুভ্র। প্রথমে দলের সমর্থন পেলেও পরে পরিবর্তন করে বর্তমান কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদারকে দেয়া হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, দলের কেন্দ্রীয় একজন প্রভাবশালী নেতার নির্দেশেই নির্বাচনী মাঠে আছেন শুভ্র। তবে এ বিষয়ে শুভ্র বলেন, প্রথমে আমাকে দল সমর্থন দেয়। পরে প্রার্থী পরিবর্তন হলে ওয়ার্ডটিতে উন্মুক্ত নির্বাচনের ঘোষণা আসে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আইয়ুব আনছার মিন্টুকে ইন্ধন দিচ্ছেন স্থানীয় এমপি একেএম রহমত উল্লাহ। আইয়ুব আনছার মিন্টু এমপি রহমত উল্লাহর ভাগিনা। এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হলেন জাহাঙ্গীর আলম। গত বুধবার এই দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এমপির (রহমত উল্লাহ) লোকচক্ষু উপেক্ষা করে স্থানীয় নেতাকর্মীরা আমার পক্ষে কাজ করছেন। নিজের ভাগিনাকে জেতাতে এমপি বিএনপির লোকজনের সঙ্গে বৈঠক করছেন। প্রচারে আমার লোকজনকে বাধার সম্মুখীন করছেন।

৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী হলেন মো. সফিউদ্দিন মোল্লা। এই ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান নাঈম। তিনি আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার আস্থাভাজন। তার পরামর্শেই বর্তমান কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বলে অভিযোগ নেতাকর্মীদের।

উত্তরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। স্থানীয় এমপি ইলিয়াস মোল্লা বিদ্রোহী প্রার্থীকে ইন্ধন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন দলসমর্থিত প্রার্থী সালাউদ্দিন রবিন। তিনি বলেন, এমপির প্রভাবে বাপ্পী ও তার লোকজন আমার পোস্টার, স্টিকার ছিঁড়ে ফেলছে। দলীয় নেতাকর্মীদের আমার পক্ষে প্রচারে বাধা দিচ্ছে। সব স্তরের স্থানীয় নেতাকর্মী আমার পক্ষেই রয়েছেন বলেও জানান তিনি। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ার্ডের ওলি-গলিতে বিদ্রোহী প্রার্থী বাপ্পীর পোস্টারে ছেয়ে গেছে। গণসংযোগেও আধিপত্য তার। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় দুই শীর্ষ নেতার আশীর্বাদে বিদ্রোহী প্রার্থী বাপ্পী নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান।

জানতে চাইলে বিদ্রোহী প্রার্থী বাপ্পী বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, তার জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততা নেই। আমার পক্ষে সবাই কাজ করছেন। জনগণ আমাকেই নির্বাচিত করবেন।

দুই সিটিতে কাউন্সিলর প্রার্থী, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের ইন্ধনে প্রভাবশালীরা

ক্ষোভ ও হতাশায় প্রচার কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছেন দলসমর্থিত অনেক প্রার্থী
 রেজাউল করিম প্লাবন 
২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের শতাধিক বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী। তাদের ইন্ধন দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা। অনেক ওয়ার্ডে নানান চাপে দলসমর্থিত প্রার্থীরা বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে কোণঠাসা। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সমাধান না পেয়ে চাপা ক্ষোভ ও হতাশায় নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে এবং দলসমর্থিত একাধিক প্রার্থীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।

বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসিয়ে দিতে নানা পদক্ষেপ নেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিদ্রোহী প্রার্থী দমন ও ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী প্রচারে গঠন করা হয় দুই সিটির জন্য দুটি সমন্বয় কমিটি। বিদ্রোহীদের নিয়ে কমিটির শীর্ষ নেতাদের একাধিক বৈঠক ও কঠোর হুশিয়ারি দেয়ার পরও আসেনি তেমন কোনো কার্যকর ফল। দলসমর্থিত প্রার্থীদের অভিযোগ- নিজেদের রাজনৈতিক বলয় জিঁইয়ে রাখতে দলসমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে একরকম যুদ্ধই ঘোষণা করেছেন ঢাকার কিছু এমপি ও প্রভাবশালী নেতা। তারা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের চোখ রাঙিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অধিকাংশ নেতা এমপি ও প্রভাবশালীদের ভয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার সাহস পাচ্ছেন না। উল্টো কোনো কোনো ওয়ার্ডে প্রভাবশালীদের নির্দেশে বিদ্রোহীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরের ৫৪ ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৫টিতে ৩৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। আর দক্ষিণে রয়েছে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪২টিতে ৭২ জন।

‘বিদ্রোহী প্রার্থীরা এখন থেকে দলের কেউ না’- দাবি করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, যারা দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচন করছেন তারা আর দলের পরিচয় দিতে পারবেন না। আর তাদের যারা ইন্ধনদাতা তাদের আমরা চিহ্নিত করেছি। আওয়ামী লীগের পরবর্তী কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ নিয়ে জোরালো আলোচনা হবে। আশা করি তাদের বিষয়ে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইতিমধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেসব নেতা মদদ দিচ্ছেন, তাদেরও দল থেকে বহিষ্কারের দাবি উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে আমির হোসেন আমু বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে তাদের এবং ইন্ধনদাতাদের আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি আমির হোসেন আমু স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে এমন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকেই। এ নিয়ে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘১১ বছর ধরে আমরা ক্ষমতায় আছি, এত বড় দলে বিদ্রোহী প্রার্থীর মতো বিষয়গুলো থাকে। আমরা নির্বাচন করছি, এসব ছোটখাটো সমস্যাকে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি, নির্বাচনেও বিজয়ী হচ্ছি এবং বিরোধী দলের চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করছি।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, বিদ্রোহী প্রার্থী দমনে এত পদক্ষেপের পরও তারা মাঠে থাকায় দলের হাইকমান্ড থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ইন্ধন দেয়ার তথ্যও সেখানে অভিযোগ আকারে জমা পড়েছে। অনেক ওয়ার্ডে বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়ার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আকাশ কুমার ভৌমিক। এ ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন খোরশেদ আলম বাবু মাস্টার ও আওলাদ হোসেন। আকাশ কুমার ভৌমিক যুগান্তরকে বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী আওলাদ হোসেনকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম ও খোরশেদ আলমকে ড. আওলাদ হোসেন ইন্ধন দিচ্ছেন। ড. আওলাদের নির্দেশে বিদ্রোহী প্রার্থী খোরশেদের পক্ষে নির্বাচনী কাজ করছেন কদমতলী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন।

আকাশ কুমার ভৌমিক আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সানজিদা খানম, ড. আওলাদ হোসেন ও মোবারক হোসেনকে অবহিত করেও কাজ হয়নি। আমি তাদের কাছে গিয়েছি, আমার পক্ষে কাজ করার অনুরোধ করেছি। তারা কাজ তো করছেনই না উপরন্তু অন্য নেতাকর্মীদের বিদ্রোহীর পক্ষে কাজ করতে ইন্ধন দিচ্ছেন। বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে অবহিত করেও কোনো লাভ হয়নি।

অভিযোগ অস্বীকার করে ড. আওলাদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমি দলীয় প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করছি। শনিবার অ্যাডভোকেট সানজিদা খানমকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

সিটির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মো. সেলিমের মেজো ছেলে ইরফান সেলিম। এই ওয়ার্ডে দলসমর্থিত প্রার্থী তারই ভাগিনা বর্তমান কাউন্সিলর মো. হাসান। সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, এ ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হাসানের নির্বাচনী প্রচার অনেকটাই ঢিলেঢালা। স্থানীয় নেতাকর্মীরা হাজী সেলিমের নির্দেশে তার ছেলের প্রচার কাজ করছেন। সংঘর্ষের আশঙ্কায় গণসংযোগে ভয় পাচ্ছেন মো. হাসান।

এ প্রসঙ্গে মো. হাসান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। প্রচারে বাধা দেয়া হচ্ছে। আমি হতাশ। আমার প্রচার কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম হয়েছে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১২ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী মামুন রশিদ শুভ্র। প্রথমে দলের সমর্থন পেলেও পরে পরিবর্তন করে বর্তমান কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদারকে দেয়া হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, দলের কেন্দ্রীয় একজন প্রভাবশালী নেতার নির্দেশেই নির্বাচনী মাঠে আছেন শুভ্র। তবে এ বিষয়ে শুভ্র বলেন, প্রথমে আমাকে দল সমর্থন দেয়। পরে প্রার্থী পরিবর্তন হলে ওয়ার্ডটিতে উন্মুক্ত নির্বাচনের ঘোষণা আসে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আইয়ুব আনছার মিন্টুকে ইন্ধন দিচ্ছেন স্থানীয় এমপি একেএম রহমত উল্লাহ। আইয়ুব আনছার মিন্টু এমপি রহমত উল্লাহর ভাগিনা। এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হলেন জাহাঙ্গীর আলম। গত বুধবার এই দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এমপির (রহমত উল্লাহ) লোকচক্ষু উপেক্ষা করে স্থানীয় নেতাকর্মীরা আমার পক্ষে কাজ করছেন। নিজের ভাগিনাকে জেতাতে এমপি বিএনপির লোকজনের সঙ্গে বৈঠক করছেন। প্রচারে আমার লোকজনকে বাধার সম্মুখীন করছেন।

৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী হলেন মো. সফিউদ্দিন মোল্লা। এই ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান নাঈম। তিনি আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার আস্থাভাজন। তার পরামর্শেই বর্তমান কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বলে অভিযোগ নেতাকর্মীদের।

উত্তরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। স্থানীয় এমপি ইলিয়াস মোল্লা বিদ্রোহী প্রার্থীকে ইন্ধন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন দলসমর্থিত প্রার্থী সালাউদ্দিন রবিন। তিনি বলেন, এমপির প্রভাবে বাপ্পী ও তার লোকজন আমার পোস্টার, স্টিকার ছিঁড়ে ফেলছে। দলীয় নেতাকর্মীদের আমার পক্ষে প্রচারে বাধা দিচ্ছে। সব স্তরের স্থানীয় নেতাকর্মী আমার পক্ষেই রয়েছেন বলেও জানান তিনি। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ার্ডের ওলি-গলিতে বিদ্রোহী প্রার্থী বাপ্পীর পোস্টারে ছেয়ে গেছে। গণসংযোগেও আধিপত্য তার। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় দুই শীর্ষ নেতার আশীর্বাদে বিদ্রোহী প্রার্থী বাপ্পী নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান।

জানতে চাইলে বিদ্রোহী প্রার্থী বাপ্পী বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, তার জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততা নেই। আমার পক্ষে সবাই কাজ করছেন। জনগণ আমাকেই নির্বাচিত করবেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন